পলাশীর ষড়যন্ত্রে যুদ্ধজয়ী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সমুদ্রবন্দরের সুবিধার জন্য মুর্শিদাবাদ থেকে রাজধানী সরিয়ে তিনটি গ্রাম সুতানটি, গোবিন্দগঞ্জ এবং কলকাতাকে নিয়ে কোম্পানি রাজধানী গড়ে তুলেছিল। বাঙালি অধ্যুষিত নগরটির নামকরণ করা হয়, ‘কলিকাতা’। কলকাতাকে শাসক ইংরেজ সাজিয়েছিল লন্ডনের আদলে। কলকাতা হয়ে উঠেছিল প্রাচ্যের লন্ডন। এই কলকাতাকে কেন্দ্র করেই উপমহাদেশ জুড়ে গড়ে তুলেছিল ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য। ‘ভাগ কর এবং শোষণ কর’ নীতিতে বঙ্গভঙ্গের কূটচাল চেলেছিল চতুর ইংরেজ। সেই স্বপ্নের মোহভঙ্গে ক্ষুব্ধ ইংরেজ ১৯১২ সালে কলকাতা থেকে রাজধানী দিল্লি সরিয়ে নেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত, ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল কলকাতা। ভারতবর্ষের অপরাপর জাতিসত্তার চেয়ে বাঙালিরা চিন্তা, কর্ম, মনন, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি চর্চাসহ রাজনীতিতে ছিল অগ্রবর্তী। সেই বাঙালি সংস্কৃতির কলকাতা এখন অতীতের গৌরবময় ঐতিহ্য হারিয়ে বিপন্নপ্রায়। কলকাতার বাংলা ভাষার সাহিত্য এখনো মাথা উঁচু করে আছে বাংলাদেশের পাঠকের কারণে। বাংলা ভাষা ছেড়ে বাংলা সাহিত্যিকরা মুম্বাই ছোটেনি। অথবা সাহিত্য ভাষার কারণে ছুটে যাওয়ার উপায় নেই বলে এখনো বাংলা সাহিত্য সৃষ্টিতে কলকাতার সাহিত্যিকরা অবদান রেখে যাচ্ছেন। তবে এটি ঠিক, বাংলা ভাষার পাঠক নিয়মিতভাবে কমে এসেছে। বাংলাদেশে যেমন পশ্চিমবঙ্গেও তেমনি। আমাদের দেশে প্রকাশনা শিল্পে উৎকর্ষ সাধনসহ প্রচুর বই প্রকাশিত হচ্ছে, তবে মোটা দাগের চটুল ও হালকা সেন্টিমেন্টের মাত্র ক’জন লেখকের বইই বাজার মাত করছে। সৃজনশীল গবেষণা, ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পন্ন লেখকের বই কিন্তু সে তুলনায় পাঠকপ্রিয়তা লাভে ব্যর্থ হচ্ছে। আমাদের তরুণদের মাঝে বিশেষ বিশেষ লেখকের চটুল বই কেনা এবং পড়া অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। দেশের শিক্ষিত জনসংখ্যার তুলনায় বই পড়ার পাঠক বাড়েনি বরং আনুপাতিক হারে কমেছে। নতুন প্রজন্মের খুব কম সংখ্যক বই পড়ে। বেশিরভাগই কম্পিউটার, ইন্টারনেট, স্মার্টফোন আর আকাশ সংস্কৃতির জ¦রে আক্রান্ত। যদিও পাঠকপ্রিয়তা লাভেই বইয়ের গুণাবলি বিবেচিত হয় না। বইয়ের দার্শনিকতা ও ইতিহাস নির্ভরতাই ভালো বইয়ের চূড়ান্ত মাপকাঠি। সেসব গুণাবলি সমৃদ্ধ বই পাঠকপ্রিয়তা না পাওয়ার মূলে রয়েছে, আমাদের বিকলাঙ্গ চিন্তাচেতনা সর্বোপরি রুগ্্ণ মানসিকতার তৎপরতা।
কলকাতার সুবিধালোভী মধ্যবিত্ত বাঙালি যেমন সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠার পেছনে ছুটতে গিয়ে বাংলা ভাষাকে পরিত্যাগ করে ইংরেজি-হিন্দি নির্ভর হয়ে উঠেছে, একইভাবে আমাদের দেশেও বিত্তবান এবং মধ্যবিত্তরা পার্থিব প্রতিষ্ঠার মোহে বাংলা ভাষার পাঠ্যক্রম পরিহার করে ইংরেজি মাধ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ভারতের প্রাদেশিক ভাষার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো প্রভাব বা চাপ যে নেই তা যেমন বলা যাবে না; তেমনি বলা যাবে না রাজ্য সরকারগুলোর সীমাবদ্ধতার কথাও। আমাদের ক্ষেত্রে তো তেমন আশঙ্কা নেই। তবে আমরা কেন ওই একই পথে এগোচ্ছি? আমাদের অভিজাত শ্রেণি গণসমষ্টির বাইরে বিচ্ছিন্ন পৃথক এক জগৎ গড়ে তুলেছে। যার সঙ্গে গণসমষ্টির কোনো যোগসূত্রতা নেই। নেই কোনো মিলও। অভিজাতরা তাদের নিজস্ব সুযোগ-সুবিধার মসৃণ জগৎটি গড়ে তুলেছে। অপরদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ সুবিধাবঞ্চিত গণমানুষেরা এই সুবিধাভোগীদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। রাষ্ট্রের যত সুবিধা, অধিকার একচেটিয়া বিত্তবান-অভিজাতরাই ভোগ করে যাচ্ছে এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতাও তাদেরই হাতে। সমষ্টিগত মানুষ অধিকার এবং সুবিধাবঞ্চিত অতিসাধারণ এবং নিম্নমানের জীবনযাপন করলেও রাষ্ট্র ও শাসক শ্রেণি তাদের পক্ষে কখনো ছিল না এবং আজও নেই। আজকে আমাদের রাষ্ট্রভাষাও অবহেলিত এবং বৈষম্যের শিকার। আমাদের সমাজে মধ্যবিত্তের সুবিধাবাদী আকাক্সক্ষা প্রবল থেকে প্রবলতর হয়েছে। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির রক্ষায় নানা কর্মকাণ্ডে যারা সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা অর্জন করেছেন, তাদের অনেকেই মধ্যবিত্তের আকাক্সক্ষা মুক্ত নন। তাদের সন্তানরা ইংরেজি মাধ্যমে এবং বিদেশে পড়াশোনা করছে। স্ববিরোধিতার রোগে আক্রান্ত এসব বরেণ্য ব্যক্তিরা নিজেরা প্রচার মাধ্যমে যা বলেন নিজের ঘরে সেটা পালন করেন না। বিকারগ্রস্ত মধ্যবিত্তের আকাক্সক্ষায় এসব ব্যক্তি কার্যত অদ্ভুত প্রতারণায় নিজেদের যুক্ত করে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করে যাচ্ছেন। ভারতের সরকারি হিন্দি, রাষ্ট্রভাষা নয়। তাই হিন্দির প্রভাব ভারত জুড়ে থাকবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। প্রশ্নটা হলো, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কি পশ্চিমবঙ্গের ন্যায় হিন্দির আগ্রাসন ঘটেনি? বেপরোয়া আকাশ সংস্কৃতির কারণে আমাদের দেশেও ঘরে ঘরে হিন্দি ছবি-সিরিয়াল হতে হিন্দি অনুষ্ঠান দেখার আধিক্য মারাত্মক আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের সংস্কৃতিতেও হিন্দির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। বেসরকারি টিভিগুলোতে এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। হিন্দি স্টেজ অনুষ্ঠানের আদলে এবং হিন্দি গানের প্রতিযোগিতার অনুকরণে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোতে চলছে একই ধারা। তবে ভাষা এখনো বাংলা এই যা ভরসা। তবু এগুলো অবশ্যই হিন্দির রিমেক ভিন্ন অন্য কিছু নয়। পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্যবরণ আমরা হয়তো করব না। তবে হিন্দির এই আগ্রাসনে আমাদের সংস্কৃতিতে-রুচিতে যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে, তা উদ্বেগজনক। আমাদের সমাজে হিন্দি সংস্কৃতির উগ্র প্রভাব বৃদ্ধির নমুনা নিয়মিতই দেখছি। পাকিস্তানি শাসকরা দুই যুগব্যাপী আমাদের উর্দুভাষীতে পরিণত করার প্রবল চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিল। অথচ আজকে বাংলাদেশের শিশু-কিশোর হতে সব বয়সী মানুষের মধ্যে হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির প্রভাব-প্রচলন নানাভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
ফার্সি জাতিসত্তার ইরানের সঙ্গে আরবদের সম্প্রদায়গত মিলও জাতিগত অমিলের কারণে বৈরিতায় পরিণত হয়েছে। আরবদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও পারস্য নিজেদের অধিক সমৃদ্ধ ফার্সি ভাষা-সংস্কৃতি ত্যাগ করে আরবি ভাষা-সংস্কৃতি গ্রহণ করেনি। আরব ও ফার্সিদের জাতিগত বিরোধ-বিদ্বেষ সুদূর অতীতের ন্যায় আজও টিকে আছে। নানাভাবে এই বিরোধ বিদ্বেষের প্রতিফলন দেখা যায়। মুসলিম আরব রাষ্ট্রগুলোর আরব লিগের নিকট প্রতিবেশী ইরানকে অন্তর্ভুক্ত না করার মূল কারণটি জাতিগত ভিন্নতা। সম্প্রদায়গত অভিন্নতার চেয়েও জাতিগত ভিন্নতা আরবি-ফার্সি বিভাজনের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে। বিস্ময় এই যে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে পাকিস্তানি হানাদার পাঞ্জাবিদের বিরুদ্ধে তীব্র বিষোদগারের বিরূপ প্রভাব পড়েছিল ভারতীয় পাঞ্জাবিদের ওপর। বিক্ষুব্ধ ভারতীয় শিখ-পাঞ্জাবিদের প্রতিবাদের মুখে, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সম্প্রচার বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছিল। পাকিস্তানি এবং ভারতীয় পাঞ্জাবিদের সম্প্রদায়গত ভিন্নতা হার মেনেছিল তাদের জাতিগত ঐক্যের কাছে। মানুষ তার সবকিছু পাল্টাতে পারলেও জাতিসত্তাকে পাল্টাতে পারে না। যে কেউ হিন্দু থেকে খ্রিস্টান, বৌদ্ধ থেকে মুসলিম, ইহুদি থেকে শিখ ধর্মাবলম্বী তাৎক্ষণিক হতে সক্ষম হলেও, তার জাতিসত্তা পাল্টাতে পারে না। একজন বাঙালি বিলেতে পঞ্চাশ বছর বসবাস করে ইংরেজের সমস্ত কৃষ্টি-সংস্কৃতিতে পরিপূর্ণ অভ্যস্ত এবং পারদর্শী হলেও, তার পক্ষে ইংরেজ হওয়া অসম্ভব। একইভাবে কোনো জাতিসত্তার কেউ অন্য জাতিসত্তায় পরিণত হতে পারবে না। আর জাতিসত্তার ভিত্তিমূলেই ভাষা-সংস্কৃতি।
একমাত্র ভাষানির্ভর নির্ভেজাল এবং যথার্থ জাতীয়তাবাদী চেতনাই পারে গণতন্ত্রকে বিকশিত করে সব মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে। তেমন প্রত্যাশা পূরণ আমাদের ক্ষেত্রে হয়নি। বারবার তা ব্যাহত হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে সাংস্কৃতিক উন্মেষ ঘটেছিল, তাও বারবার পথ হারিয়েছে। ভাষা আন্দোলনের চেতনার ধারাবাহিকতায় স্বাধিকার আন্দোলন এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। ভাষার দাবিটিই মুক্তিযুদ্ধের অভিমুখে আমাদের এগিয়ে দিয়েছিল। স্বাধীনতার পর সেই বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হলেও রাষ্ট্রভাষার সর্বজনীন প্রচলন ঘটেনি। বরং বৈষম্যের শিকার বাংলা ভাষা সাধারণের ভাষায় পরিণত হয়েছে। অপরদিকে বিত্তবান ও মধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রে শিক্ষা-দীক্ষা এবং ভাষা-সংস্কৃতিতে বাংলার পরিবর্তে স্থান পেয়েছে হাওলাতি বিদেশি ভাষা। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা চরম আকার ধারণ করেছে। সমষ্টিগত উন্নতির বিষয়টিকে কেউ বিবেচনা করছে না। এই আত্মকেন্দ্রিকতার অবসান এবং সমষ্টিগত মানুষের মুক্তির মধ্য দিয়েই সমষ্টিগত মানুষের ভাষা-সংস্কৃতি সর্বজনীন হতে পারবে। অন্য কোনো বিকল্প পথে সম্ভব হবে না। মূল ব্যাধিটি বিদ্যমান ব্যবস্থা; সেটির আমূল পরিবর্তন কেবল জরুরি নয় অপরিহার্যও বটে।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত
