২০১৪ সাল থেকে পরিবারকে নিয়ে ঢাকার গাজীপুরে থাকতেন গাইবান্ধার সুজন মিয়া। জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নিহত হন তিনি। একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতেন সুজন। একমাত্র উপার্জনক্ষমকে হারিয়ে দিশেহারা সুজনের পরিবার। বৃদ্ধ মা ও দুই সন্তানের মুখে ডালভাত জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন স্ত্রী লাইজু বেগম। তাই সরকারের কাছে কাজ চেয়ে লাইজু বলেন, একটা চাকরির ব্যবস্থা হলে, অনেক ভালো হতো। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি না থাকলে, কী অসুবিধা হয়, যার নেই, সেই বোঝে। মানুষের দেওয়া টাকায় কতদিন চলবে।
সুজনের মৃত্যুর পর জামায়াতে ইসলামী ও জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। এ ছাড়া কেউ খোঁজখবর নেয় না বলে আক্ষেপ করেন লাইজু। ৬ শতক বসতভিটা ছাড়া তাদের কোনো সম্পদ নেই। সেখানে টিনশেড এক ঘরে থাকেন জুলাই যোদ্ধার স্ত্রী, সন্তান ও মা।
শহীদ সুজনের বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার খোলাহাটি ইউনিয়নের রথবাজার ফকিরপাড়া গ্রামে। বৃদ্ধ মা, স্ত্রী, মেয়ে সুমনা আক্তার ও ছেলে নাহিদ ইসলামকে নিয়ে ছিল পাঁচ সদস্যের সংসার। নাহিদ ইসলাম একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হলেও মেয়ের লেখাপড়া এখন বন্ধ।
সুজনের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী পোশাক কারখানার চাকরি ছেড়ে সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে সুজন মিয়ার বাড়ি। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই দেখা মিলল সন্তানহারা মা ছালমা বেগমের। আহাজারি করে তিনি বলেন, ‘হামার দুনিয়ার বুকে আপোন আছিলো হামার বেটা। নাড়িছেঁড়া ধন, হামার মানিক সাত আজার ধন আসিছিলো। হামার বেটা তো আর দুনিয়াত নাই। দেশের জন্যে যুদ্ধ করি হামার বেটাটা মরি গ্যাছে, এখন নাতিগুল্যাক দেখবে ক্যাডা?’
ঘরের মধ্যে শহীদ সুজনের স্ত্রী লাইজু বেগমের কান্নার শব্দে বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে। মৃত স্বামীর ছবি হাতে নিয়ে তিনিও বিলাপ করছেন। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ৫ আগস্ট। আমাদের পোশাক কারখানা বন্ধ ছিল। দুপুরবেলা বাসায় খাইতে আসল সুজন। মিছিলে যোগ দেওয়ার জন্য তড়িঘড়ি করে খাওয়া শেষ করে। সে কারও কথা না শুনে ফোনটা চার্জে দিয়ে চলে গেল। বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে আসল। লোকটা ঘরে ফিরল না। রাত ৩টা পর্যন্ত কোনো খোঁজ মিলল না। পরদিন খুব ভোরে উত্তরায় আজমপুর এলাকার থানায় গিয়ে দেখি সেখানে আগুন জ্বলছে। পুলিশ আসামি কেউ নেই। পরে টঙ্গীর একটি হাসপাতালসহ সারা দিন কয়েকটা হাসপাতালে খোঁজ করলাম। উত্তরা হাসপাতালের ১৩ তালা পর্যন্ত আহতদের মধ্যে খুঁজেও পেলাম না। সেখান থেকে বাংলাদেশ মেডিকেলে গেলাম। সেখানে পাঁচজনের লাশ রাখা, তাদের মধ্যে সুজন নাই। প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসল। এক ডাক্তার বললেন গতকাল থেকে হাসপাতাল বারান্দায় একটা লাশ পড়ে আছে। সেই বারান্দার লাশটাই আমার স্বামীর। পরে থানায় যোগাযোগ করে পিকআপযোগে লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে এসে দাফন করি।
