ইসরায়েল গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে স্থানীয় বেদুইন যোদ্ধাদের ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত জুনে একটি ভিডিও বার্তায় স্বীকার করেন, তারা গাজার পপুলার ফোর্সেস নামে একটি মিলিশিয়া গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও সমর্থন দিচ্ছে। তবে এই গোষ্ঠীটি ঠিক কী এবং কেন তাদের সমর্থন করা হচ্ছে, তা নিয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল পপুলার ফোর্সেস নেতা ইয়াসির আবু শাবাবকে ব্যবহার করে গাজায় জাতিগত নির্মূলের অভিযোগ থেকে নিজেদের দায়মুক্ত দেখাতে চাইছে। ৩১ বছর বয়সী আবু শাবাব গাজার তারাবিন বেদুইন গোত্রের সদস্য। ২০১৫ সালে মাদক-সংক্রান্ত অপরাধে কারাবন্দি হওয়ার পর ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলি আক্রমণের সুযোগে তিনি পালিয়ে যান। পরে প্রায় ১০০ জন যোদ্ধা নিয়ে পপুলার ফোর্সেস নামের মিলিশিয়া গঠন করেন।
ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ফেলো মুহাম্মদ শেহাদা জানান, প্রাথমিক শিক্ষার বাইরে আবু শাবাবের কোনো উল্লেখযোগ্য শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। তবু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি সরব এবং সংগঠিতভাবে উপস্থিত। সম্প্রতি তিনি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে একটি উপসম্পাদকীয় লিখে দাবি করেন, গাজার ফিলিস্তিনিরা হামাসের শাসন চান না। বিশ্লেষকদের ধারণা, আবু শাবাবকে গাজার বাইরে থেকে পরিকল্পিতভাবে তৈরি করে মিডিয়ার সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
শেহাদা বলেন, ‘গত দশকে আবু শাবাব সমাজে তেমন পরিচিত ছিলেন না। তিনি মূলত ইসরায়েলের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছেন।’ এমনকি তার নিজের গোত্র তারাবিনও তাকে প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতার জন্য দোষী সাব্যস্ত করেছে।
গত বছর রাফায় ইসরায়েলি আক্রমণের পর থেকে আবু শাবাবের নাম উঠে আসে। শেহাদার মতে, তিনি ও তার দল গাজায় প্রবেশ করা ত্রাণ ও খাদ্যের বেশির ভাগ পরিকল্পিতভাবে লুট করছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় প্রবেশ করা ১০টির মধ্যে ৯টি ত্রাণবাহী ট্রাক লুটের শিকার হয়। প্রথমে ইসরায়েল এই লুটের জন্য হামাসকে দায়ী করলেও, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই দাবি খণ্ডন করেছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রাপ্ত জাতিসংঘের একটি নথিতে আবু শাবাবকে এই লুটের প্রধান হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ বছরের শুরুতে যুদ্ধবিরতির সময় আবু শাবাব হঠাৎ নিখোঁজ হন, কিন্তু মে মাসে ত্রাণ প্রবেশের সময় তিনি আবার প্রকাশ্যে আসেন। শেহাদা বলেন, ‘তিনি ইসরায়েলের অনাহার পরিকল্পনার মুখপাত্র হয়ে উঠেছেন, ত্রাণ লুটের দায় থেকে ইসরায়েলকে মুক্তি দিচ্ছেন।’
বিশ্লেষকদের মতে, আবু শাবাব ও তার মিলিশিয়া গাজায় ইসরায়েলের জাতিগত নির্মূল পরিকল্পনায় সহায়তা করছে।
আল-শাবাকার ফেলো তারিক কেনি শাওয়া বলেন, ইসরায়েল এই মিলিশিয়াকে শক্তিশালী করে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মতো এলাকা তৈরি করছে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের রাখা হবে এবং পরে তাদের মিসর বা অন্য দেশে স্থানান্তর করা হবে।
গত মাসে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাত্জ ছয় লাখ ফিলিস্তিনিকে দক্ষিণ গাজায় ‘স্বেচ্ছায় অভিবাসন’নামে একটি শিবিরে সরানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, যা ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে।
মিডল ইস্ট কাউন্সিলের ফেলো ওমর রাহমান বলেন, ‘এই ক্যাম্পগুলো ফিলিস্তিনিদের গাজার বাইরে পাঠানোর জন্য তৈরি করা হচ্ছে।’
মিসর ইতিমধ্যে এই স্থানান্তর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। শেহাদা বলেন, ‘ইসরায়েল বুঝেছে যে, রাফায় কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প পরিচালনা করলে আন্তর্জাতিক সমালোচনা হবে। তাই তারা আবু শাবাবের মতো একজন ফিলিস্তিনি মুখ বেছে নিয়েছে।’
আবু শাবাব ফেসবুকে প্রচারণা চালাচ্ছেন, যা ক্লান্ত গাজাবাসীকে তার শিবিরে আশ্রয় নিতে প্রলুব্ধ করছে। কেনি শাওয়া বলেন, ‘আবু শাবাবের মিলিশিয়া ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প পরিচালনা করছে এবং সেগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে প্রচার করছে।’
এই কার্যক্রম গাজায় ইসরায়েলের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এদিকে পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজার প্রধান শহর গাজা সিটি দখলের আগে গত বুধবার ইসরায়েলি বাহিনী সেখানে তীব্র হামলা চালিয়েছে। এদিন তাদের হামলায় আরও ১২৩ জন নিহত হয়েছেন বলে ভূখণ্ডটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, এদিন ইসরায়েলি বিমান ও ট্যাঙ্কগুলো গাজা সিটির পূর্বাংশে বোমা ও গোলাবর্ষণ করে। রাতে চালানো বোমা হামলায় গাজা সিটির জেইতুন ও শেজাইয়া এলাকার বহু বাড়ি ধ্বংস হয়।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সেখানে অনাহার ও অপুষ্টিতে ভুগে তিন শিশুসহ আরও আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এদের নিয়ে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ভূখণ্ডটিতে অনাহারে ও অপুষ্টিতে ২৩৫ জনের মৃত্যু হল; যাদের ১০৬ জনই শিশু। অবশ্য ইসরায়েল অনাহার ও অপুষ্টিতে হওয়া এসব মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।
আলজাজিরা জানাচ্ছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় সব মিলিয়ে অন্তত ৬১ হাজার ৭২২ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। মোট আহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৫২৫ জনে।
