ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রাজশাহী নগরী

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৫, ০৭:৪৫ এএম

রাজশাহীতে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা। রাজশাহী শহরের ৫৭ ভাগ বাড়িতে এডিস মশার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য বিভাগের এক জরিপে দেখা গেছে, রাজশাহী শহরের ৫৭ ভাগ বাড়িতেই এডিস মশার লার্ভা রয়েছে। এ অবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে রাজশাহী সিটি করপোরেশনকে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠি দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, গত দুই মাসে হাসপাতালে যেসব ডেঙ্গু রোগী আসছে, তাদের বেশিরভাগই স্থানীয়ভাবে আক্রান্ত হওয়া।

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক অফিসের তথ্যমতে, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম আসার আগে, বর্ষা মৌসুম ও শেষে এই তিন দফায় ডেঙ্গু নিয়ে জরিপ করা হয়। এ বছর মার্চ ও এপ্রিল মাসে জরিপ করে রাজশাহী নগরীতে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ এলাকায় এডিসের লার্ভা পাওয়া যায়। তবে এর তিন মাস পর জুলাই মাসে পরীক্ষা করে নগরীতে ৫৭ দশমিক ৩৩ ভাগ বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালে ভরা মৌসুমে লার্ভার উপস্থিতি ছিল ৪৫ দশমিক ৩৩ ভাগ বাড়িতে।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের কীটতত্ত্ব টেকনিশিয়ান আব্দুল বারী বলেন, ‘এটা আমাদের জরিপ কাজ। বছরে তিনবার করা হয়। সাধারণত এটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মে স্বাস্থ্য বিভাগ প্রি-মৌসুম, মৌসুম পোস্ট, মৌসুমে এটি করে থাকে। এখন মৌসুম সময়। আমরা জুলাই মাসে পাঁচটা ওয়ার্ডের ৭৫টি বাড়িতে পরীক্ষা করেছি। সেখানে ৩২টি বাড়ির ৪৩টি পাত্রে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে। আমাদের এখানে কাজের ফল হচ্ছে ৫৭ দশমিক ৩৩ ভাগ বাড়িতে এডিস মশা পাওয়া গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইনে বলা আছে, ২০ ভাগের বেশি এলাকায় এডিসের উপস্থিতি থাকলে সেই এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়। সে অবস্থায় আমরা বলতে পারি রাজশাহীতে আমরা ভয়াবহ অবস্থায় আছি।’

তিনি বলেন, ‘এ অবস্থা আমাদের প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। সেজন্য পাত্রগুলো ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থা করতে হবে। ফুলের গাছ এমনভাবে রাখতে হবে যেন পানি দিলে পানি নিতে বের হয়ে যায়। আপনার বাসায় যদি ট্যাংকি থাকে, সেখানে তো মশা হবেই, সেখানে মাছ ছেড়ে দিলে সে মশার লার্ভা খেয়ে নেবে এটাকে বলে ম্যানেজমেন্ট। জনসচেতনতা থেকে এটা আমরা রক্ষা পেতে পারি।’ এডিস মশা ছড়িয়ে পড়া রোধে নিজের বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে আরও বেশি সচেতনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি।

রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন অফিসের জেলা কীটতত্ত্ববিদ উম্মে হাবিবা বলেন, ‘রাজশাহী সিটি করপোরেশনের পাঁচটা ওয়ার্ডে আমরা কাজ করেছি। ৭৫টি বাড়িতে পরীক্ষা করে দেখতে পেয়েছি, বাড়ির আশপাশে অনেক কনটেইনার, ফুলের টব, ডাবের খোলা, ছাদবাগানের বিভিন্ন টব, দইয়ের খোলা হাঁড়ি, খেলনা হাঁড়িপাতিল। এগুলোতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। আমরা এ পরীক্ষার ফল সিটি করপোরেশনকে পাঠিয়েছি। সেই সঙ্গে তাদের সুপারিশও করেছি। যাতে তাদের এসব ধ্বংস করতে বা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সুবিধা হয়।’

এদিকে বর্ষা মৌসুম শুরুর পর থেকেই এ বছর রাজশাহীতে ডেঙ্গু সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। গত দুই মাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩০৩ জন ডেঙ্গু রোগী। তাদের মধ্যে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে একজন শিশুও রয়েছে।

রামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘এ মৌসুমের ডেঙ্গুটা কিন্তু নীরবে শুরু হয়েছে। আমরা যদি একটু সুনির্দিষ্টভাবে বলি, গত দুই মাসে এটি তার সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছে গেছে। আমরা বেশি লক্ষ করছি, রোগীরা হলো রাজশাহীর আশপাশের। সব থেকে বেশি রোগী আসছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে। আগে রোগীদের ঢাকা বা অন্য কোথায় ট্রাভেলিংয়ের ইতিহাস থাকত। তবে এখন সেটি পাওয়া যাচ্ছে না। তারা লোকালেই আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের হাসপাতাল আগে থেকে প্রস্তুত ছিল। আমরা ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করেছিলাম। আমাদের ডেঙ্গু প্রতিরোধে একটি টিম রয়েছে, তারা এসে বা নিশ্চিত করে যাচ্ছে।’

তবে রাজশাহী সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, পুরো নগরীতেই ডেঙ্গুর লার্ভা ছড়িয়ে আছে এমন ভাবনা নিয়েই কাজ করছে তারা। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন বলেন, ‘প্রতি বছরই বর্ষার সময় এডিস মশার একটা প্রকোপ হয়। বর্ষার পর বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকে। আমাদের সিটি করপোরেশন এলাকায় পরীক্ষা করে স্বাস্থ্য বিভাগ ৫৭ শতাংশ এডিস মশা আছে দেখেছে। আমি এটা ভালো দিক বলব যে, আমাদের গোটা সিটি করপোরেশনে সমস্যা। শুধু ৫৭ শতাংশ আছে এমনটি নয়, আমরা মনে করি গোটা রাজশাহী করপোরেশনে এডিস মশা আছে। সে অনুযায়ী আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত