বিধ্বস্ত ভবনগুলো এখন ইসরায়েলের শত্রু!

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৫, ১২:৪২ এএম

ইসরায়েল গাজা উপত্যকা জুড়ে পরিকল্পিতভাবে হাজার হাজার আবাসিক ভবন-নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস করছে। চলতি বছরের মার্চে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী এই ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেছে। শহর ও শহরতলির বিস্তীর্ণ এলাকা, যেখানে একসময় লাখো মানুষের বাসস্থান ছিল, তা এখন ধুলোয় মিশে গেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে ব্যাপক ধ্বংসের চিহ্ন স্পষ্ট। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, এসব এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

বিবিসি জানিয়েছে, ধ্বংস করা ভবনগুলোর মধ্যে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ও অক্ষত উভয় ধরনের স্থাপনা রয়েছে। যাচাই করা ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বহুতল ভবন, স্কুল ও অন্যান্য অবকাঠামো কীভাবে ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধ্বংসযজ্ঞ জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘন করতে পারে, যা দখলদার শক্তির পক্ষে অবকাঠামো ধ্বংসকে নিষিদ্ধ করে। এটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছে, তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনে কাজ করছে এবং হামাস বেসামরিক এলাকায় সামরিক স্থাপনা লুকিয়েছে বলে ভবন ধ্বংস করা হচ্ছে। তবে বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ধ্বংস করা ভবনগুলোর বেশিরভাগই পূর্বপরিকল্পিতভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে অনেক ভবন এখনো ব্যবহারযোগ্য ছিল।

জুলাই মাসে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ রাফাহ নগরীর ধ্বংসাবশেষে একটি ‘মানবিক শহর’ গড়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। এ পরিকল্পনায় প্রাথমিকভাবে ছয় লাখ ফিলিস্তিনিকে রাখা এবং পরে তাদের অন্য দেশে পাঠানোর কথা বলা হয়। এই পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেছেন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট, যিনি এটিকে ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’র সঙ্গে তুলনা করেছেন।

বিবিসি ভেরিফাই ৪০টি স্থানে অবকাঠামো ধ্বংসের ফুটেজ শনাক্ত করেছে। তেল আল সুলতানের মতো এলাকায় আবাসিক ভবন, স্কুল, প্রসূতি হাসপাতাল, এতিমখানা ও শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রও ধ্বংস করা হয়েছে। রাফাহ নগরীর এই প্রাণবন্ত এলাকাটি ইতিমধ্যে বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, কিন্তু গত ১৩ জুলাইয়ের মধ্যে প্রায় সব ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। গাজার অন্যান্য অংশ, যেমন কৃষিনির্ভর শহর খুজা’আ ও আবাসন আল-কবিরা ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। খুজা’আতে ১ হাজার ২০০ ভবন ধ্বংস করা হয়েছে, যেখানে একসময় ১১ হাজার মানুষ বাস করত। আবাসন আল-কবিরার ২৭ হাজার জনসংখ্যার অনেকেই এখন গৃহহীন।

ইসরায়েল ‘নিরাপত্তা করিডর’ ও ‘বাফার জোন’ তৈরির জন্য এই ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ইতান ডায়মন্ড বলেন, সামরিক প্রয়োজন ছাড়া বেসামরিক সম্পদ ধ্বংস করা যুদ্ধাপরাধ।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইসরায়েল গাজায় দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরি করতে চায় বা ফিলিস্তিনিদের গাজা ছাড়তে বাধ্য করতে চায়। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, এই ধ্বংসের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের ফিরে আসার জায়গা বন্ধ করা হচ্ছে। গাজার বাসিন্দারা হতাশ। তেল আল-সুলতানের বাসিন্দা মোয়াতাজ ইউসুফ আল-আবসি বলেন, ‘আমার সব স্বপ্ন ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার আর কোনো ঘর বা আশ্রয় নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত