রাজস্ব ভবনে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণার তিন দিন পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া পাহারায় নিজের কার্যালয়ে ফিরেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। র্যাব-পুলিশের পূর্ণ নিরাপত্তা নিয়ে বাজেটের আগের দিন বিকেল চারটায় তিনি ফেরেন। নিজ দপ্তর এনবিআরে গিয়েই সদস্যদের তথা সিনিয়র কর্মকর্তাদের রুমেও ডেকেছেন আবদুুর রহমান খান।
এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের বেঁধে দেওয়া তিন দিনের মধ্যেও চেয়ারম্যানকে অপসারণ না করায় গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে পুলিশি নিরাপত্তায় স্বাধীনতার পর এনবিআরের কোনো চেয়ারম্যানের নিজ দপ্তরে প্রবেশের নজির ছিল না। এটা এনবিআরের ইতিহাসে প্রথম বলেও জানিয়েছন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এনবিআর সূত্র জানায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্বিমত না থাকলেও বিপত্তি বাধে সংস্থাটির বিলুপ্তি ও প্রসাশন ক্যাডার কর্মকর্তাদের সুযোগ করে দেওয়া নিয়ে। এরই প্রেক্ষিতে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের ব্যানারে আন্দোলন গড়ে তুলেন সংস্থাটির সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অবস্থান ধর্মঘট থেকে কলমবিরতি এবং সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতিসহ ১৩ দিনের আন্দোলনের মাথায় ঐক্য পরিষদের দাবি মেনে নেয় সরকার। আর সরকারের ইতিবাচক ভূমিকায় কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন আন্দোলনকারীরা।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, আন্দোলনের সময় চেয়ারম্যানকে আর রাজস্ব ভবনে দেখা যায়নি। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) সচিব হিসেবে সেখানেই তিনি এতদিন অফিস করে আসছিলেন। চেয়ারম্যান রাজস্ব ভবনে প্রবেশ করতে চান, কয়েকবার এমন কথা শোনা গেলে কর্মকর্তারা তার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিলে তিনি আর আসেননি। তখন থেকেই সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলছেন চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। বাজেটের দিন ঘনিয়ে আসায় তিনি মুঠোফোনে যোগাযোগ করে কাজ চালিয়ে এসেছেন। সবশেষ গত শুক্রবারও তার বাসায় বাজেটের কাজ চলেছে বলেও নিশ্চিত করেছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, এনবিআর সংস্কার ইস্যুতে শুরু থেকেই এনবিআর চেয়ারম্যান টালবাহানা করার অভিযোগ আনে সংস্কার ঐক্য পরিষদ। তাই এনবিআর চেয়ারম্যানের অপসারণ এ আন্দোলনের মূল দাবিতে যোগ হয়। সবশেষ আন্দোলনের কর্মসূচি প্রত্যাহারের সময়ও এনবিআর চেয়ারম্যান অপসারণের আগপর্যন্ত অসহযোগ কর্মসূচি চালু রাখেন এবং অপসারণে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় এনবিআর চেয়ারম্যান অপসারণ না হওয়ায় রাজস্ব ভবনে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। যদিও পূর্ণাঙ্গ কলমবিরতি কর্মসূচি পালনের সময় থেকে এনবিআরের বদলে সচিবালয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে অফিস করেন তিনি। আজ সোমবার বাজেট পেশ করবেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। আর বাজেটের আগের দিন পুলিশ-র্যাবের নিরপত্তা বলয়ে এনবিআরে প্রবেশ করেছেন চেয়ারম্যান আবদুুর রহমান খান। আর বিষয়টিক নজিরবিহীন বলেও উল্লেখ করেছেন এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের অভিযোগ পতিত স্বৈরাচার সরকারের সচিব আবদুুর রহমান খানের নেপথ্যে আসলে কারা রয়েছেন। শুরু থেকে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন দমাতে চেয়ারম্যানঘনিষ্ঠরা বিভিন্ন ধরনের চাপ দিয়ে আসছে। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে ট্যাগ দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়। সবশেষ দুই সমন্বয়ক দিয়ে আন্দোলন থামানোর চেষ্টা করেন এনবিআর চেয়ারম্যানঘনিষ্ঠরা। এসব কর্মকা-ে আরও জোরদার হয় আন্দোলন। এবার পুলিশ-র্যাবকে নিয়ে আসলেন। এর আগে আন্দোলনের সময় বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এনবিআরে আসেন। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এভাবে নিয়ে আসা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
প্রসঙ্গত, গত ১২ মে রাতে এনবিআরকে ভাগ করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫ অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। পরদিন থেকে তা বাতিলের দাবিতে অবস্থান ও কলমবিরতি কর্মসূচি পালন শুরু করেন দেশের প্রধান রাজস্ব আহরণকারী সংস্থাটির কর্মীরা। কর্মীদের আন্দোলনের মুখে অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে, এনবিআর বিলুপ্ত নয়, বরং এ প্রতিষ্ঠানকে ‘স্বাধীন ও বিশেষায়িত’ বিভাগের মর্যাদায় উন্নীত করা হবে। সেজন্য ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে ওই অধ্যাদেশে সংশোধন করা হবে। এনবিআর, রাজস্ব সংস্কার বিষয়ক পরামর্শক কমিটি এবং ‘গুরুত্বপূর্ণ’ অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা মাধ্যমে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে বলে মন্ত্রণালয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সরকার দাবি মানার আশ্বাস দিলে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গত ২৫ মে রাতে কর্মবিরতিসহ সব কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন। তবে এনবিআর চেয়ারম্যান অপসারণের দাবি না মানায় নতুন করে সময় বেঁধে দেন তারা।
