প্রতিষ্ঠার অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেছে। সময়ের স্রোতে বদলে গেছে প্রজন্ম, সমাজ, এমনকি রাষ্ট্রও। তবুও বদলায়নি জয়েন্তীপুর দাখিল মাদরাসার ভাগ্য। পাঁচ দশকের ইতিহাস গায়ে মেখে আজও দাঁড়িয়ে আছে দাখিল মাদরাসাটি। তবে এ দাঁড়িয়ে থাকাটা কোনো বিজয়ের প্রতীক নয়, বরং প্রমাণ একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কতখানি অবহেলিত হলে দাঁড়িয়ে থাকাটাও দুঃসহ বেদনার ভাষা হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অনুদান বা বেতেন ছাড়াই শিক্ষাদান করে আসছেন এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীরা। অনেকে বিনা বেতনে অবসর গ্রহণ করেছেন, আবার নতুন নিয়োগ প্রাপ্তরাও বছরের পর বছর অপেক্ষায় দিন গুনছেন কোন প্রকার সম্মানী পাওয়ার আশায়। প্রতিষ্ঠার অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেলেও মেলেনি এমপিও। ফলে আর্থিক দুর্দাশায় দিন কাটছে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১৭ জন শিক্ষক ও কর্মচারীর।
জানা যায়, উপজেলায় মোট ৭টি মাদরাসা রয়েছে। এ মধ্যে ছয়টি দাখিল ও একটি আলিম মাদরাসা। ১৯৭৫ সালে উপজেলার দয়ারামপুর ইউনিয়নের জয়েন্তীপুর গ্রামে মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুটা হয়েছিল একটি ফুরকানিয়া মাদরাসা হিসেবে, পরে ইবতেদায়ী, তারপর দাখিল স্তরে উন্নীত হয়। ২০০৩ সালে মাদরাসাটি পাঠদানের অনুমতি পায়। তারপর থেকেই শিক্ষার পরিসর বেড়েছে, কাঠামো তৈরি হয়েছে, ছাত্রছাত্রী বেড়েছে, শিক্ষক-কর্মচারীরাও যোগ দিয়েছেন কিন্তু ‘এমপিওভুক্ত’ নামক একটি শব্দ আজও কেবল স্বপ্নের মতো ধরা দেয় না বাস্তবে। এমপিওভুক্তির সব ধরনের শর্ত পূরন করার পরও এখনও বেতনভুক্ত তালিকায় স্থান পায়নি এই প্রতিষ্ঠান। জমি বরাদ্ধ, অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষক নিয়োগ, নিয়মিত পাঠদান, পাশের হারসহ সব কার্যক্রম চালু থাকলেও বেতনভাতা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন শিক্ষকরা।
বর্তমানে মাদরাসাটিতে ১৭ জন শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত আছেন। দীর্ঘ দিন এমপিওভুক্ত না হওয়ায় তাদের জীবন কাটছে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে।
শিক্ষাদানের পাশাপাশি জীবিকার তাদিগে তাদের অনেককে করতে হচ্ছে বিকল্প ধরনের কাজ। কারো দিন শুরু হয় সকাল থেকে টিউশনি করে, কেউ বিকেল বসে মুদির দোকানে, কেউ মসজিদের ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন আবার কেউ পিতার জমিজমা দেখাশুনা করে পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবুও চলমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে পরিবার-পরিজন নিয়ে দু’বেলা খাবারের সংস্থান করতেই নাভিশ্বাস উঠছে তাদের। জাতিকে শিক্ষিত করার লড়াইয়ে নিজেদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরনে আজও তারা দারুণভাবে পিছিয়ে পড়েছেন।
মাদরাসাটির সহকারী শিক্ষিকা মাহাবুবা মার্জিয়া বলেন,“ ২০০২ সাল থেকে তিনি এই মাদরাসায় চাকরি করছেন। তখন তার বড় ছেলের বয়স তিন বছর ছিল ছেলেকে নিয়েই চাকরি করেছেন। তার সেই ছেলে এখন মাস্টার্স পাশ করে চাকুরী করছে কিন্তু দুঃখের বিষয় তাদের এখনও বেতন হয়নি। অনেক
আত্মীয় স্বজন যখন বলে তাদের বেতন হয়েছে কি না, প্রতি উত্তরে বলেন না, নন এমপিও বলে অবহেলার চোখে দেখে, বিষয়টি তখন খুব খারাপ লাগে তার। তাই তার দাবি নন এমপিও শব্দটা আর যেন শুনতে না হয়।
মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা আজাদ আলী জানান, তিনি ২০০৪ সাল থেকে সেখানে শিক্ষকতা করছেন। প্রতিদিন ১০ কিলোমিটার দূর থেকে সাইকেলে চালিয়ে মাদরাসায় আসেন। সংসারে বৃদ্ধ বাবা-মা ও দুই মেয়ে নিয়ে খুব কষ্ট দিন পার করতে হচ্ছে। একটি মসজিদে ইমামতি করে যা সামান্য
পারিশ্রমিক পায়, সেটাই তার সংসারের একমাত্র ভরসা। শুধু তিনি না, মাদরাসার অনেক শিক্ষকই সামান্য আয়ে অন্য পেশায় কাজ করে কঠিন দিন পার করছেন। এ কষ্ট থেকে মুক্তি চান তারা।
ওই মাদরাসাটির প্রাক্তন ছাত্র ওই এলাকার বাসিন্দা সামিউল ইসলাম জানান, তার শৈশব-কৈশোর সেখানেই কেটেছে। মাদরাসা তারপর কুষ্টিয়া ইসলামিক
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে চাকরিরত তিনি। এলাকায় এলে একবার হলেও মাদরাসায় আসেন তিনি। কিন্তু প্রতিবারই শিক্ষকদের
দুর্দশা দেখে মন ভেঙে যায় তার। বছরের পর বছর বেতনহীনভাবে তাঁরা কষ্ট করে যাচ্ছেন। তাদের ভাগ্যের আর পরিবর্তন হয় না। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, মাদরাসাটির অবকাঠামোও ভেঙে পড়ছে, টিন ফুটো হয়ে পানি পড়ছে, জানালা-দরজা ভাঙ্গা, দেয়াল খসে পড়ছে। এমন ভঙ্গুর অবস্থায় শিক্ষকরা কিভাবে এই প্রতিষ্ঠান ধরে রাখবেন। এটা তার কাছে বেদনাদায়ক।তাই তিনি শিক্ষকদের এ দুর্দশা ঘোচানোর জন্য জোর দাবি জানান।
জয়েন্তীপুর দাখিল মাদরাসার সুপারিনটেডেন্ট রবিউল ইসলাম বলেন, অর্ধ শত বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠানটি স্থাপিত হলেও তারা এখনও এমপিওর মুখ দেখেননি।
সকল শর্ত পূরণ করার পরও তাদের এমপিও হয়নি। অনেক শিক্ষকের চাকরি জীবন প্রায় শেষের দিকে। অনেকে অবসরও নিয়েছেন। সারা জীবন বিনা পয়সায় শ্রম দিয়ে খালি হাতে বিদায় নিয়েছেন তারা। একদিন এমপিওভুক্ত হবে এ আশায় বারবারই নতুনভাবে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন দায়িত্বপালন করেছেন। কিন্তু তারা এমপিও এর মুখ দেখতে পান না। এক রকম প্রতি হিংসায় তাদের এই প্রতিষ্ঠানটিকে এমপিও হতে দেওয়া হয়নি বলে তিনি মনে করেন। এলাকার দ্বিতীয় সবচেয়ে পুরাতন মাদরাসা হিসেবে জনগনের শিক্ষার কথা বিবেচনা করে এবং শিক্ষক কর্মচারীদের দুর্দশা ঘোচানোর জন্য
প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ওয়াজেদ আলী মৃধা বলেন, উপজেলায় অনেক প্রতিষ্ঠানই এমপিওভুক্ত হয়েছে বা তালিকাভুক্তির অপেক্ষায়
রয়েছে। কেউ কেউ অল্প সময়েই এমপিও পেয়েছে। সেখানে জয়ন্তিপুরের মতো ৫০ বছরের পুরনো প্রতিষ্ঠানটির এমপিও না হওয়া দুঃখজনক। প্রতিষ্ঠানটি
এমপিও হওয়া জরুরী বলে মনে করেন তিনি।
ভোট গণনার আগ পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা আছে: গয়েশ্বর
খালেদা জিয়ার জন্মদিনে বিএনপির মিলাদ-দোয়া
মঞ্চে আজ ‘র্যাডক্লিফ লাইন’
লেভানদোভস্কির খোঁচা ‘ইয়ামালের মতো কাউকে পাবে না রিয়াল’