আইনের মান্যতা যখন বিরল

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৫, ১২:০৪ এএম

বর্তমানে দেশে ১৫ লাখের মতো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। আইন অনুযায়ী, সবাই কর্মচারী। গত মাসে ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুমোদনের প্রতিবাদে বেশ কয়েকদিন বিক্ষোভ করেছিলেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মচারীরা। কারণ তখন অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ সংশোধন করে ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় কর্মচারীদের অভিযোগ ছিল, সাড়ে চার দশক আগের বিশেষ বিধানের কিছু ‘নিবর্তনমূলক ধারা’ সংযোজন করে অধ্যাদেশটি করা হয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে খসড়াটি অনুমোদনের পর থেকেই এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ-মিছিল করেছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মচারীরা। এরপর আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যায়। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার সরকারি চাকরি অধ্যাদেশ সংশোধনের প্রস্তাব নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। যেখানে সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আগে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে তার কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারি কর্মচারীদের আপত্তি কেন? তাদের আশঙ্কা, এই আইনের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা বাড়বে এবং তারা হয়রানির শিকার হবেন।  

আইন সংশোধন করে চার ধরনের অপরাধের জন্য সরকারি কর্মচারীদের নিম্নপদ বা নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমিতকরণ; চাকরি থেকে অপসারণ এবং চাকরি থেকে বরখাস্তের দণ্ড দেওয়ার সুযোগ করেছে সরকার। সরকারি কর্মচারীরা যদি এমন কাজ করেন, যা অনানুগত্যের শামিল বা যা অন্য কর্মচারীর মধ্যে অনানুগত্য সৃষ্টি করে বা শৃঙ্খলা বিঘিœত করে বা কর্তব্য সম্পাদনে বাধার সৃষ্টি করে; ছুটি না নিয়ে বা যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া অন্য কর্মচারীদের সঙ্গে সমবেতভাবে বা এককভাবে কাজে অনুপস্থিত বা বিরত থাকলে; কোনো কর্মচারীকে তার কাজ থেকে অনুপস্থিত থাকতে বা বিরত থাকতে বা কর্তব্য পালন না করার উসকানি বা প্ররোচিত করলে এবং সরকারি কর্মচারীকে কাজে উপস্থিত হতে বা কাজ করতে বাধা দিলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও নিকট ভবিষ্যতে কর্মচারীদের পক্ষ থেকে কঠিন আপত্তি উঠতে পারে। এরই মধ্যে যার গুঞ্জন শুরু হয়েছে। যদি আইনটি বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে সেখানে দৃশ্যমান এমন কোনো বিষয় নেই যে, যা কর্মচারীদের জন্য দমনমূলক। তবে কোনো কর্মচারীদের আচরণ যদি জবাবদিহি এবং নিয়মানুবর্তিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তাহলে কি সরকার সেই দিকটি দেখবে না? জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ এবং নির্লোভ হলে এ নিয়ে ঘোরতর আপত্তি থাকার কথা না।

আমাদের দেশে প্রশাসন নিয়ে এমন কোনো আইন হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি? অথবা ছোট-বড় আন্দোলন? দুর্নীতি-অনিয়ম-অনাচারের বিরুদ্ধে কোনো আইন হলে, তারা ফুঁসে ওঠেন। কোনো ধরনের জবাবদিহি এবং কঠিন আইন না থাকার কারণে, ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশে মাত্র ১৫ লাখ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষ এবং সরকারকে জিম্মি করে রেখেছেন। এখান থেকে অবশ্যই আমাদের বের হতে হবে। কই? তারা তো এমন কোনো আন্দোলন করেননি, যেখানে বলা হয়েছে কোনো সরকারি কর্মচারী যদি কাজে অবহেলা করেন, কেউ যদি সামান্য অর্থও ঘুষ খান, তাহলে তাকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করে প্রশাসনিক শাস্তির আওতায় আনা হবে! এরপর তাকে কার্যবিধি অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিষয়টি বর্তমানে যে অবস্থায় রয়েছে, তাতে এটা স্পষ্ট, হয়তো এ বিষয়ে আরও জল ঘোলা হতে পারে। যে কারণে এ বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সতর্ক এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিশ্চিত করে এখন থেকেই নিশ্চিন্ত থাকতে হবে। প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে যেন সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, এ বিষয়ে যেন কোনো ধরনের বিতর্ক না ওঠে। তবে এই আইন কার্যকারিতার প্রশ্নে, কতটুকু পালিত হয় তাই-ই দেখার বিষয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত