পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার কৃষিপ্রধান ১০টি গ্রামের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে একটি আধুনিক সড়ক। যেখানে এক সময় ছিল ভাঙাচোরা, সংকীর্ণ মেঠোপথ, সেখানে এখন নির্মিত হয়েছে ৭ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আঞ্চলিক মহাসড়ক। এই উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা কেবল পরিবহন সহজ করেনি, বরং নিশ্চিত করেছে নিরাপত্তা, কৃষকদের জন্য পণ্যের ন্যায্যমূল্য এবং গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রায় কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, দেবোত্তর-একদন্ত সড়কের পুস্তিগাছা থেকে একদন্ত বাজার পর্যন্ত অংশটি দীর্ঘদিন সংকীর্ণ ও অপ্রশস্ত ছিল। এটি আটঘরিয়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুরসহ কয়েকটি উপজেলার মানুষের জন্য ঢাকাগামী মহাসড়কে যাতায়াতের সংক্ষিপ্ত পথ হলেও, ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে সুফল মিলত না। অপরাধপ্রবণ এলাকা হওয়ায় চরমপন্থি ও ডাকাতদের আক্রমণে পণ্য, অর্থ, এমনকি যানবাহনও হারাতেন ব্যবসায়ীরা। তবে, আধুনিক প্রযুক্তি (ডব্লিউএমএম) ব্যবহার করে নির্মিত এই সড়ক এসব সমস্যার সমাধান করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত যোগাযোগ সম্ভব হওয়ায় অপরাধ কমেছে এবং অর্থনৈতিক গতি বেড়েছে। এই অঞ্চলের পুস্তিগাছা, কয়রাবাড়ি, ডেঙারগ্রাম, যাত্রাপুর, শিবপুরসহ গ্রামগুলো কৃষিনির্ভর। এখানে পাট, ধান, পেঁয়াজ, রসুন, বিভিন্ন সবজি এবং মৎস্য উৎপাদন হয়। পূর্বে সড়কটি সংকীর্ণ হওয়ায় ট্রাকের মতো বড় যানবাহন প্রবেশ করতে পারত না। ফলে কৃষকরা ভ্যানে অল্প পরিমাণে পণ্য বাজারে নিয়ে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হতেন।
কয়রাবাড়ির কৃষক সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এলাকায় পাটের ব্যাপক আবাদ হয়। আগে সরু রাস্তার কারণে বড় ট্রাক ঢুকতে পারত না, তাই ভ্যানে করে অল্প অল্প পণ্য বিক্রি করতে হতো। এখন প্রশস্ত সড়কের সুবিধায় একবারে বড় ট্রাকে দূরের বাজারে পণ্য পাঠানো যাচ্ছে। এতে পরিবহন খরচ কমেছে, আর ভালো দাম পাচ্ছি।’
সুত্রার বিলের কৃষক হানিফ বলেন, ‘ধান-পাট ছাড়াও এখানে সবজি আর মাছের উৎপাদন হয়। আগে ভাঙা রাস্তায় বাজারে পণ্য নিয়ে যাওয়া কঠিন ছিল। শহর বা দূরের বাজারে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব ছিল। এখন জমির পাশে ট্রাক দাঁড়াচ্ছে, পণ্য সহজে বাজারে যাচ্ছে। পুকুরের মাছ এমনকি ঢাকায়ও পাঠানো সম্ভব হচ্ছে।’
স্থানীয় পথচারী লিটন ম-ল বলেন, ‘এই সড়ক পাবনা শহর, আটঘরিয়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুরকে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। ট্রাক, বাস, মিনিবাসে সহজে যাতায়াত সম্ভব। আগে রোগীদের জেলা হাসপাতালে নিতে অ্যাম্বুলেন্স ঢোকানো কঠিন ছিল। এখন প্রশস্ত সড়কের কারণে এসব সমস্যা নেই। গ্রামে ছোট গার্মেন্টস ও কুটির শিল্প গড়ে উঠছে, কর্মসংস্থান বাড়ছে।’ আটঘরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুজ্জামান সরকার বলেন, ‘ডেঙারগ্রাম, যাত্রাপুর, শিবপুর এলাকা একসময় চরমপন্থিদের আস্তানা ছিল। চাঁদাবাজি, হত্যা, ডাকাতি নিয়মিত ঘটত। এখন প্রশস্ত সড়কে পুলিশের দ্রুত পৌঁছানোর সুবিধায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বেড়েছে।’
আটঘরিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. বাকীবিল্লাহ জানান, ‘ডব্লিউএমএম পদ্ধতিতে বালি, খোয়া ও পানি মিশিয়ে ১০-১২ দিন প্রক্রিয়াকরণের পর রোলার দিয়ে কম্প্যাকশন করা হয়েছে। এতে রাস্তা অত্যন্ত শক্ত হয়েছে। সড়কটি ১৮ ফুট প্রশস্ত করা হয়েছে, গভীরতা ৬ ইঞ্চির পরিবর্তে গড়ে অর্ধ ইঞ্চি বেশি রাখা হয়েছে।’
