খুনের পর শতাধিক পরিবার গ্রামছাড়া

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৫, ০২:২৭ এএম

আধিপত্য বিস্তারের জেরে ছাত্রদল নেতা সোহরাব হত্যাকা-ের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের চাতলপাড় এখন এক ভুতুড়ে গ্রামে পরিণত হয়েছে। প্রতিশোধের আগুনে পুড়ছে বাড়ি, চলছে অবাধে লুটপাট। গ্রেপ্তার এড়াতে এবং পাল্টা হামলার ভয়ে গ্রাম ছেড়েছে শতাধিক পরিবার। পুরুষদের সঙ্গে গ্রাম ছেড়েছেন নারী ও শিশুরাও। তাদের কেউ আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে, আবার কারও ঠাঁই হয়েছে খোলা আকাশের নিচে।

গত ৫ জুলাই মোল্লা গোষ্ঠী ও উল্টা গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হন চাতলপাড় ইউনিয়ন ছাত্রদলের নেতা সোহরাব (২৬)। এই ঘটনার পর থেকেই পুরো ইউনিয়নে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে শুরু হয় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। ছাত্রদল নেতার মৃত্যুর চারদিন পর নাসিরনগর থানায় মামলা হয়েছে। নিহতের ভাই মোজাহিদ মিয়া বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

মামলায় ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন, বিএনপির সহসভাপতি আফসর মিয়া, ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহসভাপতি শরীফ মিয়া ও জাকারিয়া আহমেদ, কৃষকদলের সদস্য সচিব সিরাজুল ইসলামসহ ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাতলপাড় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোতাহার মিয়া (মোল্লা গোষ্ঠী) ও যুবদলের সভাপতি (উল্টা গোষ্ঠী) গিয়াস উদ্দিনের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ সংঘর্ষ হয়। এ সংঘর্ষে ছাত্রদল নেতা সোহরাব মিয়ার মৃত্যু হয়। এরপর মোল্লা গোষ্ঠীর বেশকিছু বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। কোনো পক্ষকে সমর্থন না করেও হামলার শিকার হয়েছে উপজেলা জাসাসের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল আহমেদের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

এদিকে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির পর ওই গ্রামের কাঁঠালকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। স্কুলটিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী স্কুলে যাচ্ছে না।

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক তুহিনা বেগম বলেন, ‘শিক্ষার্থীর পাশাপাশি শিক্ষকরাও আতঙ্কে আছেন। আজ প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী স্কুলে আসেনি। মাধ্যমিকের তিনটি শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থীই পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। অভিভাবকরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় তারা স্কুলে আসেনি।’

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ইসহাক মিয়া বলেন, খুব দ্রুতই শিক্ষা কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের নিরাপদে স্কুলে আসার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরেজমিনে গত সোমবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা যায়, গ্রামের পথে পথে ছড়িয়ে আছে ভাঙা কাচ, পোড়া টিন আর ল-ভ- আসবাবপত্র। কয়েকটি বাড়িতে তখনো ধোঁয়া উড়ছে। নারী-শিশুদের অনেকেই দূরের জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন।

ষাটোর্ধ্ব মমতাজ বেগম বলেন, ‘আমরা কোনো পক্ষকেই সমর্থন করিনাই। তারপরও আমার বাড়িতে মোল্লা গোষ্ঠীর লোকজন হামলা করে সব ভাঙচুর করে নিয়ে গেছে। এরপর থেকে জমিতে ঘুমাই। তিন দিন ধরে খাবারও নেই।’

সাফিয়া বেগম অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। কিন্তু মোল্লা গোষ্ঠীর লোকজন আমার ঘরটা পুড়িয়ে দিছে। আমার একটা ছেলে, সে সমিতি থেকে ঋণ নিয়া এই ঘরটা তুলছিল। আজকে আমার সব শেষ।’

চাতলপাড় বাজারের ব্যবসায়ী হামজা জানান, তার দোকানে থাকা নগদ ২৫ লাখ টাকা ও রড-সিমেন্টের দোকানের সবকিছু লুট করে নিয়ে গেছে হামলাকারীরা।

মোল্লা গোষ্ঠীর গিয়াস উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাদের মোল্লা গোষ্ঠীর ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হয়েছে। এর মধ্যে জুলহাশ মিয়া, শিশু মিয়া, আলা উদ্দিনসহ অন্তত পাঁচজনের ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে ৪০টিরও বেশি বাড়িতে।’

এদিকে, নিহতের বাড়িতে তখনো চলছে শোকের মাতম। নিহতের মা চান বানু বারবার বলছিলেন, ‘তুমরা আমার ছেলেরে ফিরাই দাও।’ সংঘর্ষে গুরুতর আহত আরও তিনজন ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন বলে জানা গেছে।

নিহতের ভাই মোজাহিদ মিয়া বলেন, ‘আমার ভাইয়ের হত্যার বিচার চাই। প্রতিপক্ষের বাড়িতে লুটপাট, হামলা ও অগ্নিসংযোগে আমরা জড়িত নই।’

এ বিষয়ে চাতলপাড় ফাঁড়ি পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের জনবল কম। তাছাড়া সেখানে যাতায়াতের তেমন কোনো সুবিধা। তাই আমাদের ওই এলাকায় যাওয়া অনেকটা কঠিন। লুটপাটের সময় নিহতের স্বজনরা টেঁটা-বল্লম ও দেশীয় নানান অস্ত্র নিয়ে চারপাশে পাহাড়া দিচ্ছে। এখানে আমাদেরও কোনো নিরাপত্তা নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত