জীবনে প্রবাদ-প্রবচন, চাণক্য শ্লোক, খনার বচন, বাণী, ঠাকুরমার ঝুলি, ঈশপ, শেখ সাদি, সান জু বা কনফুসিয়াসের নীতিকথামূলক গল্প বা ঘটনাগুলো খুব তাৎপর্যপূর্ণ। এসব কথা বা বচনের মধ্যে এমন কিছু আছে, যা অপরিহার্য। জীবনের এমন কোনো বিষয় নেই, যা এর মধ্যে নেই। সর্বজনগ্রাহ্য উপদেশমূলক কথাগুলোকে আমাদের সমাজে অনেকটা সমৃদ্ধ এবং চিরন্তন সত্য মনে করা হয়। আগে বাণীগুলো সুইসুতো দিয়ে কাপড়ে লিখে বাঁধাই করে রাখা হতো। এখনো মফস্বল শহর বা গ্রামের বাড়িতে দেখা যায়। এক সময় বিখ্যাত ব্যক্তিদের কোটেশন লিখে রাখাও শখ ছিল। এগুলোর ভেতর তখনকার সমাজের রূপ ফুটে উঠত। সম্ভবত এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের অনেকে, প্রবাদ-প্রবচন ভালো করে জানেও না। তাই প্রবাদ-প্রবচনের কোনো প্রভাব তাদের জীবনে পড়ছে না। নীতিকথার সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আমাদের দেশে ‘ডেন কার্নেগি’ একটি পরিচিত নাম। তিনি বলেছেন, ‘জীবনে পাওয়ার হিসাব করুন, না পাওয়ার দুঃখ থাকবে না।’ স্প্যানিশ প্রবাদে বলা হয়েছে, ‘টাকা যখন মুখ খুলে, তখন সবাই মুখ বন্ধ করে থাকে।’ গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল বলেছেন, ‘আইন গরিবদের শাসন করে আর ধনীরা আইনকে শাসন করে।’ ‘মানুষকে বোকা বানানো সহজ, কিন্তু বোঝানো কঠিন যে তাদের বোকা বানানো হয়েছে’ মার্ক টোয়েন।
চে গুয়েভারা অনেক তরুণের কাছে আদর্শ। তার ছবি সংবলিত টি-শার্ট পরতে তারা পছন্দ করেন। বিপ্লবের আইকন চে গুয়েভারা। তিনি বলেছেন, ‘আমি এখন পরাজিত হয়েছি তার মানে এই নয় যে বিজয় অসম্ভব।’ আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের আরেক বীর মহীসুরের টিপু সুলতান। যার সুখ্যাতি ছড়িয়ে আছে ভারত জুড়ে। শেষ পর্যন্ত তিনি যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। তার বিখ্যাত উক্তি, ‘শেয়ালের মতো একশ বছর বাঁচার চেয়ে সিংহের মতো এক দিন বাঁচাও ভালো।’ ইংরেজি সাহিত্যে বেকনের লেখা গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় সারা পৃথিবীতে তার লেখাগুলো পড়ানো হয়। আজ থেকে প্রায় পাঁচশ বছর আগে জীবনঘনিষ্ঠ এই লেখাগুলো তিনি লিখেছেন। বেকন তার লেখাতে সংক্ষিপ্তভাবে জীবনের অনেক সত্য তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘কিছু বই চেখে দেখার, কিছু গিলে ফেলার, তবে কিছু বই চিবিয়ে হজম করার মতো।’ Great place আর্টিক্যালে বলেছেন, ‘উচ্চপদাসীন ব্যক্তিরা তিন ধরনের দাসত্ব বেছে নেন : রাষ্ট্র বা শাসকের দাসত্ব, খ্যাতির দাসত্ব ও কর্মের দাসত্ব। তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা, কর্মের স্বাধীনতা বা সময়ের স্বাধীনতা কোনোটাই থাকে না।’
Power corrupt absolute power corrupts absolutely-Lord John Acton (ক্ষমতা মানুষকে কলুষিত করে, আর সর্বময় ক্ষমতা মানুষকে সম্পূর্ণরূপে কলুষিত করে)। সর্বময় ক্ষমতা সম্পর্কে উনিশ শতকের ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ ও ইতিহাসবিদ লর্ড জন একটন (১৮৩৪-১৯০২) যে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন, অতীতের মতো আজও সমানভাবে তা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, দল বা দেশের জন্য প্রযোজ্য। All are equal but somebody is more equal than others (সবাই সমান কিন্তু কেউ কেউ একটু বেশি সমান)। জর্জ অরওয়েল (২৫ জুন ১৯০৩-২১ জানুয়ারি ১৯৫০)-এর এনিমেল ফার্মের এই লাইনটি এখন প্রবাদে পরিণত হয়েছে। চীনের মাও সেতুং বলেছেন, ‘বিড়াল সাদা না কালো সেটা বড় কথা নয়, বিড়াল ইঁদুর ধরতে পারে কি না, সেটাই বড় কথা।’ গোল্ড স্মিথ বলেছেন, ‘ধনীদের কৌতুক সর্বদাই উপভোগ্য, আর দরিদ্রদের কৌতুক ইয়ার্কি ছাড়া আর কিছুই না।’ ‘সংসারে কারও ওপর ভরসা কোরো না, নিজের হাত ও পায়ের ওপর ভরসা করতে শেখো’ উলিয়াম শেকসপিয়ার। ‘মানুষ প্রজাতির বেঁচে থাকার প্রধান দুই প্রতিবন্ধক হলো নিউক্লিয়াস যুদ্ধ ও পরিবেশ বিপর্যয়। আমরা প্রতিদিন জেনেশুনে সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছি’ নোয়াম চমস্কি।
এমন অজস্র উদাহরণ দেওয়া যাবে। বলা হয়ে থাকে, এককালের ভালো কথা আরেক কালে বা ১০০ বছর পর মন্দ কথায় পরিণত হয়। আবার এককালের মন্দ কথা আরেক কালে ভালো কথা হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্রিটিশ লেখক ম্যামু আর্নন্ডরের মতে, ‘এক যুগের মুক্তচিন্তা আরেক যুগে কা-জ্ঞান বা সাধারণ জ্ঞানে পরিণত হয়’। প্রবাদ সম্পর্কে মনীষী বেকনের মত, ‘একটি দেশের জ্ঞান, প্রজ্ঞা আর মেধা দেশের প্রবাদেই ফুটে ওঠে’। জানা যায়, মিসরের Book of the dead পুস্তকের প্রবাদগুলো সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের পূর্ববর্তী। প্রাচীন গ্রন্থ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, ৪/৫ হাজার বছর আগেও মানব-সমাজে প্রবাদের ব্যবহার ছিল। বৈদিক-সাহিত্য ও বৌদ্ধ ত্রিপিটকেও প্রবাদের নজির আছে।
প্রবাদ একটি জাতির অন্তরের পরিচয় বহন করে। একটি জাতির বুদ্ধিমত্তা, কর্মকুশলতা ও চিন্তাধারার পরিচয় মেলে তাদের প্রবাদ সাহিত্যে। বলা হয়, AS the proverbs so the people. প্রবাদ জাতীয় চরিত্রের হুবহু প্রতিচ্ছবি। আমাদের প্রবাদ-প্রবচনের কাছেই ফিরে যেতে হবে, এমন উপলব্ধি অনেকের ভেতর। যদিও কিছু প্রবাদ-প্রবচন স্ববিরোধী, পরস্পরবিরোধী, নারীবিদ্বেষী বা সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে অন্তরায়। নীতিকথাগুলোকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে হবে সময়ের প্রয়োজনে। বাণীগুলো বদলাতে হবে-নাকি আমরা বদলাব বা আমরা বদলে গেছি বলেই বাণীগুলো আমাদের কাছে অসামজ্ঞস্য মনে হয়। সমাজে প্রবাদ-প্রবচন বা নীতিকথার প্রভাব কমে গেলেও ফুরিয়ে যায়নি এগুলোর আবেদন। এক ফোঁটা শিশিরেও বন্যা হতে পারে, যদি গর্তটা হয় পিঁপড়ের ফার্সি প্রবাদ। এই লাইনের মধ্যে রয়েছে এক অসাধারণ দর্শন। যে দর্শন জীবনকে সমৃদ্ধ করে। খুলে দেয় অন্তর্দৃষ্টি। ছোটবেলায় আমরা অনেকেই র্যাপিড রিডারে পড়েছি ইঁদুর আর সিংহের গল্প। কীভাবে বনের রাজা সিংহকে জাল থেকে মুক্ত করে ক্ষুদ্র ইঁদুর। একজন কাঠুরিয়া ও তার কুঠার হারানোর গল্প। এ ধরনের গল্পের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে জীবনের গূঢ় রহস্য, জ্ঞান প্রজ্ঞা ও দর্শন। এসব চর্চার মাধ্যমেই তৈরি হয় জীবনবোধ। মানুষ খুঁজে পায়, বেঁচে থাকার প্রেরণা। খনার বচন নিয়ে এখন গবেষণা হচ্ছে। খনার বচন প্রকৃতি ও সংস্কৃতিনির্ভর। সুবচনগুলোকে নির্বাসন থেকে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে আমাদের জীবন ও কর্মে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
