বাঁধ মেরামতে অনিয়ম হস্তান্তরের আগেই ধস

আপডেট : ২২ জুন ২০২৫, ১২:৩৪ এএম

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় যমুনা নদীর ডান পাড়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে চলমান মেরামত কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধের মেরামত কাজ শেষ না হতেই শতাধিক পয়েন্টে ধস দেখা দিয়েছে। প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে মেরামত করা বাঁধটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। নিয়মানুযায়ী বাঁধ মেরামত কাজে শতকরা ৭০ ভাগ বালু ও ৩০ ভাগ মাটি ফেলার কথা। সেই নিয়ম মানা হয়নি। প্রকৌশলী-ঠিকাদার যোগসাজশে বাঁধে শুধু বালু ফেলা হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় লোক দেখানো সামান্য মাটি ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া বাঁধটি টেকসই করতে দুপাশে ঘাস লাগানো বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবচিত্র ভিন্ন। বাঁধের অনেক স্থানে স্থানীয় লোকজন গরুকে খাওয়ানোর জন্য নেপিয়ার জাতের ঘাস লাগিয়েছেন। বেশিরভাগ অংশেই ঘাস লাগানোর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ফলে হস্তান্তরের আগেই বাঁধটি হুমকির মুখে পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) গাইবান্ধা কার্যালয় সূত্র জানায়, বন্যা থেকে গাইবান্ধা জেলাকে রক্ষা করতে মোট ২৪০ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে ৭৮ কিলোমিটার বাঁধ উত্তর-দক্ষিণে প্রবাহিত যমুনা-ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীরে নির্মিত। ১৯৬২ সালে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ এ বাঁধ জেলার চারটি উপজেলার ভেতর দিয়ে গেছে। এটি উত্তরে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর ইউনিয়ন থেকে গাইবান্ধা সদর ও ফুলছড়ি হয়ে সাঘাটা উপজেলার জুমারবাড়ি ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত। বাঁধটি চলাচলের রাস্তা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

সূত্রটি জানায়, ২০২২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সাঘাটা উপজেলায় ১৫ কিলোমিটার অংশে মেরামতের কাজ শুরু করে পাউবো। বাঁধটি উপজেলার সাঘাটা ইউনিয়নের বাঁশহাটা এলাকা থেকে জুমারবাড়ি বসন্তের পাড়া পর্যন্ত মেরামত কাজ চলছে। এতে ২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়। মেরামত কাজের দায়িত্ব পায় পাবনার ঠিকাদার গোলাম রাব্বী ও রংপুরের হাসিবুল হাসান। চলতি বছরের ৩০ জুন কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। গত ২০ জুন পর্যন্ত দীর্ঘ তিন বছর চার মাসে কাজের অগ্রগতি হয়েছে শতকরা ৮০ ভাগ। এ পর্যন্ত কাজের অর্ধেক বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এক্সকাভেটর মেশিন দিয়ে বালু ফেলে বাঁধ মেরামত করা হচ্ছে।

এদিকে দরপত্রের নিয়মানুযায়ী, বাঁধে শতকরা ৭০ ভাগ বালু ও ৩০ ভাগ মাটি দিয়ে মেরামত এবং বাঁধটি টেকসই করতে উভয় পাশে ঘাস লাগাতে হবে। কিন্তু নিয়মানুযায়ী কাজ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয় লোকজন জানায়, আগে থেকেই এই বাঁধটি অনেকটা ঠিকঠাকই ছিল। লোকজন যাতায়াত করত। কিন্তু এর ওপর সামান্য পরিমাণ বালু ফেলে ও কিছু কিছু জায়গায় লোক দেখানো মাটি ফেলা হয়। বাঁধের গোড়া থেকে তোলা হয় বালু। এখন বর্ষা মাস। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব নয়। রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় ও বৃষ্টির কারণে কাজ শেষ না হতেই বাঁধের শতাধিক স্থানে ধসে গেছে।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বাঁধের দুই পাশে শতাধিক পয়েন্টে মাটি ধসে গেছে। সেখানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বাঁধের গোড়ায় মাটি কম, ফলে অনেক জায়গায় বাঁধে ফাটল ধরেছে। বাঁধের ওপরের অংশ যাতায়াত অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় ঘাস লাগানো হয়নি। বাঁধটির মুন্সিরহাট, সাতালিয়া, আমদিরপাড়া, বাদিনারপাড়া এলাকার অংশে বেশি ধসে যাচ্ছে।

স্থানীয় সমাজকর্মী জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘বাঁধটিতে মাটি না দিয়ে বালু ফেলা হয়েছে। তাও আবার বাঁধের গোড়া থেকে বালু তোলা হয়েছে। বাঁধের গোড়ায় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে বাঁধ ধসে সেই গর্ত ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে বাঁধটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। কর্তৃপক্ষের অনিয়মের কারণে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে।’

এসব বিষয়ে ঠিকাদার গোলাম রাব্বীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে ঠিকাদারের প্রতিনিধি আলাউদ্দিন মিয়া মুঠোফোনে বলেন, ‘বাঁধের যেসব স্থানে ধসে গেছে তা মেরামত করা হচ্ছে। কাজ শেষ করার মেয়াদ আছে। এর মধ্যেই বাকি কাজ করা হবে। ঘাসও লাগানো হবে। কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি। দরপত্রের নীতিমালা অনুসারে বাঁধ মেরামত কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে।’

গাইবান্ধা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হক বলেন, ‘কাজে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জামানত রাখা হয়েছে। কাজ শেষ করার এক বছর পর এই টাকা ফেরত দেওয়া হবে। এক বছরের মধ্যে মেরামত অংশে ধসে গেলে, সেটি ঠিক করে নেওয়া হবে। ঠিকাদারের কাছ থেকে শতকরা ৭০ ভাগ বালু ও ৩০ ভাগ মাটি দিয়েই কাজ করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তারা নিয়মানুযায়ীই কাজ করছেন কি না সেজন্য তদারকি কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। তারা সার্বক্ষণিক নজরে রাখছেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত