নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতা এলাকার বাসিন্দা মনির হোসেন রাজধানী ঢাকার মতিঝিলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। প্রতিদিন তিনি ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াত করেন। কিন্তু নিত্যদিনের যানজট তাকে নাজেহাল করে তুলেছে। অফিসে যেতে দেরি হওয়ায় বসের কাছ থেকে তিরস্কার শুনতে হয়। বাড়ি ফেরার সময়ও দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকতে হয়, ফলে বাড়ি পৌঁছাতে রাত হয়ে যায়। মনির হোসেনের মতো শত শত সাধারণ মানুষ এই মহাসড়কে যানজটের কারণে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম মহাসড়ক ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। এ সড়কটি সিলেট, ভৈরব, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলার সঙ্গে রাজধানীকে সংযুক্ত করেছে। প্রতিদিন এ সড়কে শত শত দূরপাল্লার মালবাহী ট্রাক, বাস এবং গণপরিবহন চলাচল করে। বর্তমানে মহাসড়কটি আট লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে, যা যানজটের অন্যতম কারণ। নির্মাণকাজের জন্য সড়কের কিছু অংশ সংকুচিত হয়েছে, ফলে যানবাহন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছে না। এ ছাড়া অবৈধ বাসস্ট্যান্ড, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, নিয়ম ভঙ্গ করে বিপরীত দিকে গাড়ি চালানো, সড়কের প্রশস্ততা কম হওয়া এবং হঠাৎ গাড়ি বিকল হওয়াও যানজটের জন্য দায়ী। এ যানজটের প্রভাব শুধু ঢাকা-সিলেট মহাসড়কেই সীমাবদ্ধ নয়, রূপসী-কাঞ্চন সড়কেও দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাইওয়ে পুলিশ চেকিংয়ের নামে চাঁদাবাজি করে, যা যানজট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমিনুল নামে এক বাসচালক বলেন, ‘রাস্তার কাজের জন্য প্রতিদিন যানজট লেগে থাকে। এতে আমাদের সময় নষ্ট হয়, ইনকাম কমে যায়। যাত্রীদের কাছে বাড়তি ভাড়া চাইলেও তারা দিতে চায় না। এক ট্রিপে যেতে-আসতেই পুরো দিন চলে যায়।’ তিনি বলেন, যানজটের কারণে চালকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, যা তাদের জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলছে।
যাত্রীদের অবস্থা আরও করুণ। আব্বাস ভূঁইয়া নামে একজন যাত্রী জানান, তিনি তার বাবাকে চিকিৎসার জন্য রূপসী থেকে রাজধানীর পপুলার হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সকাল ১০টায় বের হয়েও দেড় ঘণ্টায় মাত্র এক কিলোমিটার এগোতে পেরেছেন। তিনি বলেন, ‘দুপুর ১টার পর ডাক্তার পাওয়া যাবে না। এভাবে গেলে বাবার চিকিৎসা করানো সম্ভব হবে না, তার অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে।’ আরও গুরুতর সমস্যার কথা জানান আব্দুল হক নামে এক অ্যাম্বুলেন্স চালক। তিনি বলেন, ‘জরুরি রোগীদের ঢাকায় নিতে এ সড়ক ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু যানজটের কারণে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়। কখনো কখনো রোগী গাড়িতেই মারা যান।’ তিনি প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা এবং হাইওয়ে পুলিশের চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে বলেন, যানজট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
যাত্রী সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘রূপসী থেকে ভুলতা যেতে সাধারণত ১০ মিনিট লাগে, কিন্তু যানজটের কারণে দুই ঘণ্টায়ও পৌঁছানো যায় না। এ ভোগান্তি আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।’ তিনি সড়কের অব্যবস্থাপনার জন্য প্রশাসনকে দায়ী করেন।
এ বিষয়ে ভুলতা হাইওয়ে পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ জাহানূর আলী বলেন, ‘আট লেনে উন্নীতকরণের কাজের জন্য যানজট হচ্ছে। তবে পুলিশ তৎপরভাবে কাজ করছে। রূপসী ও বরপায় টহল টিম মোতায়েন রয়েছে।’
তবে স্থানীয়দের দাবি, এ পদক্ষেপ যানজট নিরসনে যথেষ্ট নয়। যানজট নিরসনে স্থায়ী সমাধানের জন্য নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করা, অবৈধ বাসস্ট্যান্ড উচ্ছেদ, ট্রাফিক নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং হাইওয়ে পুলিশের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় এ মহাসড়কে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমার কোনো লক্ষণ নেই।
