রুফটপ সোলার যেন অর্থ অপচয়ের প্রকল্প না হয়

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৫, ১২:১৬ এএম

গেল ২৫ জুন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশের সব সরকারি ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের নির্দেশ দেন। এর এক সপ্তাহের মধ্যে দেশের উচ্চ আদালত আরেকটি মাইলফলক আদেশ দেয়। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ঢাকার সব ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের আদেশ দিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার টানাপড়েন, আমদানির চাপ ও ব্যাপক জ্বালানি সংকটে ধুঁকতে থাকা বাংলাদেশের জন্য খবর দুটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কেননা গোটা বিশ্ব যখন এলএনজি-কয়লার মতো ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ জ্বালানি থেকে বেরিয়ে ক্রমে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর ঘটাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের অবস্থান উল্টো। দেশের জ্বালানি মহাপরিকল্পনায় সমন্বিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মহাপরিকল্পনা (আইইপিএমপি) আরও বেশি ব্যয়বহুল এলএনজি ও কয়লা আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে দশকের পর দশক ধরে নানা লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নেওয়া হলেও বাংলাদেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির শেয়ার এখনো মাত্র ৩ শতাংশের ঘরে।

এর জন্য যেমন রাষ্ট্রীয় নীতি দায়ী তেমনি রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারি সব পক্ষের সততার অভাব। যেমন রুফটপ সোলার স্থাপনে এর আগের উদ্যোগ চূড়ান্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। লোক দেখানো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এ খাতে জনগণের গচ্চা গেছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। ফলে নতুন করে রুফটপ সোলার যখন আলোচনায় তখন অবশ্যই আমরা চাই না ভালো এই উদ্যোগ আবারও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হোক। বরং অতীত অভিজ্ঞতা গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করে এটি কীভাবে কার্যকর ও লাভজনক করা যায় সেই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে। ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিসের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করে ৬ মাসে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এটি কার্যকর হলে অন্তত ৪ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। তবে মুশকিলটা হলো এর সময়সীমা। মাত্র ৬ মাসের মধ্যে বিরাট এই লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে বেশি তাড়াহুড়ো হতে পারে। এতে প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একদিকে গ্রাহক লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ছাড়াই গ্রিড সংযোগ পেয়েছেন অন্যদিকে অসাধু সরকারি কর্মচারীরা হাতিয়ে নিয়েছেন শত শত কোটি টাকা।

ঢাকার দুটি বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানি ডিপিডিসি ও ডেসকো’র তথ্য বলছে, ঢাকায় বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্পূর্ণ সোলার সিস্টেম আছে ৬১,৬৯৩টি। এগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ৪২ মেগাওয়াট। স্থাপনের মোট খরচ প্রায় ২৫২ কোটি টাকা হলেও, ব্যবহারের অভাবে সেগুলো এখন ইলেকট্রনিক বর্জ্যে রূপ নিয়েছে। অর্থাৎ ২০১০ সাল থেকে রাজধানীসহ সারা দেশের বহুতল ভবনের ছাদে যেসব সোলার প্যানেল বসানো হয়েছিল, তার কোনোটিই এখন আর কার্যকর নেই। এ অবস্থায় দেশব্যাপী খেলাপি হয়ে পড়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ। এর মধ্যে শুধু ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) ১৪শ কোটি টাকা। ঋণ আদায় করতে না পেরে সংস্থাগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

কাবিটা প্রকল্পে দুর্নীতি : কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) কর্মসূচির ৫০ শতাংশ অর্থে ২০১৭ সালে গ্রামাঞ্চলে সোলার হোম সিস্টেম স্থাপনের উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে এ খাতে ব্যাপক দুর্নীতির খবর বের হতে থাকে। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, দরিদ্র মানুষের বরাদ্দের টাকায় নিম্নমানের সৌর প্যানেল স্থাপন করায় পুরো প্রকল্প ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। জানা যায়, ২০১৭ থেকে ২০২১ পর্যন্ত প্রতিবছর সোলার প্যানেল স্থাপন কর্মসূচিতে যে পরিমাণ চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে টাকার অঙ্কে তা ২ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা। যার অর্ধেক ১ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, ২০২১ সাল পর্যন্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে কমপক্ষে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা ছিল। এজন্য এ খাতে ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে পাওয়া গেছে মাত্র এক থেকে দেড়শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।

বছরে বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের সম্ভাবনা : ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে ক্রমাগত বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ও গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ছাদে সৌর প্যানেল বসানোর মাধ্যমে বার্ষিক দেড় বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব। গবেষণায় বলা হয়, ব্যাটারি স্টোরেজ সুবিধা ছাড়া এক মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের লেভেলাইজড কস্ট অব এনার্জি (এলসিওই), প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় পাঁচ টাকা। বর্তমানে শিল্প ও বাণিজ্যিক ভবনের জন্য বিদ্যুৎ বিল দিতে হয় যথাক্রমে ১৩ টাকা ৬২ পয়সা ও ১৫ টাকা ৬২ পয়সা। অর্থাৎ শিল্প ও বাণিজ্যিক ভবনে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করলে প্রতি ইউনিটের বিপরীতে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ৮ টাকা ৬২ পয়সা থেকে ১০ টাকা ৬২ পয়সা সাশ্রয় করা সম্ভব। সাধারণত ছাদে বসানো একটি সৌরপ্যানেল থেকে প্রতিদিন গড়ে চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটির মূল কথা হলো ছাদে স্থাপিত সৌর প্যানেল জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হবে। এর ফলে সৌর প্যানেলের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হয়। গ্রাহকের উৎপাদিত বিদ্যুৎ শেষ হয়ে গেলে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এতে সরকার ও গ্রাহক উভয়পক্ষই লাভবান হবে। 

লেখক : সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত