কোনো হত্যা মামলার তদন্ত শেষ হয়নি

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৫, ০৭:৪৯ এএম

এক বছর পার হতে যাচ্ছে জুলাই অভ্যুত্থানের। তবে এ সময়ের মধ্যে কোনো হত্যাকান্ডের তদন্ত শেষ হয়নি। ওই সময়ের ঘটনায় রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন থানায় ২২টি হত্যা মামলা হয়েছে। পুলিশ বলছে, এসব হত্যা মামলা বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতেই পুলিশ কিছুটা বাড়তি সময় নিচ্ছে। এ ছাড়া আগস্ট-পরবর্তী সময়ে হাওয়া বেশ কিছু মামলায় অসংগতি ধরা পড়ে। গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে গিয়ে বেশ কিছু মামলাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত অভ্যুত্থানের ঘটনায় ২২টি হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন ধারার ১১৮টি মামলাকে পুলিশের বিশেষ কমিটি মনিটরিং করছে। এরই মধ্যে এসব মামলার ছয়টির তদন্ত শেষ করেছে পুলিশ। আগামী মাসের মধ্যেই আরও একাধিক হত্যা মামলার পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদন জমা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

চব্বিশের জুলাইয়ে রাজশাহী বিভাগ জুড়ে ছিল শিক্ষার্থীদের দুর্বার আন্দোলন। এসব আন্দোলনের বেশিরভাগই ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক। তবে, শেষ সময় আন্দোলনের মাত্রা বেড়ে গেলে তা ছড়িয়ে পড়ে পাড়া-মহল্লাতেও। শেষ সময় আন্দোলনে হামলার ঘটনা বেড়ে যায়। প্রতিদিনই বাড়তে থাকে হতাহতের সংখ্যা।

রাজশাহীতে ছাত্র আন্দোলনের একেবারে শেষ সময়ে শহীদ হন দুজন। ৫ আগস্ট যখন শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান, তার কিছুক্ষণ আগে রাজশাহী শহরে কল্পনা সিনেমা হলের মোড়ে আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং পুলিশের যৌথ হামলার শিকার হন শিক্ষার্থীরা। ওই সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন আলী রায়হান ও সাকিব আনজুম। জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারগুলো এখন খুনিদের বিচারের অপেক্ষায়। আহত জুলাই যোদ্ধারা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন যন্ত্রণা।

শহীদ সাকিব আনজুমের বাবা মাইনুল ইসলাম বলেন, এক বছর ধরে পরিবারের কোনো কিছ্ইু আর স্বাভাবিক নেই। ঠিকভাবে ঘুমাতে পারছেন না পরিবারের কেউই। কোনো কাজই আর আগের গতিতে চলে না। তিনি বলেন, তাদের একটাই চাওয়া। খুনিদের বিচার হোক, তারা শাস্তি পাক। ছেলে হত্যার বিচার দাবিতে তিনি বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। প্রথমদিকে এই মামলার তদন্ত নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও এখন পুলিশের কার্যক্রমে স্বস্তিতে আছেন বলে জানান মাইনুল ইসলাম। তিনি বলেন, আগে যারা এই মামলাটি দেখছিল, তারা বিগত সরকারের দোসর ছিল। তবে এখন যারা কাজ করছেন, তাদের গতি ভালো। তিনি বলেন, খুনিরা শাস্তি পেলেই স্বস্তি মিলবে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্ট থেকে কয়েক দিন পুলিশের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এরপর পুলিশ যখন কাজে যোগ দিল, তারপরও তাদের স্বাভাবিক তদন্তকাজ শুরু করতেই বেশ কিছুটা সময় কেটে যায়। আবার অভ্যুত্থানের এসব ঘটনায় ওই সময় যেসব মামলা হয়েছে, একটি বিশেষ পরিস্থিতির মামলার কারণে কিছুটা অসংগতি তৈরি হয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অনেকেই আবার প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর জন্য নিজেদের ইচ্ছামতো আসামি করেন। আবার কেউ কেউ মামলার সত্যতা প্রমাণ করার জন্য যেসব তথ্য দরকার, সেগুলো উল্লেখ করেননি বা যথাযথ আলামত দেননি। এসব নানা কারণে অভ্যুত্থান-পরবর্তী মামলাগুলো নিয়ে পুলিশ তদন্তের শুরুতে কিছুটা হোঁচট খায়। তদন্ত কর্মকর্তারা মামলার পক্ষের আলামত উদ্ধারেও বেগ পান। আবার বেশ কিছু হত্যাকা-ের পর ময়নাতদন্ত না করেও দাফন করে দেওয়ায় এক ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। কোনো কোনো মামলার সুরতহাল রিপোর্টের সঙ্গে মৃত্যুর কারণের অসংগতি তৈরি হয়। এমনই পরিস্থিতিতে পুলিশ সদর দপ্তর মামলাগুলো তদন্তে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দেয়। কোনো নিরপরাধ মানুষ যাতে অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, আবার কোনো সত্য যাতে অনুদঘাটিত না নয়, সেদিকে গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এজন্য রেঞ্জপর্যায়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়।

রাজশাহী রেঞ্জ পুলিশের তথ্যমতে, জুলাই অভ্যুত্থানের হত্যাকান্ডের ঘটনায় রাজশাহী বিভাগে যে ২২টি হত্যা মামলা হয়েছে, তার সর্বোচ্চ ৯টি মামলা হয়েছে বগুড়ায়। এ ছাড়া সিরাজগঞ্জে আটটি, রাজশাহীতে দুটি, জয়পুরহাটে দুটি, পাবনায় একটি হত্যা মামলা হয়। গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় উত্তরাঞ্চলে সব থেকে বেশি মামলা হয়েছে রাজশাহীতে। রাজশাহীর কোনো থানায় হত্যাকান্ডের মামলা হয়নি। তবে অন্যান্য ধারায় মামলা হয়েছে ১৬টি। রাজশাহী মহানগর পুলিশের তদন্তে রয়েছে দুটি হত্যাসহ ২৯টি মামলা। রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, ‘সবগুলো মামলাই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। প্রকৃত যারা অপরাধী, তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। এখানকার বিভিন্ন স্থানের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। আসামিদের অবস্থান নিশ্চিত করছি। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। যারা এসব ঘটনায় ছিল, আমরা তাদের চিহ্নিত করে ফেলেছি। আমরা চাই, এতে নিরপরাধ কাউকে যাতে না জড়ানো হয়। আমাদের তদন্ত প্রায় শেষপর্যায়ে। এখন আমরা কিছু ভিডিও ফুটেজ ফরেনসিক করাচ্ছি। ফুটেজ পাঠানো হয়েছে, কিছু রিপোর্ট পেতে বাকি আছে। রিপোর্টগুলো পেয়ে গেলে তদন্ত শেষ হয়ে যাব।’ তিনি বলেন, শিগগির চার্জশিট দেওয়া শুরু হবে।

হত্যা মামলার বাইরে রাজশাহী বিভাগের যে ৯৬টি মামলা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে রাজশাহী মহানগর পুলিশের কাছে রয়েছে ২৭টি, জয়পুরহাটে ৮টি, বগুড়ায় ২৩টি, সিরাজগঞ্জে ৬টি, পাবনায় ৫টি, নাটোরে ৪টি, নওগাঁয় ৪টি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩টি মামলা রয়েছে। বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ১২৮ মামলায় এজাহারভুক্ত আসামির সংখ্যা ৮ হাজার ৩৯৩ জন। আর হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত আসামির সংখ্যা ১ হাজার ৯৪৯ জন। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯০০ জন।

পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘কোনো নিরপরাধ মানুষ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েই তদন্ত চলছে। আমরা একটি মনিটরিং সেল করেছি। তদন্তে যেসব আলামত দরকার, সেগুলো নিয়ে আসছি। আমরা আশা করছি, খুব কম সময়ের মধ্যেই এসব মামলার তদন্ত শেষ করে নিয়ে আসতে পারব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত