গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের শ্রীপুর এলাকায় তিস্তা নদীর ডান তীরে তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। হঠাৎ ভাঙনের কবলে পড়ে হতবাক স্থানীয়রা। ইতিমধ্যে তিন ফসলি জমি, ফলের বাগান, সড়ক এবং প্রায় অর্ধশত বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের ফলে কবরস্থানসহ কয়েকটি গ্রামের হাজার হাজার বাড়িঘর হুমকির মুখে। ভাঙনের স্থান থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে অবস্থিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধও ঝুঁকিতে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ জনপদে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন গ্রামবাসী।
স্থানীয় ও ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, গাইবান্ধা সদর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী শ্রীপুর একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। কয়েক বছর আগেও তিস্তা নদী এই এলাকা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে ছিল। তখন এসব জমিতে ধান, গম, আলু, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হতো। কিন্তু বর্তমানে এই জমি নদীতে বিলীন হচ্ছে। শ্রীপুর ইউনিয়নের বাবুর বাজার থেকে পুটিমারি পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ভাঙন চলছে। গত দুই সপ্তাহে প্রায় ৩০০ বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে, যার মধ্যে পাট, কচু ও আমন ধানের বীজতলা রয়েছে। পাঁচটি গ্রাম দত্তরখামারপাড়া, দক্ষিণ শ্রীপুর, বাবুর বাজার, পুটিমারি ও আশপাশের এলাকা চরম ঝুঁকিতে। ভাঙনের তীব্রতা এতটাই প্রকট যে দিনরাত বাড়িঘর, ফসলি জমি ও বিভিন্ন স্থাপনা নদীতে বিলীন হচ্ছে। ইতিমধ্যে দুটি গ্রামীণ সড়ক নদীতে তলিয়ে গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শ্রীপুর ও বাবুর বাজার এলাকায় বর্ষার জোয়ারে নদীর ঢেউয়ে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। ভাঙনের শব্দে আতঙ্কিত স্থানীয়রা ঘরবাড়ি ভেঙে নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছেন। অনেকে গাছ কেটে এবং ফসল সংগ্রহ করে নিচ্ছেন। কৃষকরা পরিপক্ক না হওয়া পাট কেটে ফেলছেন। কেউ কেউ বাঁশ ও গাছ দিয়ে পারিবারিক কবরস্থান রক্ষার চেষ্টা করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে নীরবে তাকিয়ে আছেন।
বাবুর বাজারের আব্দুল জলিল (৬৫) বলেন, নদীর পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন তীব্র হয়েছে। আমার ৩৬ শতাংশ জমির মধ্যে ২২ শতাংশ নদীতে চলে গেছে। বাড়িঘর ও বাগানও বিলীন হয়েছে। তাই ভাঙনের শিকার হয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।
একই গ্রামের ইয়াসউদ্দিন (৪৪) জানান, তার সাত শতাংশ কচুর জমি পুরোপুরি নদীতে বিলীন হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছি। অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। দ্রুত ভাঙনরোধে কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা না হলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে ছয়টি গ্রামের ১৩ হাজারের বেশি মানুষ গৃহহারা হতে পারে।’
দত্তরভিটাখামার পাড়ার লেবু ম-ল (৪০) বলেন, ‘আমার পাঁচ বিঘা জমি ও ফসল নদীতে ভেসে গেছে। এগুলো সমতল ভূমি, চর নয়। পৈত্রিক জমি হারাচ্ছি। জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধ জরুরি।’
দক্ষিণ শ্রীপুরের মমিনুর ইসলাম (৪৬) বলেন, ‘ছোটবেলায় নদী দেখতে দূরে যেতাম, এখন নদী আমার জমি ভাঙছে। তিন বিঘা পাটের জমি নদীতে তলিয়ে গেছে। কেউ ভাঙন রোধে উদ্যোগ নিচ্ছে না। এভাবে চললে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বহু গ্রাম বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
গাইবান্ধা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাফিজুল হক বলেন, শ্রীপুর থেকে বাবুর বাজার পর্যন্ত ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনের স্থানগুলো পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন
কর্র্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ফেলার প্রক্রিয়া চলছে।
