বিদ্যালয়টির মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করলে দেয়াল জুড়ে আঁকা হরেক রকম ফুল-ফল ও গাছের সৌন্দর্য যে কারও দৃষ্টি কাড়বে। সামনে পুরো সবুজ ঘাসে ভরা একটি মাঠ। সেই মাঠে শিশুদের জন্য রয়েছে দোলনা, স্লিপার, অক্ষরগাছ প্রভৃতি। রয়েছে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের বিশ্রাম নেওয়ার শেড। আরও আছে ছাদবাগান ও সততা স্টোর। ভেতরে ৩টি শ্রেণিকক্ষ ও ১টি শিক্ষক কক্ষ। প্রতিটি কক্ষে রঙের মাধ্যমে শিক্ষামূলক ছবি আঁকা। এ সবের মধ্যে রয়েছে সৌরজগৎ, মানচিত্র, বারের নাম, নামতা, প্রকৃতি, বিভিন্ন পশু-পাখি ও বাণী। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলা সদর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত সুব্রত খাজাঞ্চী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এমনই ব্যতিক্রমী আয়োজনে ভরা। ব্যতিক্রমধর্মী এই বিদ্যালয়টি গত ১০ মে প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৪ অনুষ্ঠানে দেশের সেরা স্কুল হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছে।
২০১৩ সালে স্থাপিত হওয়া বিদ্যালয়টি মাত্র ৩৫ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে যাত্রা শুরু করে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে। ১২ বছরের ব্যবধানে সেই বিদ্যালয়ে এখন শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩২০ জন। তবে এখনো পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো নেই বিদ্যালয়ের। পাকা ভবনে ৩টি শ্রেণিকক্ষ, আর টিনশেডের ২টি শ্রেণিকক্ষ। শিক্ষার্থী সংখ্যা অনুযায়ী যেখানে সহকারী শিক্ষক থাকার কথা ৮ জন, সেখানে রয়েছে ৫ জন। শ্রেণিকক্ষও প্রয়োজন ৮টি, রয়েছে ৫টি। এত সংকটের মধ্যেও দেশসেরা হয়েছে সুব্রত খাজাঞ্চী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যালয়টিতে প্রবেশ করলে যে কারও মনে হতে পারে অন্যরকম বিদ্যালয়। এই ভবনের ওপরে ছাদবাগান। যেখানে রয়েছে আঙ্গুর, কমলা, আম, লেবুসহ বিভিন্ন ফলের গাছ। একপাশে মুক্তমঞ্চ, যেখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, উপস্থিত বক্তৃতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন হয়ে থাকে। একতলা ভবনের পেছনে রয়েছে আরও দুটি টিনশেডের শ্রেণিকক্ষ ও সামনে মাঠ। মাঠের চারপাশে প্রাচীরে আঁকা রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ছবিযুক্ত কবিতা, বীরশ্রেষ্ঠদের কথা, ফুল-ফল ও বিভিন্ন শিক্ষামূলক বাণী। এভাবে বিদ্যালয়ের প্রতিটি প্রাচীরেই রয়েছে এমন আর্ট। এই বিদ্যালয়টির আবহটাই যেন ভিন্ন কিছু।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানিয়েছেন, বিদ্যালয়ের মূলমন্ত্রই হলো মজার ছলে শেখানো, যাতে বিদ্যালয়টাকে কেউ বোঝা না মনে করে। স্থানীয় অভিভাবকরা জানিয়েছেন, এই বিদ্যালয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ এতটাই বেশি যে, সকাল হলেই তাদের সন্তানরা অপেক্ষায় থাকে বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী বায়েজিত ইসলাম বলে, ‘আমার বিদ্যালয়ে আসতে খুব ভালো লাগে। আমাদের পিটিতে অনেক কিছু শেখানো হয়। প্রতিদিন নতুন কিছু শেখানো হয়। স্যার ও ম্যাডামরা মায়ের মতো। খেলাধুলা, গান, নাচ, বিতর্কসহ নানা কিছু শেখানো হয়।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জগদীশ রায় বলেন, ‘প্রথম দিকে আমরা ৩৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু করলেও তারা স্থায়ী হচ্ছিল না। কারণ এই বিদ্যালয়ে উপবৃত্তি ছিল না। ফলে শিক্ষার্থীরা অন্য বিদ্যালয়ে চলে যাওয়া শুরু করে। পরে আমি স্থানীয় অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়ে বৈঠক করে কমিটি গঠন করি। সবার সহযোগিতা ও সমাজসেবীদের সহযোগিতা নিয়ে ফান্ড তৈরি করলাম এবং সেখান থেকে উপবৃত্তির মতো অর্থ দেওয়া শুরু করি। ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত আমাদের বিদ্যালয়ের কোনো বরাদ্দ ছিল না। ওই সময় পর্যন্ত অনেকেই আমাদের সহযোগিতা করেছেন। প্রথমে আমার খুব কষ্ট হয়েছে। ৪টি টেবিল, ৬টি চেয়ার, ৬০ জোড়া বেঞ্চ ছাড়া বিদ্যালয়ে কিছুই ছিল না। কোনো বাউন্ডারি ছিল না, কোনো মাঠ ছিল না। এভাবে আমি চালিয়ে নিয়ে গিয়েছি। স্থানীয় লোকজনের সহায়তা ও ভালো মনোভাবের কারণে আমরা বিদ্যালয়কে শ্রেষ্ঠত্বের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি।’
চিরিরবন্দর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মিনারা বেগম বলেন, ‘আমার উপজেলাতে একটি বিদ্যালয় দেশসেরা হয়েছে এর জন্য আমি গর্বিত। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। শিক্ষকদের আন্তরিকতাই বিদ্যালয়টিকে দেশসেরা করেছে।’
