কোটি টাকার প্রকল্প অকেজো

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৫, ০৮:১৫ এএম

নেত্রকোনা শহর ঘিরে রেখেছে মগড়া নদী। স্রোতহারা হলেও এখনো মগড়া শহরের প্রাণ। তবে দখল দূষণ আর নদীর বুকে ময়লায় হাঁসফাঁস করছে নদীটি।

নেত্রকোনা জেলা শহর প্রথম শ্রেণির তালিকাভুক্ত পৌরসভা। ১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর নেত্রকোনা পৌরসভাকে ১৯৯৬ সালে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়। বর্তমানে এ শহরটিতে কয়েক লাখ মানুষের বসবাস। আর দিন যত যাচ্ছে বাড়ছে মানুষের বসতি। বাড়ছে নাগরিক চাহিদা আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ। তবে পৌরসভার নাগরিকের ঘাড়ে করের বোঝা চেপে দিলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে পৌরসভাকে।

দিনভর শহরের জয়ের বাজার, সাতপাই, কুরপাড়, নাগড়া, মোক্তারপাড়াসহ অলিগলির সংগৃহীত ময়লা আবর্জনা ফেলার জন্য পৌর শহরের বাহিরচাপড়া এলাকায় তিন দশমিক শূন্য পাঁচ একর জায়গায় ৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ে স্যানিটারি ল্যান্ডফিলের অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। ২০২৪ সালের এপ্রিলে অনেকটা ঢাকঢোল পিটিয়েই স্যানিটারি ল্যান্ডফিলটি উদ্বোধনও করেন তৎকালীন পৌর মেয়র। তবে উদ্বোধনের পর এক বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি পৌরসভার বহুল কাক্সিক্ষত এ প্রকল্প।

এ প্রকল্প ময়লা-আবর্জনা প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য যন্ত্রপাতি স্থাপন করার কথা থাকলেও তার কোনো কিছুই হয়নি। শুধু কোটি টাকায় নির্মিত হয়েছে ভবন; যার ভেতরে-বাইরে ফেলা হচ্ছে মেডিকেল, মরা জীবজন্তুসহ সব ধরনের বর্জ্য। বিষাক্ত ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে আশপাশের পরিবেশও, যা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই পৌর কর্তৃপক্ষের। উল্টো দিনেদুপুরে তীব্র দুর্গন্ধের ময়লার ট্রাক চলাচল করছে শহরের প্রধান সড়কে।

স্থানীয়রা বলছেন, শতভাগ নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই স্যানিটারি ল্যান্ডফিলটি নামেমাত্র উদ্বোধন করায় কোনো কাজে আসছে না। উল্টো আবর্জনা ফেলা হচ্ছে ফসলি জমি, লোকালয় ও ল্যান্ডফিলটির আশপাশেই। দুর্গন্ধ আর বিষাক্ত ধোঁয়ায় একদিকে যেমন জনজীবনে বিপর্যয় নিয়ে এসেছে, তেমনি সামাজিক কাজকর্মেও দেখা দিয়েছে বিপত্তি। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে বন্ধ হয়ে গেছে জায়গা জমি কেনাবেচা। এমনকি বিয়ে পর্যন্ত ভেঙে যায় এলাকার নাম শুনলেই। একাধিকবার পৌরসভাকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পায়নি বলে অভিযোগ নগরবাসীর।

বাহিরচাপড়া এলাকার বাসিন্দা হাজেরা আক্তার বলেন, ময়লা প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য একটি ল্যান্ডফিল তৈরি করল, তা কোনো কাজে আসছে না। এখন এ সড়ক দিয়ে আমাদের চলাচল করতে ভয় হয়। বিশেষ করে রাতে কোনোভাবেই চলাচল করা যায় না। এই রাজুর বাজার এলাকায় বড় একটি গরুর হাট ছিল। এই গরু হাটটিও বন্ধ হয়ে গেছে ময়লা ফেলার কারণে। এ ছাড়া সব ময়লা এখানে ফেলার ফলে তীব্র দুর্গন্ধ আর মশা-মাছির কারণে ঘরবাড়িতে থাকাই যায় না। বাড়ির শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ, অনেকের এখন শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। আমরা এ ব্যাপারে বারবার কর্তৃপক্ষকে জানিও কোনো প্রতিকার পাইনি।

আরেক বাসিন্দা বলেন, ২০১৯ সালে এই এলাকায় বসতি তৈরি করলেও এখন বসবাস করায় দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে যদি জানতাম যে এই এলাকার পরিস্থিতি এমন নাজুক হবে, তাহলে কখনই বাড়ি করতাম না। লাখ লাখ টাকা খরচ করে বাড়ি তৈরি করে এখন বসবাস করা যায় না দুর্গন্ধ আর ময়লা আবর্জনার কারণে।

এ ময়লাখানার কারণে এই এলাকায় কোনো বিয়ের কথাবার্তা হয় না। এলাকার নাম শুনেই বিয়ে ভেঙে যায়। এখানে যারা বসবাস করে তারা সবারই একই অবস্থা। একে তো ময়লা-আবর্জনা, তার ওপর চলাচলের রাস্তা থেকে শুরু করে সর্বত্রই ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকে। দিনরাত কুকুর-শিয়াল সবকিছুই এই ময়লা-আবর্জনা খেয়ে আরও হিংস্র হয়ে উঠছে। মানুষ এখন এই এলাকা দিয়ে ভয়ে আতঙ্কে চলাচল করে না।

পরিবেশকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জনউদ্যোগের ফেলো শ্যামলেন্দু পাল বলেন, নেত্রকোনা পৌরসভা থেকে ময়লা আবর্জনা ফেলার জন্য একটি ল্যান্ডিং স্টেশন তৈরি করা হয়েছিল এবং এটা ঘটা করে উদ্বোধন করা হয়েছিল। আমরা যত্রতত্র ময়লা ফেলতে দেখছি। এই যে ল্যান্ডিং স্টেশনটা এটা কোনো কাজেই আসছে না। এটা অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। প্রতিদিন শত শত টন বর্জ্য নেত্রকোনা রাস্তার আশপাশে ফেলা হচ্ছে। এমনকি মগড়া নদীতে প্রতিদিন আবর্জনা ফেলে নষ্ট করা হচ্ছে। এতে আমাদের নদীর ক্ষতি হচ্ছে। নদীর পানি নষ্ট হচ্ছে। পরিবেশ দূষিত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হচ্ছে। এত ঘটা করে যদি ল্যান্ডিং স্টেশন উদ্বোধনী করা হয়, তাহলে সেখানে কেন এই ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে না। এখানে কি পৌর কর্তৃপক্ষের লোকের অভাব নাকি অলসতা? সেই জিনিসটা আমাদের জানা নেই।  পাশাপাশি আমাদের নাগরিকদেরও আরও সচেতন হতে হবে। তাই যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ করে সঠিক স্থানে আমাদের ময়লা ফেলার অভ্যাস তৈরি করতে হবে।

নেত্রকোনা পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবির জানান, নেত্রকোনায় ইউজিপি থ্রি প্রকল্পের আওতায় ময়লা-আবর্জনা প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য একটি ল্যান্ডিং স্টেশন তৈরি করা হয়েছে। কথা ছিল এই ল্যান্ডফিল পরিকল্পিতভাবে ময়লা-আবর্জনা রিসাইকেল করা হবে। ল্যান্ডফিল্ড তৈরি করার পর যে অবকাঠামোগুলো তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো ঠিক আছে। প্রজেক্টের আওতায় যতগুলো কার্যক্রম ছিল, সবই সম্পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু এটা অপারেশন এবং ফাংশনিংয়ের জন্য যে যন্ত্রাংশ দরকার, সেই জিনিসগুলো আমাদের দেওয়া হয়নি। না দেওয়ার কারণে পরিকল্পিতভাবে যে ময়লা ফেলতে হবে আমরা সেটা পারছি না।

কারণ ল্যান্ডিং স্টেশনে ময়লা ফেলতে হলে ব্লক আকারে ফেলতে হবে। যে গার্বেজটা তৈরি হয় সে গার্বেজ থেকে অপচনশীল, পলিথিনসহ সবকিছু আলাদা করতে হবে। অপচনশীল বর্জ্য ধাপে ধাপে ফেলে স্তরে স্তরে বালু ফেলে তা থেকে সার তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে আয়ের করার একটি কথা ছিল। এখন এ প্রকল্পের জন্য যা কিছু দরকার তার অবকাঠামো হয়েছে, তবে ফাংশনিং করার জন্য যা যা দরকার কোনো কিছুই নেই। এই প্রকল্প থেকে আমাদের সরবরাহ করা হয়নি। এটিকে পুরোপুরি কার্যকর করতে হলে যন্ত্রাংশের প্রয়োজন। যন্ত্রাংশ ছাড়া এটিকে কোনোভাবেই কার্যকর করা যাবে না। এখন আমরা কোনো পথ না পেয়ে ম্যানুয়ালভাবে শহরের ময়লা-আবর্জনা ল্যান্ডফিলের ভেতরে ফেলছি। পুরোপুরি কার্যকর করতে ঊর্ধ্বতন ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত