অস্ট্রেলিয়ার স্বর্ণযুগের স্থপতি বব সিম্পসন আর নেই

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৫, ০৪:৫৬ পিএম

অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ও কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব বব সিম্পসন আর নেই। সিডনিতে ৮৯ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। খেলোয়াড়, অধিনায়ক ও কোচ—তিন ভূমিকাতেই রেখে গেছেন অমলিন ছাপ। তার হাত ধরেই অস্ট্রেলিয়া গড়ে তুলেছিল আধুনিক যুগের স্বর্ণ অধ্যায়।

১৯৫৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে টেস্ট অভিষেক হয় সিম্পসনের। লেগস্পিনার ও অলরাউন্ডার হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও দ্রুতই নিজেকে গড়ে তোলেন পরিশ্রমী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ওপেনার হিসেবে। ১৯৫৭ থেকে ১৯৭৮ পর্যন্ত খেলেছেন ৬২ টেস্ট, রান করেছেন ৪ হাজার ৮৬৯, গড় ৪৬.৮১। ব্যাট হাতে দশ সেঞ্চুরি করেছেন, সব কটিই অধিনায়ক হিসেবে। এর মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল ১৯৬৪ অ্যাশেজে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ৩১১ রানের ইনিংস অস্ট্রেলিয়ার জন্য অ্যাশেজ ধরে রাখার ভিত্তি হয়ে ওঠা এক মহাকাব্যিক লড়াই।

বিল লরির সঙ্গে সিম্পসনের উদ্বোধনী জুটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের সেরা। ৬২ ইনিংস একসঙ্গে ব্যাট করে ৬০.৯৪ গড়ে ৩ হাজার ৫৯৫ রান এসেছে এই জুটিতে। এখনও তা অস্ট্রেলিয়ার তৃতীয় সফলতম উদ্বোধনী জুটি। ১৯৬৫ সালে ব্রিজটাউনে দুজনের ৩৮২ রানের জুটি এখনও অস্ট্রেলিয়ার রেকর্ড। ওয়েস হল, চার্লি গ্রিফিথ, গ্যারি সোবার্স, ল্যান্স গিবসের সামনে দুজনই করেছিলেন ডাবল সেঞ্চুরি। অসাধারণ স্লিপ ফিল্ডার ছিলেন। ১১০টি ক্যাচ নিয়েছেন। লেগ স্পিনে শিকার করেছেন ৭১ উইকেট। 

অ্যালান বোর্ডারকে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন অসাধারণ এক দল

১৯৬৮ সালে প্রথমবার অবসর নিলেও ক্যারি প্যাকারের ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেটের অস্থির সময়ে দেশের ডাকে আবার ফিরে আসেন। ৪১ বছর বয়সে ভারতের বিপক্ষে সেঞ্চুরি হাঁকান, সিরিজ জেতান অস্ট্রেলিয়াকে। ক্যারিবিয়ান সফরেও নেতৃত্ব দিয়েছেন।

খেলোয়াড়ি জীবন শেষে তার অবদান আরও মহিমান্বিত হয় কোচ হিসেবে। ১৯৮৬ সালে প্রথম পূর্ণকালীন অস্ট্রেলিয়ান কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন। তখন টানা দুই বছর টেস্ট সিরিজ জিততে ব্যর্থ ছিল দল। অধিনায়ক অ্যালান বোর্ডারের সঙ্গে মিলে শৃঙ্খলা, ফিটনেস, ফিল্ডিং ও কঠোর পরিশ্রমকে কেন্দ্র করে নতুন সংস্কৃতি গড়ে তোলেন তিনি।

তার হাত ধরে উঠে আসেন ডেভিড বুন, ডিন জোন্স, স্টিভ ওয়াহ, ক্রেইগ ম্যাকডারমট, পরে শেন ওয়ার্ন, মার্ক টেইলর, ইয়ান হিলি, রিকি পন্টিংদের মতো তারকারা। ১৯৮৭ সালে ক্রিকেট বিশ্বকে অবাক করে বিশ্বকাপ জয় করে অস্ট্রেলিয়া। ১৯৮৯ সালে পুনরুদ্ধার করে অ্যাশেজ, ১৯৯৫ সালে জয় করে ফ্র্যাঙ্ক ওরেল ট্রফি, ২০ বছরেরও বেশি সময় পর ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে বিশ্বের সেরা দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে তারা।

শেন ওয়ার্নসহ অনেকের কাছেই সিম্পসন ছিলেন সর্বকালের সেরা কোচ। খেলোয়াড়দের মধ্যে শৃঙ্খলা আনার পাশাপাশি কৌশলগত প্রজ্ঞা দিয়ে তিনি গড়ে দিয়েছিলেন আধুনিক অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের ভিত।

অস্ট্রেলিয়ার দায়িত্ব ছাড়ার পরও ক্রিকেটে ছাপ রেখেছেন তিনি। ইংলিশ কাউন্টিতে কোচিং করেছেন লেস্টারশায়ার ও ল্যাঙ্কাশায়ারকে, ভারতের রঞ্জি ট্রফিতে ছিলেন পরামর্শক, এমনকি ২০০৭ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসকেও নেতৃত্ব দিয়েছেন কোচ হিসেবে।

শেন ওয়ার্ন বব সিম্পসনকে সর্বকালের সেরা ক্রিকেট কোচ হিসেবে মর্যাদা দিতেন

তার ক্রিকেটজীবনের স্বীকৃতি এসেছে নানা পুরস্কার ও সম্মানে। ১৯৬৫ সালে উইজডেনের বর্ষসেরা ক্রিকেটার নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ সালে ‘অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া’ পান, ২০০৭ সালে পান ‘অফিসার অব অস্ট্রেলিয়া’ খেতাব। আইসিসি ও অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট—দুটিরই ‘হল অব ফেম’-এ স্থান পেয়েছেন তিনি।

ক্রিকেটের মাঠে, স্লিপে ঝাঁপানো হাতে কিংবা কোচের শাসনে গড়া শৃঙ্খলায়—সর্বত্রই ছাপ রেখে গেছেন বব সিম্পসন। বিদায় নিলেন তিনি, কিন্তু তার গড়া স্বর্ণযুগই প্রমাণ করে—ক্রিকেটে তিনি অমর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত