কোরবানি হোক আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য

আপডেট : ৩০ মে ২০২৫, ০২:০৪ এএম

ইসলামের প্রতিটি নির্দেশে রয়েছে, অন্তহীন কল্যাণ ও হেকমত। ইবাদতের বহু ধরনের মধ্যে কোরবানি এমন এক বিশেষ ইবাদত। যেখানে আত্মত্যাগ, খোদাভীতি ও মানবিকতার এক অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছে। কোরবানির দিনকে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এ দিন মুসলমানদের জন্য ঈদের দিন, আনন্দের দিন। কিন্তু সেই আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি বা উৎসর্গ করা। কোরবানি ইসলামের ইতিহাসে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ একটি অনুশীলন। হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তার প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর বিস্ময়কর আনুগত্য ও আত্মত্যাগের কাহিনি এই ইবাদতের পটভূমি। আল্লাহর আদেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) যখন নিজ সন্তানের গলায় ছুরি চালাতে উদ্যত হলেন, তখন মহান আল্লাহ তার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ঘোষণা দিয়ে একটি পশু পাঠিয়ে দিলেন। সেই ঘটনার স্মরণে কেয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ প্রতি বছর এই কোরবানি আদায় করবেন। তাই কোরবানি হচ্ছে জীবন্ত আখ্যান, মহান আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্যের প্রতীক।

কোরবানি মানে শুধু পশু জবাই করা নয়, বরং নিজের ভেতরের স্বার্থপরতা, গর্ব ও কুপ্রবৃত্তির কোরবানি দেওয়ারও এক আহ্বান। এটি আত্মশুদ্ধির মাধ্যম, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মহিমান্বিত উপলক্ষ। শুধু তাই নয়, কোরবানি সামাজিক ন্যায়বিচার ও সম্পদ বণ্টনের এক মানবিক ব্যবস্থা। দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের সঙ্গে সম্পদের অংশীদারত্ব কায়েম করে দেয় এই ইবাদত। এই দিন মুসলমানদের মধ্যে উৎসবের আবহ তৈরি করে, কিন্তু সেই উৎসবের গভীরে থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির ছায়া, তাকওয়ার আলো। কোরবানি ওয়াজিব আমল। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভই এর একমাত্র উদ্দেশ্য। কোরবানি মুসলমানের ভেতরে-বাইরে পরিবর্তনের স্পন্দন জাগায়। এ উপলক্ষে মুসলিম নারী-পুরুষের মনে জাগে পুণ্যের প্রেরণা। চলে ঘরে ঘরে কোরবানির প্রস্তুতি। মসজিদে মসজিদে বয়ান ও আলোচনা। সব কিছু মিলে ব্যক্তি ও সমাজে ইবাদত-বন্দেগির এক পুণ্যময় স্পন্দন জেগে ওঠে। এটি খুবই ইতিবাচক একটি বিষয়। এজন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা কর্তব্য।

শুক্রবারের জুমা, রমজানের ঈদ, জিলহজ মাসের হজ-কোরবানিসহ ইবাদত-বন্দেগির বিভিন্ন মৌসুমে জাগ্রত হওয়া ইমানকে কার্যকর রাখা নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের কর্তব্য, এই নেয়ামতের সম্মান করা। প্রশ্ন হলো, নেয়ামতের কদর কীভাবে হবে? ইসলামি স্কলারদের অভিমত, নেয়ামতের কদর হবে ইমানি কণিকাকে ইমানি প্রদীপে পরিণত করার দ্বারা, যার জ্যোতির্ময়তায় মুসলমানদের চেতনা ও বিশ্বাস, কর্ম ও আচরণ জ্যোতির্ময় হয়ে উঠবে। কোরবানিতে আমাদের জন্য রয়েছে গভীর বার্তা। এটা আল্লাহর ইবাদত, তাওহিদ ও সুন্নাহের প্রাণ। কোরবানির সময় মুমিনের মনে ও মুখে থাকে তাওহিদের বাণী। আর কোরবানিসহ সব ইবাদত তখনই ইবাদত হয়, যখন তা আদায় করা হয় সুন্নত মোতাবেক। মুসলমানরা ওই নিয়মেই কোরবানি করেন, যে নিয়ম নবী কারিম (সা.) দেখিয়ে গেছেন। এটাই সুন্নতের অনুসরণ। এভাবেই তাওহিদ ও সুন্নাহর শিক্ষা আমাদের গোটা জীবনে পরিব্যাপ্ত।

সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোনো মুসলমান কোরবানি দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন না। নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের ওপরই কেবল আল্লাহ কোরবানি ওয়াজিব করেছেন। যার সামর্থ্য নেই তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। আর অর্থ-সামর্থ্য তো মহান আল্লাহ দান করেন। আল্লাহর দেওয়া সম্পদ থেকেই আমরা কোরবানি করি। এটি তার দানের শুকরিয়া। সামর্থ্য থাকার পরও যদি কোনো মুসলিম কোরবানি না করেন, সেটার পরিণাম হবে ভয়াবহ। এ জন্যই কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন নবীজি। ইরশাদ হয়েছে, ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ) সামর্থ্যবানদের মধ্যে যারা কোরবানি করবেন, তাদের উদ্দেশ্য হতে হবে একমাত্র আল্লাহকে রাজি-খুশি করা। লোক দেখানো, মানুষের বাহবা কুড়ানো যেন কোরবানির লক্ষ্য না হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে না পৌঁছে তাদের (কোরবানির পশুর) গোশত আর না তাদের রক্ত, বরং তার কাছে তোমাদের তাকওয়াই পৌঁছে।’ (সুরা হজ ৩৭)

কোরবানিতে যেহেতু নির্দিষ্ট পশু জবাই করতে হয়, তাই অহেতুক কষ্ট দেওয়া ছাড়া সুন্দরভাবে পশু জবাইয়ের ব্যবস্থা করা উচিত। এটাই ইসলামের নির্দেশ। হজরত শাদ্দাদ ইবনে আওস (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা সব কিছুর ওপর অনুগ্রহকে অপরিহার্য করেছেন। অতএব যখন তোমরা হত্যা (জবাই) করবে, তো উত্তম পদ্ধতিতে কর। যখন জবাই করবে তো উত্তম পদ্ধতিতে জবেহ কর। প্রত্যেকে তার ছুরিতে শান দেবে এবং পশুকে শান্তি দেবে।’ (সহিহ মুসলিম) কোরবানির পশুর গোশত শুধু নিজে নয়, অন্যদেরও খাওয়ানো দরকার। ইরশাদ হয়েছে, ‘কোরবানির উট (ও গরু)-কে তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শনাবলির অন্তর্ভুক্ত করেছি। তোমাদের জন্য তাতে রয়েছে কল্যাণ। সুতরাং যখন তা সারিবদ্ধ অবস্থায় দাঁড়ানো থাকে, তোমরা তার ওপর আল্লাহর নাম নাও। তারপর যখন (জবেহ করার পর) তা কাত হয়ে মাটিতে পড়ে যায়, তখন তার গোশত থেকে নিজেরা খাও এবং ধৈর্যশীল অভাবগ্রস্তকে খাওয়াও এবং তাকেও যে নিজ অভাব প্রকাশ করে না। এভাবেই আমি এসব পশুকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।’ (সুরা হজ ৩৬)

সমাজে এমন অনেক অভাবী আছেন, যারা কোরবানিতেই শুধু গোশত খেতে পারেন। তারা আশায় থাকেন, কোরবানি উপলক্ষে গোশত খাওয়ার। এমন অভাবী ও অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারে আপনার কোরবানি। শুধু আত্মীয়স্বজন ও অভাবী মুসলিম নয়, কোরবানির গোশত অমুসলিমদেরও দেওয়া যায়। এতে অসুবিধার কিছু নেই। বিশেষ করে অমুসলিম যদি প্রতিবেশী হয়। কারণ, প্রতিবেশী হিসেবে তার হক রয়েছে। সাহাবিরা অমুসলিম প্রতিবেশীর হকের প্রতি সবিশেষ লক্ষ রাখতেন। হাদিসে এসেছে, ‘কোরবানির দিন আদম সন্তানের আর কোনো আমল নেই, যা আল্লাহর কাছে রক্ত প্রবাহিত (পশু কোরবানি) করার চেয়ে প্রিয়। এই কোরবানি কেয়ামতের দিন উপস্থিত হবে তার শিং, খুর ও চুল সহকারে। আর কোরবানির রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা পৌঁছে যায়, আল্লাহর সন্তুষ্টির স্থানে। সুতরাং এতে তোমাদের চিত্ত প্রফুল্ল হোক।’ (জামে তিরমিজি)

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত