দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘এমারেল্ড ট্রায়াঙ্গল’ বা পান্না ত্রিভুজ হলো কম্বোডিয়া, লাওস এবং থাইল্যান্ডের মধ্যে ভাগ করা সীমান্ত অঞ্চল। এর মধ্যে রয়েছে চং বোক, ডাংরেক পর্বতমালার মধ্য দিয়ে একটি পর্বতমালা, যা থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ার মধ্যে প্রাকৃতিক সীমানার বেশিরভাগ অংশ গঠন করে। কম্বোডিয়ায় এই অঞ্চলটি ‘মম বেই’ নামে পরিচিত। কম্বোডিয়া এবং থাইল্যান্ডের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৮১৭ কিমি (৫০৮ মাইল), যা উত্তর-পূর্বে লাওসের সঙ্গে ত্রিপয়েন্ট থেকে দক্ষিণে থাইল্যান্ড উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। ২০০০ সালে এই অঞ্চলে পর্যটন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি প্রকল্প হিসেবে ‘এমারেল্ড ট্রায়াঙ্গল’ বা পান্না ত্রিভুজ নামটি তৈরি করা হয়েছিল। বিস্তৃত অর্থে পান্না ত্রিভুজ তিনটি দেশের মধ্যে সাতটি প্রদেশের এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, কম্বোডিয়ার প্রিয়াহ ভিহিয়ার, ওডার মিনচে এবং স্টং ট্রেং, লাওসের সালাভান এবং চম্পাসাক এবং থাইল্যান্ডের উবন রাতচাথানি এবং সিসাকেট। সংকীর্ণ অর্থে এটি তিনটি দেশের মধ্যে সীমানা ত্রিবিন্দুকে বোঝায়, যা চং বোক পাসের কাছে অবস্থিত।
ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন খেমার এবং থাই সাম্রাজ্যের মধ্যে সীমান্ত এলাকাটি বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। ১৮৬০-এর দশক থেকে ফ্রান্স এই অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে, প্রথমে আধুনিক কম্বোডিয়ায়, ভিয়েতনামে এবং পরে লাওসে, ১৮৮৭ সালে ফরাসি ইন্দোচীনের উপনিবেশ তৈরি হয়। ১৮৬৭ সালে একটি ফ্রাঙ্কো-থাই চুক্তি বাত্তামবাং এবং আংকোর (নাখো সিম্রাপ) অঞ্চলের থাই মালিকানা নিশ্চিত করে। ১৮৯৬ সালে ব্রিটেন (বার্মায় অবস্থিত) এবং ফ্রান্স তাদের নিজ নিজ উপনিবেশের মধ্যে একটি বাফার রাষ্ট্র হিসেবে সিয়াম (থাইল্যান্ডের তৎকালীন নাম) ছেড়ে দিতে সম্মত হয়। ১৯৪০ সালে ফরাসি ইন্দোচীনে জাপানি আক্রমণের পর ১৯০৪ এবং ১৯০৭ সালে ফ্রান্সের কাছে হস্তান্তরিত অঞ্চলগুলো থাইল্যান্ডে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তবে জাপানের পরাজয়ের পর এবং ১৯৪৬ সালে যুদ্ধ-পূর্ব সীমান্ত পুনরুদ্ধারের পর এটি বিপরীত হয়ে যায়। ১৯৫৩ সালে কম্বোডিয়া স্বাধীনতা লাভ করে এবং তারপর থেকে দুই দেশের মধ্যে একটি তিক্ত সম্পর্ক বিরাজ করছে। ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে ডাংরেক পর্বতমালার সীমান্ত সংলগ্ন প্রিয়াহ ভিহিয়ার মন্দিরের মালিকানা নিয়ে একটি কম্বোডিয়ান-থাই সীমান্ত বিরোধ দেখা দেয়। ১৯৬২ সালে মামলাটি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে পাঠানো হয়, যা কম্বোডিয়ার পক্ষে রায় দেয়, তবে থাইল্যান্ড ফলাফল নিয়ে আপত্তি প্রকাশ করে।
১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের কম্বোডিয়া আক্রমণের পর সীমান্তে বিক্ষিপ্ত লড়াই শুরু হয়, যার ফলে খেমাররুজরা থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী শিবিরগুলোতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়, ১৯৮০-এর দশক জুড়ে তারা থাইল্যান্ড সীমান্তে ক্যাম্পগুলোকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে, যতক্ষণ না ১৯৮৯ সালে ভিয়েতনাম দেশটি থেকে সরে যায়। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে কম্বোডিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রিয়াহ ভিহিয়ার ইস্যু এবং কিছুটা হলেও কো কুট দ্বীপ নিয়ে থাইল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক আবারও খারাপ হয়ে পড়ে। শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানের জন্য ১৯৯৫ সালে একটি সীমান্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল, তবে ২০১৩ সাল নাগাদ এটি খুব কম অগ্রগতি অর্জন করেছিল এবং উভয় পক্ষের জন্য সন্তোষজনক একটি পূর্ণাঙ্গ সীমান্ত সীমানা নির্ধারণ অমীমাংসিত ছিল। এ বছর (২০২৫ সালের) গোড়ার দিকে সীমান্ত এলাকা নিয়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। ২৮ মে কম্বোডিয়ান এবং থাই সৈন্যরা একে অপরের মধ্যে সংক্ষিপ্ত গুলিবিনিময় করে, যার ফলে একজন কম্বোডিয়ান সৈন্য নিহত হয়। উভয় দেশই একে অপরকে সংঘর্ষের জন্য দায়ী করে। ২৯ মে কম্বোডিয়ান এবং থাই সামরিক বাহিনীর মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। মে মাসের সংঘর্ষটি থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া এবং লাওসের সীমান্তবর্তী ত্রিপদী পান্না ত্রিভুজের (চং বক) কাছে ঘটেছিল।
এ বছর (২০২৫ সালের) জুলাই মাসে উভয় পক্ষের সামরিক বাহিনী একে অপরের ওপর আক্রমণের মাধ্যমে সংঘাত পুনরায় শুরু হয়। থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সঙ্গে সমস্ত স্থল সীমান্ত ক্রসিংও বন্ধ করে দেয়। ২৩ জুলাই উবোন রাতচাথানির নাম ইউয়েন জেলায় একজন থাই সৈন্য একটি ল্যান্ডমাইনের ওপর পা রাখে, যার ফলে তার একটি পা হারাতে হয়। পরের দিন দুই দেশের মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ শুরু হয়। কম্বোডিয়ার হামলায় দেশটির সুরিন, উবন রাতচাথানি ও শ্রিসাকেত প্রদেশে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। পরবর্তী সময়ে সীমান্তে কম্বোডিয়ার সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার জন্য থাই এফ-১৬ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়। কম্বোডিয়ায় এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দিয়ে বোমাবর্ষণ করেছে থাইল্যান্ড। এ ছাড়া, কম্বোডিয়ার সঙ্গে নিজেদের সীমান্ত বন্ধ করেছে। কম্বোডিয়া কামানের গোলা ও রাশিয়ার তৈরি বিএম-২১ রকেট উৎক্ষেপণব্যবস্থা ব্যবহার করছে। চলমান সংঘাতে উভয় পক্ষে মোট ৩২ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহতের সংখ্যা অন্তত ১৩০। বর্তমানে কোনো পক্ষই পিছু হটতে রাজি বলে মনে হচ্ছে না। উভয় দেশের নেতৃত্বেই আপস করার মতো প্রয়োজনীয় শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা যাচ্ছে। কম্বোডিয়া আগে থেকেই চায় এ সীমান্ত বিরোধের মীমাংসা আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) করুক। কিন্তু এ পথে সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। কারণ, থাইল্যান্ড এ আদালতের বিচার মানতে রাজি নয়।
থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া দুই দেশই আসিয়ানের সদস্য। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের বর্তমান চেয়ারম্যান মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী এবং আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের চেয়ারম্যান আনোয়ার ইব্রাহিম দুই দেশকে শান্ত থাকার ও উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ঘটনাপ্রবাহ যেমন হোক না কেন, যুদ্ধ কখনো মঙ্গল বয়ে আনতে পারেনা। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ রাশিয়া-ইউক্রেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন, ইরান-ইসরায়েলসহ অতীতের হাজারো সংঘাত। কাজেই এ সংঘাত যেন স্থায়ী যুদ্ধের দামামা না বাজায়, এদিকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনতিবিলম্বে সুদৃষ্টি দেওয়া দরকার।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক
