সাধারণভাবে আমরা জানি, ক্ষমতা যত বিকেন্দ্রীকরণ হবে সেটি হয় তত কম নিপীড়নমূলক। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় আইনিভাবে স্থানীয় বা বিভাগীয় আদালত পর্যায়ে নিষ্পন্ন করা দুরূহ। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, অভিবাসন, বাণিজ্য এবং দূষণবিষয়ক জটিল বিষয়। রাজধানীর বাইরে প্রশাসনিক বিভাগীয় সদরে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের পাশাপাশি, উপজেলা পর্যায়ে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের কার্যক্রম সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন। ঢাকার পাশাপাশি সব বিভাগীয় শহরে হাইকোর্টের এক বা একাধিক স্থায়ী বেঞ্চ করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। আলোচনায় জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি হামিদুর রহমান আযাদ প্রতিটি উপজেলায় আদালত স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, ঢালাওভাবে সব উপজেলা নয়। দূরত্ব, যাতায়াত ব্যবস্থা ও মামলাজট বিবেচনায় উপযুক্ত উপজেলাগুলোতে আদালত বসানো যায়।
হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ হলে, তা সাধারণ মানুষের জন্য ভালো না খারাপ এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অনেকে বলছেন, এর সুবিধা রয়েছে। আসল সুবিধা হচ্ছে, বিচারপ্রার্থীদের জন্য জেলা পর্যায়ে আদালত স্থাপন। এতে বিচারপ্রার্থীর কষ্ট কমবে এবং দ্রুত বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের আদালতে যাওয়া-আসা সহজ হবে। মামলাজটের পরিমাণও কমে আসবে। অসুবিধা হচ্ছে এর ফলে বিচারকদের মধ্যে সমন্বয় করা কঠিন হতে পারে, দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতির সম্ভাবনা বাড়তে পারে এবং দেখা দিতে পারে ছোট আদালতে দক্ষ বিচারক এবং আইনজীবীর অভাব। বিকেন্দ্রীকরণের ফলে সামগ্রিকভাবে বিচারব্যবস্থা উন্নত হবে না অবনতি হবে, তা নির্ভর করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রকৃতি এবং ব্যবস্থাপনার ওপর। যদি সঠিকভাবে পরিকল্পনা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাহলে ইতিবাচক পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে বিকেন্দ্রীকরণ হলে, এটি বিচারব্যবস্থার জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হবে। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রয়েছে সাংবিধানিক বাধা। এ বিষয়টি অনেক আগেই নিষ্পত্তি হয়েছে। সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বলা হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের মূল আসন রাজধানী ঢাকায় থাকবে। হাইকোর্ট ডিভিশনের সেশন অন্যত্র বসানো হলেও, সেটি অস্থায়ী। এর স্থায়ী স্থানান্তর, সাংবিধানিক চেতনার পরিপন্থী। এ ছাড়া বিভাগীয় শহরে বিচারপতি, স্টাফ, অবকাঠামো ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করাও ব্যয়সাধ্য ও জটিল। এর ফলে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি বাড়বে। আবার অবকাঠামো প্রস্তুত করতে রাষ্ট্রের অর্থ, সময় ও দক্ষতার অপচয় হবে।
ইতিমধ্যে ঢাকার বাইরে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থানান্তরে সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবকে অবৈধ ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন সাধারণ আইনজীবীরা। বিভাগীয় শহরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত থেকে সরকার সরে না এলে, দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। এরই মধ্যে প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাইফুল ইসলাম। আইনজীবীরা বলছেন, ঢাকার বাইরে হাইকোর্ট স্থানান্তর না করতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা থাকলেও, তা অমান্য করে এমন প্রস্তাবনা দিয়েছে সংস্কার কমিশন, যা আদালত অবমাননার শামিল। তবে আইন ও বিচারাঙ্গনে বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, আইনজীবীদের কেউ কেউ কৌশলগত কারণেও হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণের বিরোধিতা করছেন। কেননা দীর্ঘদিন ধরে অসংখ্য আইনজীবী ঢাকায় থেকে উচ্চ আদালতে মামলা পরিচালনা করছেন। এখন হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণ হলে তারা অসুবিধার সম্মুখীন হবেন। এ জোটই হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণের বিরোধিতা করছে। কেউ বলছেন এ বিষয়ে উদ্যোগই আদালত অবমাননার শামিল। উপজেলা পর্যায়ে আদালত বিলুপ্ত হয়ে গেছে ৩৫ বছর আগে। এখন সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে সবকিছু করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধান জনগণের জন্য। বিচারপ্রত্যাশীকে দ্রুত বিচার দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেক্ষেত্রে বিচারপ্রত্যাশীর ভোগান্তি, মামলা করতে গিয়ে হয়রানি কিংবা আর্থিক সমস্যাকে বাড়তে না দেওয়াও রাষ্ট্রের কর্তব্য। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক মনে হলেও, তাদের সাংবিধানিক ও আইনিভাবে একটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে যে, মীমাংসিত একটি বিষয়ের সমাধান কী? আন্দোলন দীর্ঘায়িত হলে, মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। বিষয়টি যত দ্রুত সম্ভব, সমাধান করতে হবে। অনেকে বলছেন, একের পর এক ইস্যু তৈরি করে, ঝামেলা তৈরি করার মানে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে এই মুহূর্তে কোনো কথা যেন কেউ না বলেন। প্রকৃত সত্য, কে জানে?
