১১ মাসে ২৭ খুনে উৎকণ্ঠা

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৫, ০৬:৪৯ এএম

খুলনা মহানগরীতে ক্রমবর্ধমান অপরাধ, বিশেষ করে হত্যাকাণ্ড, সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও উৎকণ্ঠা ছড়াচ্ছে।

১১ মাসে খুলনায় ২৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যা নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। সন্ত্রাসী তৎপরতা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই এবং ধারালো অস্ত্রের হামলার ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সবশেষ গত রবিবার সন্ধ্যা ৭টায় খাদ্য বিভাগের পরিদর্শক সুশান্ত কুমার মজুমদারকে ভৈরব নদের ৪ নম্বর ঘাট এলাকা থেকে কয়েকজন অপহরণকারী পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায়। তারা ট্রলারে করে তাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে মুক্তিপণ দাবি করে। ঘটনাটি জানাজানি হলে তার স্ত্রী মাধবী রানী মজুমদার খুলনা থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর তেরখাদা উপজেলার আজগড়া বিআরবি উচ্চবিদ্যালয় থেকে হাত-পা ও চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনা নগরীর অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি চিত্র তুলে ধরে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) তথ্যানুসারে, গত ১১ মাসে ২৭টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দুটি মামলা নৌপুলিশ তদন্ত করছে, কারণ লাশ নদীতে ভেসে এসেছিল। বাকি ২৫টি মামলা কেএমপি তদন্ত করছে। এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মতো কারণ চিহ্নিত হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে প্রায়ই আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও মাদকের চালান উদ্ধার হচ্ছে, তবু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসছে না।গত ১১ জুলাই দুপুরে মহেশ্বরপাশা পশ্চিমপাড়ায় সাবেক যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমানকে (৩৮) গুলি করে ও পায়ের রগ কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় সজল শেখ নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যিনি হত্যাকারীদের মাহবুবের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিলেন। তার তথ্যের ভিত্তিতে মোটরসাইকেল আরোহী তিন দুর্বৃত্ত হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

এর আগে গত ১০ জুলাই রাতে আহসান আহমেদ রোডে বাগেরহাট জেলা পুলিশ সুপার অফিসের প্রধান সহকারী মো. হাফিজুর রহমান (৫৮) ক্ষুরের আঘাতে গুরুতর আহত হন। ৫ জুলাই রাতে লবণচরা থানার মুজাহিদপাড়ায় মেহেদি হাসান রোহান (২১) গুলিবিদ্ধ হন। ৪ জুলাই ওয়েস্টার্ন ইন হোটেল থেকে শান্তা ইসলাম (৪২) নামের এক নারীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২৬ জুন রাতে হরিণটানা থানার রাজবাঁধ এলাকায় বাবলু দত্ত (৫০) হত্যার শিকার হন।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব মো. বাবুল হাওলাদার বলেন, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামিনে মুক্তি পাওয়া ও পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসীরা এলাকায় ফিরে এসেছে। কিশোর গ্যাং ও বখাটেরাও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মাদক বিক্রি, আধিপত্য বিস্তার ও প্রতিশোধের কারণে হত্যাকাণ্ড এবং অপরাধ বাড়ছে। তিনি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের তৎপরতা বাড়ানোর দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘মহানগরী এখন সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।’

গত রবিবার কেডি ঘোষ রোডে বিএনপির সমাবেশে নেতারা অভিযোগ করেন, বর্তমান পুলিশ কমিশনারের দায়িত্বকালে ১১ মাসে ২৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। মানববন্ধন, মিছিল ও স্মারকলিপি দিলেও পুলিশ প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় তারা হতাশ। তারা দাবি করেন, ৫ আগস্টের পর এক মাস বিএনপি নেতাকর্মীরা ধর্মীয় ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পাহারা দিয়েছিলেন, তখন কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটেনি।

কেএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খান বলেন, মাদক ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ড ঘটছে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো বিভক্ত হয়ে তাদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। তবে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নিয়মিত অভিযান, আসামি গ্রেপ্তার ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। নগরবাসী এখন নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ এবং জনগণের সহযোগিতা এখন সময়ের দাবি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত