রাজধানীর গুলশানে সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের কাছে চাঁদা নিতে গিয়ে পুলিশের হাতে তিন নেতা আটকের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটি বাদে সব কমিটি বাতিল করা হয়েছে। গতকাল রবিবার বিকেলে শাহবাগে এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন সংগঠনের সভাপতি রিফাত রশিদ। তিনি বলেন, অর্গানোগ্রামের জরুরি মিটিংয়ে সম্মিলিত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে জানানো যাচ্ছে যে, ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়া সারা দেশের সব কমিটি আজ (গতকাল) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত ঘোষণা করা হলো। এরপর থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরিচয়ে কেউ অপকর্ম করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরও জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আগামীতে কীভাবে পরিচালিত হবে সে বিষয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত হবে।
এর আগে গত ২৬ জুলাই সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের গুলশানের বাসায় গিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঢাকা মহানগর শাখার আহ্বায়ক ইব্রাহিম হোসেন মুন্না, সংগঠনটির সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক আবদুর রাজ্জাক রিয়াদ, সংগঠনের কর্মী সাকাদাউন সিয়াম ও সাদমান সাদাব, গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের কেন্দ্রীয় নেতা জানে আলম অপু ও আব্দুর রাজ্জাক বিন সুলাইমানকে আটক করে পুলিশ। ওই দিনই তাদের স্বীয় পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়।
চারজন রিমান্ডে : গুলশানে চাঁদাবাজির সময় আটক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক রিয়াদসহ চারজনের সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল রবিবার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও গুলশান থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোখলেছুর রহমান দশ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। শুনানি নিয়ে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জিয়াদুর রহমান সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিয়াদ ছাড়া অন্য যে তিন জনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে তারা হলেন কাজী গৌরব অপু, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব। আর একজন ১৬ বছর হওয়ার তাকে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কমকর্তা। আদালত তা মঞ্জুর করেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৭ জুলাই সকাল ১০টায় আসামি আব্দুর রাজ্জাক রিয়াদ, কাজী গৌরব অপু গুলশানের ৮৩ নম্বর রোডে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক এমপি শাম্মী আহমেদের বাসায় যান। তখন তারা হুমকি-ধমকি দিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যায়িত করে পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করানোর হুমকি দেন। একপর্যায়ে মামলার বাদী সিদ্দিক আবু জাফর বাধ্য হয়ে নিজের কাছে থাকা নগদ পাঁচ লাখ টাকা ও ভাইয়ের কাছ থেকে নিয়ে আরও পাঁচ লাখ টাকা আসামিদের দেন। গত ১৯ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে আসামি রিয়াদ ও অপু বাদীর বাসায় প্রবেশ করে তার ফ্ল্যাটের দরজায় সজোরে ধাক্কা মারেন বাকি ৪০ লাখ টাকা জন্য। পরে ২৬ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টায় আসামি রিয়াদের নেতৃত্বে অপরাপর আসামিরা বাদীর বাসার সামনে এসে তাকে খুঁজতে থাকেন। পরে গুলশান থানা পুলিশকে জানালে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পাঁচ আসামিকে হাতেনাতে আটক করে।
রিয়াদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছাত্র প্রতিনিধি নয় : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আব্দুর রাজ্জাক বিন সুলাইমান রিয়াদ নামে কোনো ছাত্র প্রতিনিধি নেই বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, আজ (গতকাল) বিভিন্ন গণমাধ্যমে (টিভি, অনলাইন, সোশ্যাল মিডিয়া প্রভৃতি) ‘চাঁদাবাজি করতে গিয়ে আটক আব্দুর রাজ্জাক বিন সুলাইমান (রিয়াদ) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছাত্র প্রতিনিধি’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরে এসেছে।’ সংবাদটি সর্বৈব মিথ্যা এবং এর কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আব্দুর রাজ্জাক বিন সুলাইমান (রিয়াদ) নামে কোনো ছাত্র প্রতিনিধি বা কোনো ধরনের প্রতিনিধির অস্তিত্ব নেই। মন্ত্রণালয়ের নাম ব্যবহার করে কেউ কোনো অপরাধ বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকা-ে লিপ্ত হলে তার দায়ভার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বহন করবে। এর সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’
এদের শেকড় অনেক গভীরে : উমামা ফাতেমা
এদিকে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে আটক ছাত্রনেতাদের শেকড় অনেক গভীরে বলে মন্তব্য করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে কিছুদিন আগে পদত্যাগ করা মুখপাত্র উমামা ফাতেমা। গত শনিবার দিবাগত রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ৫ জনের চাঁদাবাজির খবর শুনে আমার পরিচিত ব্যক্তিবর্গ এতটাই আশ্চর্যান্বিত হওয়ার অভিনয় করছেন যে আমার মনে হচ্ছে আমিই সব থেকে কম আশ্চর্য হয়েছি। এই ছেলেগুলোকে তো নেতাদের পেছনে প্রটোকল দিতে দেখা গেছে এতদিন যাবৎ। সচিবালয় থেকে শুরু করে মিছিল-মিটিং, মারামারি সব জায়গাতেই সমন্বয়কদের ডান হাত, বাম হাত হিসেবে নির্বিঘেœ প্রটোকল দিয়ে গেছে। গুলশান বনানী গ্যাং কালচারের অজস্র অভিযোগ অভ্যন্তরীণভাবে তাদের বিরুদ্ধে ছিল। উমামা ফাতেমা আরও বলেন, এই ছবির রিয়াদ নামের ছেলেটা গত ডিসেম্বর মাসে রূপায়ণ টাওয়ারে আমার সামনে অত্যন্ত উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করেছিল। আমরা মেয়েরা তাকে থামানোর চেষ্টা করলে আমাদের ওপর পাল্টা চড়াও হয়। ঐ ঘটনার পর ছেলেটার ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে হুমকি, মারামারি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ আছে। তিনি বলেন, আমি জেনে তখন মোটেও অবাক হইনি, কারণ ততদিনে বৈষম্যবিরোধীতে এই ধরনের মানুষজনের আনাগোনাই সর্বত্র টের পাওয়া যেত। ঠিকই তারা রূপায়ণ টাওয়ারে অবাধে আসা যাওয়া করত। কারও দুর্নীতি বা অসততার ব্যাপারে অভিযোগ জানালে উত্তরে পিনড্রপ সাইলেন্স উপহার পেতে হবে। আর আমি চোখের সামনে দেখতাম এসব লোকজনই কীভাবে দিন শেষে এক্সেস করে নেয়। আজ এত মাস পর এই প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকালে বলার ভাষা পাই না কোনো। যে যেভাবে পারছে এই প্ল্যাটফর্মকে নষ্ট করেছে। উমামা ফাতেমা বলেন, ‘ইশ! মানুষ কত নিষ্পাপ! সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মতো তারা আবিষ্কার করেছেন এই ছেলেগুলো আজ কীভাবে চাঁদাবাজি করল। অত্যন্ত দুঃখিত বন্ধুরা, বলতে হবে এই প্রথম কোনো চাঁদাবাজি করতে গিয়ে তারা পুলিশের হাতে ধরা খেল। ঠিকমতো খোঁজ নিলে বুঝবেন, এদের শেকড় অনেক গভীরে।’
