বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের কাছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ এবং ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ নিয়ে তাদের মতামত পেশ করতে যাচ্ছে। তবে দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, তারা সনদের ৭ নম্বর দফায় উল্লিখিত ‘সংবিধানে গণঅভ্যুত্থানের স্বীকৃতি’র বিরোধিতা করে। এ ছাড়া, জুলাই ঘোষণাপত্রকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি না দিয়ে রাজনৈতিক দলিল হিসেবে রাষ্ট্রীয় আর্কাইভে সংরক্ষণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বিএনপি।
গত সোমবার রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে ভার্চুয়ালি সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি মনে করে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবে প্রচার করলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কের সৃষ্টি হতে পারে। বিএনপির বক্তব্য, ‘জুলাইয়ে দেশ নতুন করে স্বাধীন হয়নি; বরং দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটেছে।’
দলটির মতে, জুলাই সনদে উল্লিখিত সংস্কার প্রস্তাব ও সুপারিশগুলো নির্বাচিত সরকার গঠনের পর দুই বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। ৭ দফার খসড়ায় বিএনপি ৭ নম্বর দফা ব্যতীত বাকি ছয় দফার সঙ্গে সম্মতি প্রকাশ করেছে। ৭ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে সংবিধানে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। ৬ নম্বর দফায় উল্লেখ রয়েছে, সনদ গৃহীত হওয়ার পর এর প্রস্তাব/সুপারিশগুলো পরের জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের দুই বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।
জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে বিএনপির অবস্থান আরও সুস্পষ্ট। দলটির নেতারা মনে করেন, এটিকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিলে ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থানসহ ভবিষ্যতের অন্যান্য গণআন্দোলনের ক্ষেত্রেও একই দাবি উঠবে, যা সাংবিধানিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ২০১১ সালে সংবিধানে যুক্ত হওয়ার পর তা আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। এই নজির তুলে ধরে বিএনপি মনে করে, ঘোষণাপত্রের জন্য পৃথক সাংবিধানিক স্বীকৃতি অপ্রয়োজনীয়। তারা চায়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র রাজনৈতিক দলিল হিসেবে রাষ্ট্রীয় আর্কাইভে সংরক্ষিত হোক, কিন্তু সংবিধানে যুক্ত না হোক।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, বিএনপি জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে আর আলোচনা করতে আগ্রহী নয়, তবে জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবে, কারণ সংস্কারের বিষয়ে তারা আন্তরিক।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের শেষভাগে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নিয়ে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ ও ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রণয়ন করে। বিএনপি প্রথম খসড়ায় সংশোধনী প্রস্তাব দিয়ে তাদের মতামত জানায়। তবে সরকারের ধীরগতির কারণে ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পুনরায় আন্দোলনে নামে। এরপর জুলাই ঘোষণাপত্র প্রণয়নে গতি আসে এবং চূড়ান্ত খসড়া বিভিন্ন দলের কাছে পাঠানো হয়। চূড়ান্ত খসড়ায় বিএনপির মতামতের ভিত্তিতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রথম খসড়ায় বলা হয়েছিল, ‘অভ্যুত্থানের চেতনায় সংবিধান বাতিল বা সংশোধন করা হবে।’ চূড়ান্ত খসড়ায় তা পরিবর্তন করে বলা হয়েছে, ‘মানবিক ও নাগরিক অধিকার সমুন্নত রাখতে সংবিধান সংস্কার করা হবে।’ ঘোষণাপত্রে বিএনপির দাবি অনুযায়ী ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’, ১৯৭৯ সালের পঞ্চম সংশোধনী, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন এবং এক-এগারোকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিএনপি প্রস্তাব করেছে, ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’-এর পুরো পাঠ নয়, বরং একটি অনুচ্ছেদ এবং ঘোষণাপত্রের উল্লেখ সংবিধানের চতুর্থ তপশিলে যুক্ত হোক। দলটি শিগগিরই সরকারের কাছে জুলাই সনদ ও ঘোষণাপত্রের ওপর তাদের চূড়ান্ত মতামত পাঠাবে।
