বরপক্ষ আর কনেপক্ষের মধ্যে যদি ঝামেলা বাধে, তাহলে কমিউনিটি সেন্টারের মালিকের কী করার আছে? এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের বার্ষিক সাধারণ সভা বাংলাদেশে আয়োজন করা নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক থেকে সভাপতি, সবার কথাতে এই একই সুর। বিসিবি শুধুই আয়োজক। এসিসি থেকে বলা হয়েছে, হোটেলে কয়টি কক্ষ লাগবে, কয়টি গাড়ি লাগবে, এসব বিসিবি জোগাড়যন্ত্র করে দিচ্ছে। এর বাইরে পুরো আয়োজনে বিসিবির কোনো ভূমিকা নেই।
আজ ঢাকার একটি পাঁচতারকা হোটেলে শুরু হতে যাচ্ছে এসিসির বার্ষিক সাধারণ সভা। এসিসির প্রধান ও পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি এরই মধ্যে ঢাকায় চলে এসেছেন এবং বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, ক্রীড়া উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎও সেরে নিয়েছেন। এসিসির এ সভায় ভারতের অংশ নেওয়া নিয়ে শঙ্কা ছিল। কিন্তু গতকাল রাতে এসিসির এজিএম উপলক্ষে আয়োজিত নৈশভোজ শেষে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল এক সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘তারা থাকছে, নিশ্চিত করেছে। বাকিরাও যোগ দিচ্ছে (যারা বর্জনের চিন্তা করছিল)। এখানে আদতে বাংলাদেশই জিতেছে।’ বিসিসিআইয়ের সহসভাপতি রাজীব শুক্লা অনলাইনে এসিসি সভায় যোগ দেবেন বলে নিশ্চিত করেন বুলবুল।
এর ফলে সৃষ্ট সংকট কেটে যাচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত শঙ্কা কিছুটা থেকেই যায়। এর আগে এ বিষয়ে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘এসিসি একটা সংস্থা, এশিয়ার পাঁচটা পূর্ণ সদস্য এবং ২৫টি সহযোগী দেশ নিয়ে এটা কাজ করে। এসিসি আমাদের কাছে প্রস্তাব করেছিল, এজিএমটা (বার্ষিক সাধারণ সভা) আয়োজন করতে চাই কি না। আমরা তাতে রাজি হয়েছি। এটি এসিসির প্রোগ্রাম। আমরা শুধু লজিস্টিক সাহায্য করব।’ বিসিবি পরিচালক ও মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ মিঠুও ২২ জুলাই বাংলাদেশ-পাকিস্তান দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি চলাকালে প্রেসবক্সে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এটি এসিসির ব্যাপার। আমাদের শুধু বলেছে হোটেলে কয়টা রুম লাগবে, কয়টা গাড়ি লাগবে, আমরা এসব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।’
এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল বা এসিসির প্রধান আয়ের উৎস হচ্ছে এশিয়া কাপের টিভি স্বত্ব বিক্রি ও মাঠের বিজ্ঞাপন থেকে প্রাপ্ত আয়। রাজনৈতিক কারণে ভারত এবং পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় সফর বন্ধ থাকায় এসিসি বা আইসিসির আয়োজনেই শুধু মুখোমুখি হতে দেখা যায় দুই দেশকে। আসন্ন এশিয়া কাপের আয়োজন স্বত্ব ভারতের, তবে আরব আমিরাতই সম্ভাব্য ভেন্যু। সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকের দুই সপ্তাহ এ আসরের সম্ভাব্য সূচি প্রস্তুত করে রাখা। তবে ভারতের এসিসির এজিএমে না আসাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান যদি এশিয়া কাপে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে, তাহলে ধস নামবে টিভিস্বত্ব ও বিজ্ঞাপনের বাজারমূল্যে। অন্যদিকে এসিসি সভাপতি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তার সময় পাকিস্তান যদি এশিয়া কাপে অংশ না নেয়, তাহলে ব্যাপারটা হয়ে যাবে অত্যন্ত দৃষ্টিকটু। ভারত আগস্টে বাংলাদেশে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি খেলার সফর ১৩ মাস পিছিয়েছে, সাফ অনূর্ধ্ব ২০ নারী ফুটবল প্রতিযোগিতাতেও দল পাঠায়নি। অন্যদিকে ইংল্যান্ডে, সাবেক ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণে লেজেন্ডস চ্যাম্পিয়নশিপে পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটারদের দলের বিপক্ষে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ভারতের ক্রিকেটাররা। দলে শহীদ আফ্রিদির উপস্থিতিই নাকি যুবরাজ সিং, ইরফান পাঠান, শিখর ধাওয়ানদের মাঠে নামা থেকে বিরত রেখেছে। সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় একটি টিভি চ্যানেলে উপস্থিত হয়ে আফ্রিদি ভারতীয় সেনাবাহিনী নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। আফ্রিদি বলেছিলেন, ‘কাশ্মীরে তোমাদের (ভারতীয়দের) আট লাখ সেনা উপস্থিত আছে, এরপরও যদি এমন কিছু হয়, তাহলে বুঝতে হবে তোমরা সব অকর্মার ধারি, অথর্ব কারণ তোমরা নিজেদের লোকদেরই নিরাপত্তা দিতে পারো না।’
শিখর ধাওয়ান তার এক্স অ্যাকাউন্টে লেখেন, ‘আমার দেশই আমার জন্য সবকিছু’। যুবরাজ সিং, ইরফান পাঠানসহ আরও অনেকেই কিছু না লিখলেও খেলতে অস্বীকৃতি জানান, ফলে রবিবার এজবাস্টনে লেজেন্ডস চ্যাম্পিয়নশিপে এ দুই দেশের সাবেকদের ম্যাচটি হয়নি।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতীয় বলয় এবং পাকিস্তান বলয় দুটো বিপরীতমুখী অবস্থানে, এমন সময়ে নাকভির অনুরোধে বাংলাদেশে এসিসির সভা আয়োজন করে ভুল চালই চেলে বসেছেন বুলবুল, এমনটাই মত বিসিবির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্টদের। বিসিবির সঙ্গে জড়িত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ক্রিকবাজকে জানিয়েছেন, ‘পুরো ব্যাপারটা একটা ভূরাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। পিসিবি প্রেসিডেন্ট যখন আমিনুলকে বৈঠকটা আয়োজনের ব্যাপারে অনুরোধ করেছিল, তখন সে ব্যাপারটা ঠিকঠাক সামাল দিতে পারেনি। সে কিছুটা সময় নিতে পারত, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সময় নেওয়াটাও একটা কৌশল। আসলে অনভিজ্ঞতার কারণে সে বোঝেনি, পুরো ভূরাজনৈতিক ব্যাপারটা না বুঝেই সে হয়তো রাজি হয়ে গেছে।’
বাংলাদেশে পা রাখার আগে মহসিন নাকভি কাবুল ঘুরে এসেছেন, সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপও করেছেন। ধারণা করা যাচ্ছে, তার রাজনৈতিক পরিচয় কাজে লাগিয়ে নাকভি আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ডকে রাজি করাতে পারবেন বার্ষিক সভায় যোগ দিতে। শ্রীলঙ্কাকেও রাজি করানোর চেষ্টা চলছে, সশরীরে না হলেও হয়তো ভার্চুয়ালি কেউ যোগ দেবেন এসএলসির পক্ষ থেকে।
বিসিবির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আমিনুল ইসলাম বুলবুল হয়তো চেয়েছেন বাংলাদেশ-পাকিস্তান সিরিজের সমান্তরালে এসিসির এই বৈঠক আয়োজন তার স্বল্প মেয়াদের সভাপতিত্বে একটি অনন্য অর্জন হয়েই থাকবে। তবে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল করে তুলেছে পরিস্থিতি, যে বৈঠক শেষ পর্যন্ত বিসিবির জন্য হয়ে যেতে পারে শাঁখের করাত।
