বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের বিবর্ণ ছায়া

আপডেট : ৩১ মে ২০২৫, ১২:১৭ এএম

পঞ্চাশ দশকের পুরোটাই ছিল ভাষা সংস্কৃতিকে চিহ্নিত করার সংগ্রামমুখর সময়। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে জাতি নিজস্ব সংস্কৃতি আপন গণ্ডির মধ্যে সমৃদ্ধ হওয়ার উদ্দীপনা পায়। সেই ৫০-৬০ এর দশকে চলচ্চিত্র ছাড়াও সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা অথবা নাটক, এক ধরনের নতুন গতি নিয়ে আছড়ে পড়ে দেশে। সেই সময় শৌখিন একজন নাট্যকর্মী প্রচণ্ড জেদ এবং দেশ-চেতনার তাগিদেই, প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক বাংলা চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ (১৯৫৬) নির্মাণ করেন। তিনি হলেন, আব্দুল জব্বার খান। শুরু হলো আমাদের প্রথম সবাক চলচ্চিত্রের পথচলা। কিন্তু তার অনেক আগেই, বিশ্ব কাঁপাচ্ছে সবাক চলচ্চিত্র। ‘মুখ ও মুখোশ’ থেকে আজ পর্যন্ত যে পথ চলছি, নির্মোহ বিশ্লেষণ করতে বসলে মনে হয়, অনেক পিছিয়ে রয়েছি চলচ্চিত্রে। ঢাকাই চলচ্চিত্রের সেই কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ, সংগীত এবং অভিনয়ে পরিপক্বতা নেই। সেই সময়ের অধিকাংশ অভিনেতা-অভিনেত্রী মারা গেছেন। কেউ বয়সের ভারে ন্যুব্জ। আবার কেউ তীব্র অভিমানে পথ ত্যাগ করেছেন। জনপ্রিয় অধিকাংশ পরিচালক প্রয়াত হয়েছেন। যারা আছেন, তারাও চলচ্চিত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।  স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দুই দশকে যে উন্মাদনা এবং আন্তরিকতা, দায়বদ্ধতা, শিক্ষা, সামাজিক শোষণ, নির্যাতন ও দেশপ্রেমের ছবি আঁকা হয়েছে সেলুলয়েডে সেখান থেকে আমরা ছিটকে পড়েছি। পাশের দেশ ভারতের রাজ্য পশ্চিম বাংলা থেকেও আমরা পিছিয়ে। অথচ এই তারাই এক সময় আমাদের চলচ্চিত্রকে ঈর্ষা করত। কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ বা সংগীত মাধুর্যে আমাদের চলচ্চিত্র ছিল দুই বাংলার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। যে কারণে সেখান থেকে আমাদের চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে ছুটে এসেছেন অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী। কেউ কেউ বলবেন, কারিগরি দুর্বলতার কথা। কিন্তু ৬০, ৭০, ৮০’র দশকের চলচ্চিত্র তাহলে এত হৃদয়গ্রাহী হলো কীভাবে? এখনো তা কেন আমাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে?

সত্যি বলতে, আমাদের বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্র আজ বিবর্ণ। অধিকাংশ মধ্যবিত্ত সিনেমা হলে কবে গিয়েছেন, সে কথা হয়তো ভুলে গেছেন। বর্তমানে তারা সিনেমা হলে তেমন যাচ্ছেন না বললেই চলে। তবু টিমটিম করে টিকে আছে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র। মাঝেমধ্যে বছরে দু-একটি চলচ্চিত্র ঝলসে ওঠে। কিছু মানুষ হলমুখো হয়, তাও সিনেপ্লেক্সে। দেশের অন্যান্য সিনেমা হলগুলো বসে থাকে অন্ধকারে। কিন্তু এই দশা তো হওয়ার কথা ছিল না। ৮০ দশকের  প্রায় পুরো সময়টাই মধ্যবিত্ত ছিল হলমুখী। এরপর তারা বন্ধ করে দেন। কী এমন হলো, তারা বিরক্ত হলেন! বিষয়টি সম্ভবত বিস্তারিত ব্যাখ্যার দরকার নেই। তবু বলি নব্বই দশকের শুরুতেই গ্রাস করতে থাকে হিন্দি চলচ্চিত্রের অনুকরণ। এরপর যোগ হয় অশ্লীলতা। দেশপ্রেমিক এবং সাহিত্যপ্রেমী যোগ্য পরিচালক, প্রযোজক, কাহিনিকার, গীতিকার, সুরকাররা অভিমানে চলে যেতে থাকেন চলচ্চিত্র থেকে। শুরু হয়, ভারতীয় হিন্দি ছবির অনুকরণ। মোটা দাগে বলতে গেলে, সালমান-মৌসুমী অভিনীত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ (হিন্দি ছবি ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’-এর অণুকরণে) আমাদের ছবিতে কেয়ামত ডেকে আনে। এরপর যোগ হয় অশ্লীলতা।

ধারাবাহিক শিল্পী সৃষ্টিতে কারা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করল, কেনই বা ‘তরুণ মুখের সন্ধানে’ বন্ধ হয়ে গেল, আমরা জানি না। অথচ এর মাধ্যমে কিছু গুণী অভিনেতা-অভিনেত্রী পেয়েছিলাম। এখান থেকেই উঠে এসেছিলেন- মান্না, সোহেল চৌধুরী, দিতি, অমিত হাসান, আমিন খান, মিশা সওদাগরসহ জনপ্রিয় অনেক শিল্পী। এরই মধ্যে মান্না এবং দিতিকে আমরা হারিয়েছি। এফডিসির উদ্যোগে প্রথম এই প্রতিযোগিতা শুরু হয় ১৯৮৪ সালে। এরপর অজানা কারণে চলচ্চিত্র শিল্পী বাছাই বন্ধ হয়ে যায়। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো ভ্রুক্ষেপ আছে বলে মনে হয় না।  যে কারণে এখন অধিকাংশই একা একা অভিনয় শিল্পী। প্রতিটি মানুষ অভিনয় করার যোগ্যতা রাখেন। কিন্তু আগ্রহীদের যদি ঠিকমতো প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা হতো, তাহলে আমাদের ঢাকাই চলচ্চিত্রের চেহারা হতো অন্যরকম। শুধু একজন শাকিব খানকে নিয়ে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি কতদূর যাবে? সবাই যদি এই একজনকে নিয়ে পড়ে থাকেন, তাহলে কোনো ইন্ডাস্ট্রি চলে!  

এবার আসি চলচ্চিত্রের কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ এবং গীতিকবিতা নিয়ে। বিশেষ করে সিনেমার গানে এক সময় ঢেউ উঠেছিল দেশে। সেই মুনীরুজ্জামান, রফিকুজ্জামান, গাজী মাযহারুল আনোয়ারদের মতো গীতিকার নেই। সেই কণ্ঠশিল্পীও নেই। এদের প্রায় ৯৫ ভাগই বিদায় নিয়েছেন। সত্য সাহা, সুবল দাস, সমর দাস, আজাদ রহমান, খন্দকার নুরুল আলম, আলাউদ্দিন আলীর মতো সুরকার-সংগীত পরিচালক নেই। যে কারণে আমাদের সিনেমার গান এখন আর কোনো আবেদন রাখতে পারে না।  আমাদের একটি চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন আছে। যা পরিচিত, ‘এফডিসি’ নামে। কী হয় এইখানের বিভিন্ন স্টুডিওতে? শুধুমাত্র ডাবিং সেন্টারটি এখনো চলছে। আর চলচ্চিত্র যে কী হচ্ছে, আমাদের জানা নেই। এ রকম আঁচ করতে পেরেই ১৯৮৪ সালে বাণিজ্যিক ধারার ছবির বাইরে এগিয়ে আসেন মোরশেদুল ইসলাম। ‘আগামী’ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র সেই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম দর্শকদের সামনে নিয়ে আসেন। তখন চলচ্চিত্রে নান্দনিক গল্প ও দেশকে তুলে ধরতে, রীতিমতো আন্দোলন করেন গুটিকয় তরুণ। যাদের মধ্যে মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদসহ আরও অনেকে এক চিন্তায় ঐক্যবদ্ধ হন। তারা মিটিং করেন, মানববন্ধন করেন, দেশ-বিদেশের শৈল্পিক সিনেমার প্রদর্শনী চলমান রাখেন। তারপর অনেকেই এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।  কিন্তু সেই সুস্থ ধারার কাব্যিক, নান্দনিক, ইতিহাসের দায়বদ্ধতা এবং  বাস্তবধর্মী ক্যামেরার কাজ আজ দুর্বল। বর্তমানে এভাবেই চলছে। কিন্তু প্রথমে ঢাকাই বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে প্রাণ জাগাতে এগিয়ে আসতে হবে সমাজের সর্বস্তরের আলোকিত মানুষকে। বিশেষ করে, বিত্তশালী এবং রুচিশীল শ্রেণিকে। কোনো দেশেই সাংস্কৃতিক বোধসম্পন্ন ধনিক শ্রেণি চলচ্চিত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে, ইন্ডাস্ট্রি টিকে থাকে না। আমাদের দেশেও থাকবে না। যার আলামত স্পষ্ট। নতুন সময়ে নতুন প্রাণে জাগুক আমাদের চলচ্চিত্র। দূর হোক, সমস্ত প্রতিবন্ধকতা। হিন্দি ছবির দাপট থেকে বাংলা চলচ্চিত্র কীভাবে টিকে থাকবে, কবে দূর হবে বিবর্ণ ছায়া, তার নীতি-কৌশল নির্ধারণ করবেন মহারথীরা। যারা সেলুলয়েডের সঙ্গে সার্বিকভাবে জড়িয়ে আছেন। আমরা যারা সাধারণ দর্শক, তারা শুধু সেলুলয়েডে শৈল্পিক ঘ্রাণ পেতে চাই।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ

চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস)

[email protected] 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত