২১ আগস্ট ফারুক আহমেদ যখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব নেন, তখন জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ইস্পাতের মতোই ধারালো। সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রী এবং বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন এবং সহযোগীরা ক্রিকেট প্রশাসনে যে অনিয়ম আর অন্যায়ের সংস্কৃতি প্রচলন করে রেখেছিলেন, তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ এবং বিসিবি থেকে সুযোগ-সুবিধা না নেওয়া দুজন মানুষ ফারুক আহমেদ ও নাজমুল আবেদীন ফাহিমকে বিসিবি পরিচালক হিসেবে মনোনয়ন দেয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, এরপর পরিচালকদের ভোটে প্রথম সাবেক ক্রিকেটার হিসেবে বিসিবি সভাপতির পদে বসেন ফারুক। গভীর রাতে সরকারি প্রজ্ঞাপনে সেই ফারুককে সরিয়ে দিল এনএসসি, তার জায়গায় সভাপতি করা হলো আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে। দায়িত্ব নেওয়ার পর শনিবার ছিল বিসিবিতে বুলবুলের প্রথম কার্যদিবস। ৯ মাস আগে যেভাবে উৎসুক জনতা সাদরে বরণ করে নিয়েছিল ফারুককে, তার ব্যতিক্রম হয়নি বুলবুলের বেলাতেও। সেই সব মুখই ছিল তার চারপাশে, যাদের এক সময় দেখা গেছে নাজমুল হাসান পাপনের সঙ্গী হতে, দেখা গেছে ফারুকের আশপাশেও। ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাওয়ার মতোই তাই শঙ্কা, ফারুকের মতো একই পরিণতি হবে না তো বুলবুলেরও।
নজিরবিহীনভাবে সচিবালয়ের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে হয় বিসিবির বৈঠক, যেখানে বিসিবি পরিচালকদের ভোটে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন ফারুক। সেই পরিচালকরাই অনাস্থা প্রস্তাব এনে তাকে সরিয়ে দিলেন। যারা তাকে সভাপতি হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন, তারাই ৯ মাস পর তার প্রতি অনাস্থা এনেছেন। সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি নাম, নাজমুল আবেদীন ফাহিম। শুক্রবার, বিসিবির যে বৈঠকে বুলবুলকে সভাপতি ঘোষণা করা হয়েছে, একই বৈঠকে সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে ফাহিমের নামও। ফারুক দায়িত্ব নিয়ে বলেছিলেন নীতিগত সংস্কারের কথা। সেই সংস্কার কার্যক্রম পদে পদে খেয়েছে হোঁচট। বিসিবিকে ঢাকার ক্লাবগুলোর নিয়ন্ত্রণের বাইরে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ঢাকার ক্রিকেট লিগে অংশ নেওয়া ক্লাবগুলোর কর্মকর্তারা মিলে ধর্মঘট ডেকে সেই সংস্কার প্রক্রিয়া থামিয়ে দেন। একনায়ক হয়ে ওঠা চন্ডিকা হাথুরুসিংহেকেও বরখাস্ত করা হয় ফারুকের সময়ে। বন্যার্তদের অনুদান, পাকিস্তানে টেস্ট সিরিজ জয়ে বোনাস, বিপিএলের রাজস্ব প্রথমবারের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর সঙ্গে ভাগাভাগি করাসহ বেশ কিছু ভালো কাজ হয়েছে ফারুকের সময়ে।
মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনের গায়ে দেশের সেরা কোচের তকমা দিয়েছেন অনেকেই, বিসিবির চাকরিতে তাকে মূল্যায়ন করা হয় না এমন একটা অজুহাত তিনি দিয়েছেন লম্বা সময়। ফারুক জাতীয় দলের কোচিং প্যানেলে ঢুকিয়েছেন সালাহউদ্দিনকে। অনেকগুলো ভালো কাজের উদাহরণই দেওয়া যাবে ফারুকের ৯ মাসের সময়কালে। তবে তাকে ডুবিয়েছে বিপিএল, এই আয়োজনকে ঘিরে পাতানো ম্যাচের দুর্গন্ধ আর খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক বকেয়া থাকার সমালোচনাই কাল হয়েছে ফারুকের। বিদেশি খেলোয়াড়দের পাওনা থেকে শুরু করে হোটেলের বিল বকেয়া পড়ছিল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর। বিশেষ করে দুর্বার রাজশাহী ও চিটাগং কিংস পাওনা নিয়ে টালবাহানা করে আসছিল শুরু থেকেই যেটা সমাধান করতে শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়। মাঠেও খারাপ করতে থাকে বাংলাদেশ, দেশে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্টে পরাজয় আর আরব আমিরাতের বিপক্ষেও টি-টোয়েন্টি সিরিজ হার ক্রমশ আরও তলানির দিকে ঠেলে দেয়। অন্যদিকে হামজা চৌধুরী-শমিত সোমদের আগমনে ফুটবলে তৈরি হয়েছে নতুন উন্মাদনা, পৃষ্ঠপোষকদের নজরও সেদিকে। এমনই এক সংকটকালে দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী আমিনুল ইসলামকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিসিবি সভাপতি পদে বসানো হয়েছে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ইচ্ছাতেই, দায়িত্ব নেওয়ার পর যে কথা নিজেই বলেছেন বুলবুল।
আ হ ম মোস্তফা কামাল কিংবা নাজমুল হাসান পাপন; তারা দুজনেই ছিলেন খোদ সরকারের অংশ। দুজনেই ছিলেন সাংসদ, ব্যবসায়িকভাবে সফল ব্যক্তিত্ব। ফারুক বা বুলবুলের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই, নেই অর্থনৈতিক পেশিশক্তিও। বুলবুল তো দায়িত্ব গ্রহণের পর সংবাদ সম্মেলনে বলেই দিয়েছেন, ‘আমি বোধহয় বিসিবির সবচেয়ে গরিব প্রেসিডেন্ট।’ তাই দীর্ঘদিন ধরে ক্রিকেট বোর্ডে খুঁটি গেড়ে থাকা মাহবুব আনাম, ইনাম আহমেদদের মতো ব্যবসায়ীরা, যারা অতীতে অনেক সুবিধা নিয়েছেন তারা কি বুলবুলকে তার ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করতে দেবেন? ফারুক সভাপতিত্ব হারাবার পর বলেছেন যে অনেক বিসিবি পরিচালকই তাকে পদে পদে বিপদে ফেলার চেষ্টা করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে ফারুক বলেছেন, ‘আমি যে লাইনে কাজ করছিলাম, সেটা আমার আগের বোর্ডের যে ডিরেক্টররা আছে তারা পছন্দ করছিল না, শিওরলি। এ কারণেই তারা পূর্ণ সহযোগিতা করছিল না। বুলবুল এলে হয়তো সহযোগিতা করবে, নিশ্চয়ই করবে। আমি জানি না... এটা সময়ই বলে দেবে... আমি জানি না। এখনো মন্তব্য করার সময় হয়নি।’ যারা অনাস্থা এনে ফারুককে সরালেন, তাদের প্রতি বুলবুলের কতটা আস্থা এমন প্রশ্নে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ানের উত্তর ছিল, ‘আমার এই কয়েকদিনের অভিজ্ঞতায় মনে হয়নি কারও কথায় চলতে হতে পারে। আমি আজ এসেছি, ব্যাপারগুলো দেখব। এই প্রশ্নের উত্তর পরে দিতে পারব।’
আইসিসিতে কাজের অভিজ্ঞতা, যোগাযোগ এসব কিছু হয়তো সংগঠক বা ক্রীড়া প্রশাসক হিসেবে বুলবুলকে এগিয়ে রাখবে এক সময়ের সতীর্থ ফারুকের চেয়ে। তবে ফারুকের বিদায়ের উদাহরণ সামনে বুলবুল নিশ্চয়ই চাইবেন না সাপের লেজে পা দিতে। পরিণাম যে চোখের সামনেই।
‘আমি দেম্বেলেকেই ব্যালন ডি’অর দেব’
বিজয়ী বাবাকে চমকে দিতে ছোট্ট জানাকে নিয়ে গ্যালারিতে দর্শকরা
এমএলএসে ইন্টার মায়ামির সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে গেলেন মেসি