গত বছরের অক্টোবর মাসের ৩০ তারিখ, চলছে নারী সাফের ফাইনাল। প্রথমার্ধ গোলশূন্য কাটানোর পর দ্বিতীয়ার্ধে চার মিনিটের ব্যবধানে গোল পেল বাংলাদেশ ও নেপাল। ৮০ মিনিট পর্যন্ত ওই ১-১ সমতায় চলছে খেলা। পরের মিনিটে থ্রো থেকে বল গেল বাংলাদেশের লেফট উইঙ্গারের পায়ে। একটু সামনে এগিয়ে ক্রস দেওয়ার বদলে নিলেন পাওয়ার শট। আর নেপালের দূর পোস্ট দিয়ে সেই বল জড়ালো জালে। দশরথ স্টেডিয়ামের গ্যালারির দিকে চেয়ে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে নিশ্চুপ থাকার আদেশ দিলেন চোখধাঁধানো গোলটির কারিগর। আর অমনি পিনপতন নীরবতা নেমে এলো কাঠমান্ডু জুড়ে। টানা দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশ জাতীয় নারী দলকে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠ করে বাড়ি ফিরলেন সেই কারিগর, ঋতুপর্ণা চাকমা; বাংলার সোনার কন্যা। বুধবার আরও এক কীর্তিতে দেশের পতাকার মান উঁচুতে তুলেছেন ঋতু। বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে ৭৩ ধাপ এগিয়ে থাকা মিয়ানমারকে তাদেরই মাঠে ২-১ গোলে হারিয়ে দক্ষিণ এশিয়া ছাপিয়ে এবার এশিয়ার সেরা ১২ দলের একটিতে নিয়ে গেছেন বাংলাদেশকে। দ্বিতীয় কীর্তির দিনে ঋতু নৈপুণ্যও দেখিয়েছেন দ্বিগুণ। দুর্দান্ত দুটো গোলই যে তার। শুধু গোল সংখ্যার বিচারেই নয়, মাঠে তার ফুটবল শৈলীতে পুরো দেশকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন ২১ বছরের এ সোনার কন্যা। ম্যাচশেষে নারী জাতীয় দলের হেডকোচ যেমনটি বলেছেন, ‘ঋতুর উচিত নিজের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী সৌদি, মধ্যপ্রাচ্য বা এমন উঁচু স্তরের লিগে খেলা।’
ঋতু দেশ রূপান্তরকে শুনিয়েছেন তার বেড়ে ওঠার গল্প। তার উঠে আসা রাঙ্গামাটির দুর্গম গ্রাম মঘাছড়ির অতি দরিদ্র পরিবার থেকে। বাবা ছিলেন কৃষিজীবী। কখনো দিনমজুরি করেও সংসার চালাতেন। ২০১১ সালে দেশব্যাপী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো নিয়ে ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হয়। যেই আসরে মঘাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হয়ে অংশ নেন ঋতু এবং তার স্কুল জাতীয় পর্যায়ে সেরা হয়। পরের বছর বাবা বরজ বাঁশি চাকমা ট্রায়ালে অংশ নিতে বলেন। তখন ফুটবল সম্পর্কে সেভাবে কোনো ধারণাই ছিল না তার। ট্রায়ালের প্রথম দিনেই পায়ের নখ উপড়ে গিয়েছিল। কেঁদেছিলেন খুব। জ্যাঠা বীরসেন চাকমা ছিলেন সেই স্কুলের শিক্ষক। তিনি ঋতুকে বুঝিয়ে আবার ট্রেনিংয়ে পাঠান। এভাবেই ফুটবলে হাতেখড়ি বাংলার এ সোনার কন্যার।
ছোটবেলার কোচ ছিলেন শান্তিমনি চাকমা এবং সুইহ্লামং মারমা। স্কুলের হয়ে দুবার জাতীয় টুর্নামেন্টে অংশ নেন। তবে ২০১৫ সালে তার বাবা হঠাৎ মারা গেলে পাঁচ সন্তান নিয়ে ভীষণ বিপদে পড়ে যান মা। কারণ বাবাই ছিলেন সংসারের একমাত্র অবলম্বন। ততদিনে ঋতুর প্রাথমিকে পড়া শেষ হয়ে গেছে। বাড়ি থেকে স্কুলে নিয়মিত ট্রেনিং করতে ৪০ টাকা খরচ হতো। সেই টাকা জোগাতেই হিমশিম খেতে হতো। এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন গত বছর বিএসপিএর সেরা তৃণমূল সংগঠকের স্বীকৃতি জেতা বীরসেন চাকমা। তার উৎসাহেই এ পর্যন্ত আসতে পেরেছেন। স্কুলের পাশে এক কাকার বাসায় থাকার বন্দোবস্ত করে দেন বীরসেন। স্কুলের খরচ, হাত খরচ, খেলার সরঞ্জামাদিও জ্যাঠাই কিনে দেন। তাছাড়া শৈশবের কোচ শান্তিমনি চাকমা নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করতেন ঋতুকে। এই দুজনের আগ্রহে পরের বছর বিকেএসপির ট্রায়ালে অংশ নেওয়া এবং সুযোগ পাওয়া। তবে ভর্তির জন্য তখনই ৪০-৫০ হাজার প্রয়োজন ছিল। এত টাকা জোগাড় করার সামর্থ্য আমার পরিবারের ছিল না। জ্যাঠা কীভাবে যেন সব ব্যবস্থা করেন এবং বিকেএসপিতে ভর্তি করিয়ে দেন। এক বছর বিকেএসপিতে থাকার পর ২০১৭ সালে অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় দলে সুযোগের মধ্য দিয়ে জাতীয় দলের রাডারে আসেন ঋতু। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত বাফুফে ভবনের ডরমেটরিই ঋতুর ঠিকানা। এখানে আসার পর সাবেক হেড কোচ ও বর্তমান এলিট একাডেমির কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের অধীনে ধীরে ধীরে নিজের উন্নতি করেছেন। বয়সভিত্তিক বিভিন্ন দলেও সুযোগ পেয়েছেন নিয়মিত। সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে ঋতুর অভিষেক ২০১৯ সালে। তবে তখনো নিয়মিত হননি একাদশে। ২০২৪ থেকে মূল একাদশে থাকার সুযোগ মেলে ঋতুর। আর এখন নিজের প্রচেষ্টা আর অধ্যাবসায়ে সেই ঋতুই হয়ে উঠেছেন জাতীয় দলের আনন্দ উদযাপনের শিরোমণি।
বাম উইংয়ে খেলা ঋতু গোল করার চাইতে করানোর কারিগর। তবুও এখন অব্দি জাতীয় দলের হয়ে ৩০টি ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ১১টি। ২০২২ সাফে পাকিস্তানকে ৬-০ গোলে হারানোর ম্যাচে অভিষেক গোলটি করেন ঋতু। পরের ম্যাচে ভুটানের বিপক্ষে করেন দ্বিতীয় গোলটি। পরের দুই বছরে চারটি গোল করেন সিঙ্গাপুর ও ভুটানের সঙ্গে প্রীতি ম্যাচে। ২০২৪ সাফের সেমিফাইনালে ভুটানের বিপক্ষে সপ্তম ও ফাইনালে শিরোপাসূচক গোলটি ছিল তার অষ্টম গোল। মাঝে প্রীতি ম্যাচগুলোতে গোল না পেলেও দলের সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তে জ¦লে ওঠেন ঋতু। সেটিই তিনি দেখালেন এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের শেষ দুই ম্যাচে তিন গোল করে।
দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে এবার এশিয়ায় নিজেদের সাফল্যের সাম্রাজ্য বিস্তৃত করতে চাইলে বাংলার মেয়েদের হতে হবে আরও ধারালো। সেই পথে দলের উঠতি ফুটবলারদের প্রেরণার বাতি হতে পারেন ঋতুপর্ণা চাকমা। ধৈর্য্য, একাগ্রতা, নিষ্ঠা আর মনোবলের জোরেই ঋতু হয়ে উঠেছেন দেশের সোনার কন্যা। এবার তার দেখাদেখি একই ঝলক দেখানোর অপেক্ষা বাকিদেরও। পরশ পাথরের মতো ঋতুর ছোঁয়ায় সেই পরিবর্তন আসুক পুরো দলের ভেতরে আর সাফল্য ডানা মেলুক দূর প্রান্তর জুড়ে।
