নীরবতার ভাষা স্পষ্ট বক্তব্যের চেয়েও জোরালো

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৫, ১২:২৬ এএম

কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি যেন এক অদ্ভুত বৃত্তে আবর্তিত হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি কৌশলের পেছনে লুকিয়ে আছে ক্ষমতা রক্ষার নতুন মানচিত্র, প্রতিটি ‘সংলাপ’-এর আড়ালে বহুল প্রশিক্ষিত নীরবতা। এই ভূখণ্ডে যে যত বড় প্রতিপক্ষ, তাকে দমন করতে তত বেশি কৌশল, জোট, আইন কিংবা প্রচার-যন্ত্রপাতি ব্যবহার হয়। এই মুহূর্তে রাজনীতির মাঠে একটি মৌন স্লোগান ভাসছে বাতাসে ‘নির্বাচন পেছাও, বিএনপি ঠেকাও।’ কেউ বলছেন, এটি বিএনপির অন্তঃসলিলা পরিকল্পনা। আবার কেউ বলছেন, এটি শাসক পক্ষের ছক। কিন্তু রাজনীতির গভীর স্তরে, এটি একটি নবনির্মিত ক্ষমতা কাঠামোর মৌখিক ইঙ্গিত, যার উদ্দেশ্য পুরনো দুই প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে মাঠের বাইরে রেখে এক ‘নিরাপদ’ রাজনৈতিক খেলোয়াড় তৈরি করা। এই প্রক্রিয়া আর নিছক রাজনৈতিক নয়; এটি হলো কৌশলগত সামাজিক প্রকৌশল, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ ভবিষ্যতের ছায়া নির্মাণ করে।

লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের ‘ওয়ান টু ওয়ান’ বৈঠক, নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীনের বক্তব্য সবই একটি সমন্বিত বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্র অপেক্ষমাণ এবং নির্বাচন কমিশন বলছে : ‘সরকারের নির্দেশনার পরই তারিখ নির্ধারণ হবে।’ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় নির্বাচন কমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ বা একান্ত বৈঠকের অন্তর্বিষয় জানার দরকার হয় না। নীরবতার ভাষা, অনেক সময় স্পষ্ট বক্তব্যের চেয়েও বেশি জোরালো হয়। এর আগেই প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে ভাষণে এপ্রিলের প্রথমার্ধে নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেছিলেন, যা বিএনপিসহ অধিকাংশ দল প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু তার বাইরেও যে রাজনৈতিক খেলা চলছে, তা এখন কেবল রাজনৈতিক শক্তি নয় সব রাষ্ট্রযন্ত্র, কূটনীতি এবং মিডিয়ার মধ্য দিয়ে প্রভাব বিস্তারকারী এক নতুন ছায়ারাষ্ট্র।

দুই. সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি প্রশ্ন প্রায় নিয়মিতভাবে ঘুরে ফিরে আসছে। জামায়াতে ইসলাম কি বিএনপির বিকল্প? এমন কথা কখনো উচ্চারিত হয় আতঙ্কের সুরে, কখনো তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে, আবার কখনো রাজনৈতিক সুবিধাবাদের মুখোশ পরে। প্রশ্নটি আদৌ কি বাস্তবতার দরজায় কড়া নাড়ে? নাকি এটি এক প্রকার কৌশলগত প্রচার, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জনমতকে ভিন্নমুখী করার রাজনৈতিক চাবিকাঠি? বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক নতুন নয়। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে তারা একাধিকবার জোট গড়েছে, বিশেষত ২০০১ সালের চারদলীয় জোট সরকারে। কিন্তু সেই সম্পর্কের ভিত্তি ছিল ক্ষমতার অঙ্ক, আদর্শের কোনো মিল নয়। একদিকে জাতীয়তাবাদ, অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক রক্ষণশীলতা দুই দলই একে অপরকে প্রয়োজনমাফিক ব্যবহার করেছে, কিন্তু আদর্শিক অবস্থানে একে অপরের প্রতিপক্ষই থেকে গেছে। বিএনপির রয়েছে একটি বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তি, রাষ্ট্রক্ষমতার অভিজ্ঞতা এবং  জাতীয়তাবাদী আবেগে গাঁথা রাজনৈতিক পরিচয়। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, জামায়াত বিএনপির বিকল্প নয়, বরং এই বিকল্পের প্রচারণা হলো, বড় রাজনৈতিক কৌশল।

তিন. এরশাদের সময় জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় আনার পেছনে জনগণের ভোট নয়, ছিল প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও নির্দিষ্ট কূটনৈতিক বলয়ের এক যৌথ ছক। তাদের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট : একটা সরকার থাকবে, যাতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় থাকে, একটা বিরোধী দল থাকবে, যাতে গণতন্ত্রের ভান টিকে থাকে, সব কিছুই থাকবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য, পাঠ্যসূচিভুক্ত এবং প্রতিক্রিয়াশূন্য।  আজকের ‘তৃতীয় শক্তি’কেও কি সেই কাঠামোতেই বসানো হচ্ছে? এ যেন গণতন্ত্রের এক শব্দশূন্য প্রতিলিপি, যেখানে বিরোধিতা শুধুই একটি নাট্যাংশ আর জনগণের ক্ষোভ একটি পরিসংখ্যান। এই কাঠামোতে তৃতীয় শক্তি একটি ডামি প্লেয়ার নিয়ন্ত্রিত সিস্টেমের অংশ, স্বতঃস্ফূর্ততার বিকল্প নয়। চার. সরকার নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করেছে। নেতারা কেউ দেশের বাইরে, কেউ জেলে, কেউ আত্মগোপনে। তবু বাংলাদেশ নামক এই রাজনৈতিক ভূখণ্ডে লাখ লাখ মানুষ রয়ে গেছেন, যারা নিজেদের আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে চেনেন, ভোট দেন, রক্ত দিয়েছেন, সেøাগান তুলেছেন। এখন এই মানুষগুলোকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে রাখা কতটুকু সম্ভব? প্রশ্ন উঠছে, তারা কাকে ভোট দেবেন? আর যদি তারা ভোটেই না যান, তবে এই নির্বাচন আদৌ কতটা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হবে? আজ ভোট কেবল জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়, এটি একটি রাজনৈতিক উপস্থিতির প্রতীক।

নির্বাচন কমিশনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ : সংখ্যায়, চেতনায় ও বাস্তবে ভোটারদের ফিরিয়ে আনা। ১০ বা ১৫ শতাংশ ভোটার এলেই নির্বাচন ‘জায়েজ’ এই ধারণা এখন আর আন্তর্জাতিক বা দেশীয় পরিমণ্ডলে গ্রহণযোগ্য নয়। আর বিএনপি কিংবা তৃতীয় শক্তির সামনে সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ : আওয়ামী লীগ-সমর্থক ভোটারদের নিজেদের দিকে টানা। বিএনপি মনে করে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই ভোটব্যাংক তাদের দিকে আসবে। তারা যুক্তি দেয়, ধর্মভিত্তিক দলকে আওয়ামী ভোটাররা সমর্থন করবে না। আর যেখানে জয়ের সম্ভাবনা নেই, সেখানে বামপন্থিদের প্রতি আগ্রহও কম। কিন্তু বাস্তবতা জটিল। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসবে, এই দলহীন হয়ে পড়া ভোটাররাই নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পালাবদলের নিয়ন্তা হয়ে উঠতে পারেন। তারা কোথায় দাঁড়াবেন, কাকে ভোট দেবেন, আদৌ ভোট দেবেন কি না? যারা এখনো মনে করছেন আওয়ামী লীগ শক্তভাবে ক্ষমতায় আছে, তারা হয়তো আরেক দফা বিভ্রান্তির মধ্যেই আছেন। অনেকেই মনে করছেন, তৃতীয় শক্তির উদ্ভবের পেছনে হয়তো একটি ধীর, কিন্তু পরিকল্পিত পটপরিবর্তনের ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে। যার লক্ষ্য আওয়ামী লীগকে রাজনীতির কেন্দ্র থেকে ক্রমে সরিয়ে দেওয়া।

পাঁচ. সম্প্রতি আদালতের নির্দেশে নিবন্ধন পাওয়ার পর জামায়াতে ইসলামীর নেতারা খোশমেজাজে আছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাদের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছিল। এখন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিল। আর জামায়াতের নিবন্ধন পুনর্বহাল হয়েছে। নির্বাচনের প্রস্তুতিতে জামায়াতই এগিয়ে আছে। বিভিন্ন পত্রিকায় এলাকাভিত্তিক যে চিত্র দেখা যায়, তাতে বেশিরভাগ আসনে বিএনপির একাধিক প্রার্থী। বিপরীতে জামায়াতের একক প্রার্থী। একটি পত্রিকায় দেখা যাচ্ছে, জামায়াত ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৬টিতে তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। তাদের নির্বাচনী সমীকরণটা হলো : জামায়াতে ইসলামী বিএনপির মতো এককভাবে নির্বাচন করবে। চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন সামনে রেখে ধর্মভিত্তিক দলগুলো একটা প্ল্যাটফর্ম গঠন করতে পারে। তবে সংস্কার আলোচনায় বিএনপির বিপরীতে অবস্থান নেওয়া দলগুলো নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) যে আলাদা মোর্চা করতে চাইছে, তার রূপ কী নেবে, এখনো পরিষ্কার নয়। নিবন্ধন ফিরে পাওয়ার অর্থ হলো, শুধু নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ পাওয়া; রাজনৈতিক শক্তির জায়গায় ফিরে আসা নয়। তবে জামায়াতকে রাজনৈতিক সমীকরণে ফেরানো হয়েছে এবং এর ফলে ‘জামায়াত বিএনপির বিকল্প’ বলে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা একবারে বেড়ে গেছে।

ছয়. জামায়াত কি বিএনপির বিকল্প? প্রশ্নটি রাজনীতির চেয়ে প্রোপাগান্ডাই বেশি। এমন ধারণা ছড়ানোর পেছনে রয়েছে কৌশলগত স্বার্থ- বিএনপিকে বিচ্ছিন্ন করা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কমানো এবং নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতার নামে বাস্তব বিকল্পের পথ রুদ্ধ করা। জামায়াত আজও আদর্শগতভাবে বিতর্কিত, সাংগঠনিকভাবে দুর্বল এবং তরুণ সমাজে অগ্রহণযোগ্য। অন্যদিকে বিএনপি রাজনৈতিক শক্তির জায়গা থেকে নানা ব্যর্থতা ও সংকটের মাঝেও একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। তৃতীয় শক্তি নামক যে শক্তিগুলোর উদ্ভব হচ্ছে, তারা বাস্তব বিকল্প নয় বরং গণতন্ত্রের ছায়ার নিচে একটি নতুন রাজনৈতিক মঞ্চসজ্জা। এই দৃশ্যপটে জনগণ কেবল ভোটার নয়, বরং সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সত্য, যাদের ভালোবাসা ও বিশ্বাস ছাড়া কোনো দলই সত্যিকারের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না। 

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত