ব্যাটসম্যানদের ‘স্বেচ্ছামৃত্যু’

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৫, ০৪:১৬ এএম

মেহেদী হাসান মিরাজ একাদশে ফিরেছেন। বিশ্বের টেস্ট র‌্যাংকিং-এর দুই নম্বর অলরাউন্ডারকে দলে ফিরে পাওয়ার আনন্দে দলের বাকিরা বোধহয় নিজেদের কাজটাই ভুলে গেছেন। কলম্বোতে খানিকটা বৃষ্টিবিঘ্নিত প্রথম দিনের খেলা শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৭১ ওভারে ৮ উইকেটে ২২০ রান। কোনো হাফসেঞ্চুরি নেই, সর্বোচ্চ ৪৬ রানের ইনিংস খেলেছেন সাদমান ইসলাম।

একাদশে দুই পরিবর্তন নিয়ে সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাবের মাঠে নামে বাংলাদেশ। মিরাজকে জায়গা দিতে দর্শক জাকের আলী অনিক। হাসান মাহমুদের হালকা চোটের সুযোগে দুই বছর পর টেস্ট দলে ফিরলেন এবাদত হোসেন। সার্জারি, পুনর্বাসন সবকিছুর শেষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দুই বছর পর ফেরা এই ডানহাতি পেসার অবশ্য প্রথম দিনে বল হাতে পাননি, তবে ব্যাটিংয়ে নেমে পড়তে হয়েছে। শ্রীলঙ্কা অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজের জায়গায় একাদশে নিয়েছে অভিষিক্ত সোনাল দিনুশাকে, মিলন রত্নায়েকের জায়গায় এসেছেন বিশ্ব ফার্নান্দো।

ভেন্যু বদল, শহর বদল, একাদশে খেলোয়াড়ও বদল; পরিবর্তন অনেক কিছুতেই। কিন্তু পরিবর্তন নেই এনামুল হক বিজয়ের। তিনি ধ্রুবতারার মতোই স্থির হয়ে আছেন নিজের পারফরম্যান্সে। গল টেস্টে প্রথম ইনিংসে আউট হয়েছিলেন ০ রানে, পরের ইনিংসে অনেক সংগ্রামের পর করেছিলেন ৪ রান। কলম্বোতেও গলের ‘বীরত্ব’-এর পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছেন এনামুল। দুই দফা জীবন পেয়েও কোনো রান না করেই বিদায় নিয়েছেন বোল্ড হয়ে। যেন রান করবই না বলে পণ করেছেন এনামুল। জোরালো লেগ বিফোর উইকেটের আপিল, উইকেটরক্ষকের হাত ফসকে যাওয়া ক্যাচ, সিøপ ফিল্ডারের সামনে মাটিতে পড়া ক্যাচ...কোনো কিছুই তাকে রান করতে বাধ্য করতে পারেনি। এরপর আর ফিল্ডারদের ওপর ভরসা রাখেননি এনামুল অসিথা ফার্নান্দোর ব্যাক অব দ্য লেংথ ডেলিভারিতে ব্যাটের কানা লাগিয়ে স্টাম্পে পাঠিয়ে নিজেই নিজের বিদায় নিশ্চিত করেছেন। সেই সঙ্গে সামনে এনেছেন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও। জাতীয় লিগে ভূরি ভূরি রান করার পর শ্রীলঙ্কার এই মাঝারি মানের মিডিয়াম পেসারদের বিপক্ষেই যদি কোনো ব্যাটসম্যান এভাবে খাবি খান, তাহলে এই জাতীয় লিগ আয়োজনের মানেটা কী?

শ্রীলঙ্কা সফরে সাদমান বেশ ভালো করছেন, তবে ইনিংসগুলো প্রত্যাশা ছড়িয়ে থমকে যাচ্ছে। গলে করেছিলেন ৭৬, সেঞ্চুরির আশা জাগিয়েও পারেননি তিন অঙ্কের রানে পৌঁছাতে। এসএসসিতেও ৪৬ রানে আউট হয়ে গেলেন থারিন্ডু রত্নায়েকের বলে। অফসাইডের বাইরের বলে জোরে সø্যাশ করতে গিয়ে ক্যাচ দিলেন স্লিপে। মুমিনুল হকও বড় করতে পারছেন না নিজের ইনিংসগুলো, কুড়ি থেকে পঁচিশের ভেতরই ঘুরপাক খাচ্ছেন গত কয়েকটা ইনিংস ধরে। ৩৩, ২৯, ১৪ এর পর কলম্বো টেস্টের প্রথম ইনিংসে করেছেন ২১ রান। গলের জোড়া সেঞ্চুরিয়ান, বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত এবার খুব বেশি রান পাননি। হয়তো অবসর ভাবনা আর অভিমানের মেঘে রান করাটা ভুলে গেছেন। আগের টেস্টে দুই ইনিংসে তিন অঙ্ক ছাড়ানো শান্ত এবার ৮ রানেই আউট। বিপর্যয়টা বেশ ভালোই সামলে নিয়েছিলেন মুশফিকুর রহিম ও লিটন দাস। ১১৩ বলে ৬৭ রানের একটা জুটিও গড়ে ফেললেন পঞ্চম উইকেটে। এরপর কী মনে হলো তাদের, বোধহয় ভাবলেন অভিষিক্ত সোনালের দিনটা স্মরণীয় করে দেওয়া যাক। স্টিয়ার করতে চেয়েছিলেন লিটন, একটু লাগল কানায়। ঝাঁপিয়ে পড়ে একহাতে ধরে ফেললেন কুশল মেন্ডিস। কিছুটা ফসকে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, সেটা দূর করেছেন দ্বিতীয় প্রচেষ্টায়। লিটনের রান তখন ৩৪। এই বামহাতি স্পিনারকে স্ল্যাগ সুইপ মারতে গিয়ে উইকেট দিয়েছেন মুশফিকুর রহিমও। ঘরোয়া ক্রিকেটে যে ধরনের বোলারকে মুশফিক সবচেয়ে বেশি খেলেছেন, সেটা নিঃসন্দেহে বামহাতি স্পিনার। সোনালের নির্বিষ ডেলিভারিটাকে স্ল্যাগ সুইপ মারতে গিয়ে স্কয়ার লেগে ক্যাচ দিয়েছেন ফিল্ডারের হাতে। মুশফিকের রান তখন ৩৫।

ব্যাটিংয়ে নেমে মিরাজের সামনে সুযোগ ছিল আরও একবার বিপর্যয়ে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার। কিছুটা চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু অন্য পাশে সঙ্গীও পেলেন না। নাঈম হাসানকে নিয়ে ৫৬ বলে ৩৭ রানের একটা জুটি গড়ে কিছুটা সামাল দিয়ে নিজেই আউট হয়ে গেছেন খোঁচা মেরে স্লিপের একমাত্র ফিল্ডারের হাতে বল পাঠিয়ে। ৪২ বলে ৩১ রানে তারও ইতি।

ক্রিকেটের ভাষায় ‘সফট ডিসমিসাল’, বাংলায় বলা যায় ‘স্বেচ্ছামৃত্যু’। কলম্বোতে বাংলাদেশের বেশিরভাগ ব্যাটসম্যানকেই পেয়েছে স্বেচ্ছামৃত্যুর রোগে। উইকেটে সেট হয়ে তারপর আউট হয়েছেন এমন ব্যাটসম্যানের সংখ্যা ৫। কমপক্ষে ৩০টা ডেলিভারি খেলেছেন কিংবা অন্তত ২০ রান করেছেন তারপর আউট হয়ে গেছেন, এমন ব্যাটসম্যানই বেশি। সাদমান, মুশফিক, মুমিনুল, লিটন, মিরাজ অন্তত একজন ব্যাটসম্যান উইকেটে থেকে গেলে আজ বাংলাদেশের ইনিংসের রানটা বেড়ে ২৫০ হওয়ার আশা করা যেত। এখন আছেন তাইজুল ইসলাম (৯* ও এবাদত ৫*)। আজ সকালে তারা যদি গোটা দুয়েক ওভারও টিকে যান, সেটাই হবে আশীর্বাদ। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত