তপু বর্মণের নেতৃত্বে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের দুটি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। ভারত ও সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচ থেকে মাত্র এক পয়েন্ট সংগ্রহে হতাশ তপু। ১০ জুন ঘরের মাঠে ডিফেন্স ও গোলকিপারের ভুলে সিঙ্গাপুরের কাছ থেকে দুই গোল হজম করতে হয় বাংলাদেশকে। দলের ব্যর্থতাসহ তার অনেক কথা উঠে এসেছে সুদীপ্ত আনন্দ’র সাক্ষাৎকারে
দুটো ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দলের পরিবর্তনগুলো কাছে থেকে দেখেছেন। দুটো ম্যাচের ফল কি প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে?
তপু বর্মণ : খেলোয়াড়রা সবাই শতভাগ দিয়ে চেষ্টা করেছে। ভারত ম্যাচে প্রথম ২০ মিনিটে যে সুযোগগুলো তৈরি করেছিলাম, সেগুলো থেকে গোল হলে জিতে ফিরতে পারতাম। সিঙ্গাপুর ম্যাচেও আমরা সবাই চেষ্টা করেছি। কিন্তু ফলাফল আমাদের পক্ষে আসেনি, সে জন্য আমরা সবাই ভীষণ আপসেট। এই দুটো ম্যাচে খেলোয়াড়দের নিবেদন এবং প্রস্তুতিতে সবারই ছিল বাড়তি মনোযোগ। কিন্তু কথায় আছে না, ভাগ্য পক্ষে থাকতে হয়। আমার কাছে মনে হয় ঐ জায়গাতেই আমরা হেরে গেছি।
সিঙ্গাপুরের কাছে দুই গোল হজম করায় ডিফেন্সের ব্যর্থতা সামনে চলে আসছে। একজন ডিফেন্ডার হিসেবে নিশ্চয় দায় এড়াতে পারেন না?
তপু : দুই অর্ধের দুটি গোলই আসলে খুব বাজেভাবে খেয়েছি। যা একদমই উচিত হয়নি। যা আমাদের ম্যাচ থেকে দূরে নিয়ে গেছে। আমার মনে হয় না সিঙ্গাপুর খুব ক্লিয়ার সুযোগ পেয়েছে বা তৈরি করেছে। দ্বিতীয় গোলটা যখন হয় তখন শুরুতে আমি সেইভ করে ডি বক্সের বাইরে পাঠিয়েছিলাম। তারপর ওদের আরেক ফুটবলার সেটা আবার ভেতরে নিয়ে আসে। আমার কাছে মনে হয় এসব ক্ষেত্রে আরেকটু ভালো আমরা করতে পারতাম। দ্বিতীয় গোলটা ওভাবে না খেলে জেতারও একটা সুযোগ তৈরি হতো।
তাহলে ঘাটতি ছিল স্বীকার করেই নিচ্ছেন?
তপু : যেহেতু ডি বক্সের ভেতর থেকেই গোল দুটি হয়েছে, আর সেখানে ডিফেন্ডার ও গোলকিপার থাকে, গোল হজমের দায়টা তো আমাদেরই।
ম্যাচের কয়েকদিন আগে গোলকিপার মিতুল মারমা ভাইহারা হন। সে শোক নিয়ে ওকে খেলতে হয়েছে। মিতুলকে কি এই ম্যাচে বিশ্রাম দেওয়া যেত না?
তপু : ভাইয়ের মৃত্যুতে তার মানসিকভাবে ভেঙে পড়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমার মনে হয় তাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। কারণ এই পরিস্থিতিতে ও শতভাগ মনোবল নিয়েই মাঠে নেমেছিল। মাঠে তার নিবেদনেও ঘাটতি ছিল না। মিতুল আসলে যেভাবে পারফরম করছে, সে ডিজার্ভ করে দলের একাদশে থাকাটা। আর এই সিদ্ধান্তটা আসলে কোচের। যেকোনো বড় ম্যাচে তো কোচ তার এক নম্বর গোলকিপারকেই খেলায়। ঐ চিন্তা থেকেই তাকে হয়তো একাদশে রাখা। তবে খেলোয়াড় নিজে যদি কোচকে জানায় সে খেলতে চায় না, সেটা অন্য বিষয়।
সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে একাদশ ও খেলোয়াড়দের পজিশন নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। রাইট ব্যাককে লেফটে খেলানো, সেন্টারব্যাককে রাইটব্যাকে, রাইট উইঙ্গারকে স্ট্রাইকিং পজিশনে, মাঝমাঠের খেলোয়াড়কে রাইট উইংয়ে খেলিয়েছেন কোচ কাবরেরা। গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যাচে এত পরিবর্তন কী প্রয়োজন ছিল?
তপু : লেফট ব্যাকে সাদ উদ্দিন ভারত ম্যাচেও খেলেছে। ভুটানসহ আরও কয়েকটি ম্যাচেই খেলেছে। একেবারেই যদি না খেলত তাহলে একটা কথা বলা যেত। তবে তপুর (শাকিল আহাদ তপু) ক্ষেত্রে বিষয়টি অন্যরকম। কারণ সে একেবারেই সেন্টার ব্যাকে। ক্লাবেও সে এই পজিশনে খেলে। রাইট ব্যাকে ওকে খেলানো হয়েছিল। আমার মনে হয় ফিজিক্যাল স্ট্রাকচার দেখে ওকে নামানো হয়েছিল। অ্যাটাকিং ইনভলবমেন্ট যেটা তাজউদ্দিন করেছিল (ভুটান ম্যাচে) ঐ জায়গাটায় ঘাটতি হয়তো ছিল।
হোম ম্যাচে বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল ৩ পয়েন্ট। তারপরও কোচের কৌশল কেন রক্ষণাত্মক ছিল? মাস্ট উইন ম্যাচে কেন দুজন হোল্ডিং মিডফিল্ডার খেলানো হলো?
তপু : সিঙ্গাপুরের ৭ নম্বর খেলোয়াড় (সং উই-ইয়ং) বিটউইন দ্য মিডফিল্ড লাইন ও ডিফেন্স লাইনের সামনে খেলে। সে ঐ জায়গাগুলো থেকে সবসময় বল সামনের দিকে নেয়। হামজা একটু ওপরের দিকে থাকবে, হৃদয় ডিফেন্ডিংয়ে মনোযোগী থাকবে। এই পরিকল্পনা নিয়েই আমরা খেলতে নেমেছিলাম। আর এই ম্যাচটাতে আমরা হেরে যাব এটা কখনই ভাবিনি। আমাদের চিন্তা ছিল গোল হজম করব না। গোল দেব এবং ম্যাচটা বের করে নেব। কাজেম বল প্লেয়ার, শমিত তার কোয়ালিটি দেখিয়েছে, ফাহামিদুল অনেক ফাস্ট প্লেয়ার, রাকিবও অনেক স্পিডি। হামজা আমাদের দলের মেইন সাপ্লায়ার। আর হৃদয় হলো ডেস্ট্রয়ার। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা ভালোই করছিলাম। ৪৪ মিনিট পর্যন্ত কোনো ঝামেলা হয়নি। এরপর আমরা একটা বাজে গোল হজম করি। দ্বিতীয়ার্ধে আমাদের খেলার ধরন বদলে যায়। অনেক অ্যাটাকিং খেলেছি।
প্রথমার্ধে শমিত সোম অনেক ভালো খেলছিলেন। দ্বিতীয়ার্ধে সিঙ্গাপুর তাকে ব্লক করে দিয়েছিল। যখন সে অকার্যকর হলেন তখন কি বেঞ্চে থাকা সোহেল রানা অথবা জামালকে ট্রাই করা যেত না?
তপু : দ্বিতীয়ার্ধে আসলেই সে (শমিত) মার্কিংয়ে ছিল। তাছাড়া কানাডার সঙ্গে বাংলাদেশের ১০/১১ ঘণ্টার একটা পার্থক্য ছিল। আরেকটা বিষয় যদিও অজুহাত হয়ে যাবে, সত্যি কথা ওইদিন অনেক গরম ছিল। বৃষ্টি হওয়ার পর ভ্যাপসা গরম ছিল। এ রকম আবহাওয়ায় খেলে ওরা অভ্যস্ত নয়।
রাকিবের পছন্দের পজিশনে খেলতে না পারা নিয়ে কী বলবেন?
তপু : এই জায়গায় আমার কিছু বলার নেই। ওর একটা ভালো গুণ হলো রানিং। যখন সে নাম্বার নাইন পজিশনে খেলে তখন বলগুলো নিয়ে দৌড়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। আবার অভ্যাসের কারণে ডান দিকে গিয়ে চেষ্টা করে ক্রস ফেলার। তবে জেনুইন নাম্বার নাইন না থাকায় সে সব ক্রস কাজে আসে না। আমার মনে হয় একজন নাম্বার নাইন (স্ট্রাইকার) ট্রাই করা যেত।
দুই ম্যাচ থেকে মাত্র ১ পয়েন্ট। এটা কি আপনারা ভেবেছিলেন?
তপু : আমরা এখন যেমন দল তাতে এক পয়েন্ট আমরা ডিজার্ভ করি না। যখন সুযোগ আসে, তখন সেগুলো কাজে লাগাতে হয়। সুযোগ নষ্ট করলে প্রতিপক্ষ সেটা কাজে লাগিয়ে ফেলে। এই প্রতিযোগিতাগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বাস করি এখনো আমাদের সুযোগ আছে। সামনের ম্যাচগুলোতে কোনো ভুল করা যাবে না। অক্টোবরের দুটো ম্যাচেই পয়েন্ট হারানো যাবে না।
হামজা, শমিত, ফাহামিদুল এসেছে। কিউবা মিচেলের কথা শোনা যাচ্ছে। তাতে দলে নিঃসন্দেহে পরিবর্তন ঘটছে। এই পরিবর্তনগুলো আপনি কীভাবে দেখছেন?
তপু : হামজা আসায় ফুটবলের নবজাগরণ হয়েছে। তার সঙ্গে শমিত ও ফাহামিদুল এসেছে। আমি যখন থেকে ফুটবল খেলা শুরু করি এত দর্শকের সামনে খেলিনি কখনো। এটা অবশ্যই হামজা-শমিতদের কারণে হয়েছে। হামজা আসাতেই বাকিরা আগ্রহী হয়েছে। তাদের অবশ্যই ওয়েলকাম জানাই। ওদের সঙ্গে আমাদের দারুণ একটা সম্পর্ক হয়েছে। আমরাও তাদের বাংলাদেশি ফুটবলার হিসেবেই নিয়েছি।
হামজাদের নিয়ে এত উন্মাদনা হচ্ছে, স্থানীয়দের এটা নিয়ে কোনো দুঃখবোধ নেই?
তপু : নাহ্! এগুলো আমরা কখনো গুরুত্ব দিই না। আগে তো সবাই ক্রিকেট নিয়ে মেতে থাকত। টিভির দোকানের বাইরে কিংবা চায়ের দোকানে সবাই ক্রিকেট দেখতেন। সেই জায়গায় এখন সবাই ফুটবল দেখছেন। আমাদের খেলা দেখছেন। এই বিষয়গুলো আমরা উপভোগ করছি। একদিন মানুষ আমাদের নিয়েও সেøাগান দেবে, যদি আমরা ভালো খেলি।
দুটো ম্যাচে মাঠের অধিনায়ক ছিলেন আপনি। কিন্তু ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন জামাল। এই বিষয়গুলো নিয়ে আপনাদের খারাপ লাগা কাজ করে না?
তপু : প্রশ্নই আসে না। কারণ আমরা পেশাদার ফুটবলার। দলটাই আমাদের কাছে সবার আগে। এখানে ব্যক্তিগত তুচ্ছ বিষয়কে আমরা গুরুত্ব দিই না।
ফুটবল নিয়ে মানুষের হঠাৎ আগ্রহটা আবার হারিয়ে যাবে না তো?
তপু : সবকিছুর মূল হচ্ছে পারফরম্যান্স। ম্যাচ জিতলে দর্শকদের আগ্রহ বাড়বে। আমরা যত বেশি ম্যাচ খেলব তত বেশি ম্যাচ জেতার সামর্থ্য বাড়বে। জয়ের অভ্যাস গড়ে উঠবে। জিততে দেখলে মানুষ আরও মাঠমুখী হবেন।
