করপোরেট প্রতিষ্ঠানে কর্মী ও ব্যবস্থাপনা পর্ষদের ভেতর মিথস্ক্রিয়া সৃষ্টিতে নানান রকম চর্চার যে সংস্কৃতি দেখা যায়, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে সে-রকমই একটি উদ্যোগ নিয়েছেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। মঙ্গলবার ঢাকার একটি হোটেলে হয়ে গেল বিসিবি’র ‘শেয়ার অ্যান্ড কেয়ার’ বৈঠক, যেখানে অংশ নিয়েছেন চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটার, কোচ, মেডিকেল স্টাফ ও বিসিবি’র পরিচালকরা। বৈঠক শেষে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেছেন, এমন শেয়ার অ্যান্ড কেয়ার বৈঠক প্রতি ৩ মাস পরপর করতে চান।
সকাল থেকেই দলের অফিশিয়াল ট্রাভেল জার্সিতে একে একে হোটেলে আসতে শুরু করেন বিসিবির সঙ্গে বার্ষিক চুক্তিতে আবদ্ধ ক্রিকেটাররা। দুটো সেশন ছিল বৈঠকে। একটি ছিল শেয়ার অ্যান্ড কেয়ার, যেখানে খেলোয়াড়রা একটি জরিপে অংশ নিয়েছেন। বিসিবি’র বিভিন্ন কার্যক্রমের ব্যাপারে তাদের মতপ্রকাশ করেছেন। দ্বিতীয়টি ছিল খেলার নৈতিকতা নিয়ে। বিসিবিতে সদ্যই যোগদান করা অ্যালেক্স মার্শাল, যিনি আগে আইসিসির নৈতিকতা বিভাগের প্রধান ছিলেন; তিনি বুঝিয়েছেন ক্রিকেটে দুর্নীতি ও মাদকের বিস্তার কীভাবে রোধ করা যায় সেই ব্যাপারে। সভা শেষে বুলবুল সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘আজ জাতীয় দলের টোটাল যত খেলোয়াড় আছে, লাল বলে এবং সাদা বলে যারা খেলছে এবং আমাদের সাপোর্ট স্টাফ যারা আছেন, আমাদের কোচরা আছেন, আমরা সবাই একত্র হয়েছিলাম। আমাদের বোর্ডের পরিচালক যারা আছেন সবাই এখানে ছিলেন। আমাদের প্রোগ্রামটার নাম ছিল শেয়ার অ্যান কেয়ার। আমরা মনে করি যে আমাদের যে দলটা মাঠে খেলে, সেটা একটা দল; যারা ডাগআউটে বসে থাকে তারা একটা দল আর আমরা যারা বোর্ডে বসে কাজ করি আমরা একটা দল। এই তিনটা দলের অ্যাকচুয়াল পারফরম্যান্স কী, আমরা তাদের কাছে ৮টা প্রশ্ন করেছিলাম, আমরা ৮টা প্রশ্ন করার পর তারা আমাদের কাছে ফিরে এসেছে এবং উত্তরগুলো ডাটা অ্যানালিসিস করে আমরা দেখেছি, তাদের সঙ্গে শেয়ার করেছি, আমাদের ইমপ্রুভের যে এরিয়াগুলো আছে সেগুলো আরও কীভাবে বেটার করতে পারি।’
বুলবুল আরও জানান, ‘আরও একটা সেশন ছিল, আপনারা জেনে থাকবেন, আমাদের যে ইন্টিগ্রিটি ইউনিট আছে,আমাদের দেশের ক্রিকেটটাকে প্রটেক্ট করার জন্য আমাদের কী কী করণীয়, এই লক্ষ্যে কাজটাকে আমরা খুব সিরিয়াসলি নিয়েছি, যেটা আমাদের চার্টারের মধ্যে আছে ইন্টিগ্রিটি অব দিস গেম। আপনারা জানেন, ডোপিং একটা বড় ব্যাপার, এখন আমাদের দল শুধু আইসিসি ইভেন্ট আর বাই-ল্যাটারাল সিরিজই খেলছে না, এশিয়ান গেমসে খেলছে, একসময় হয়তো অলিম্পিকেও খেলবে, তাই এন্টি-ডোপিং কত ইম্পর্টেন্ট, সেফ গার্ডিং কত ইম্পোর্টেন্ট।’ বিসিবিতে যোগ দেওয়া সাবেক ব্রিটিশ পুলিশ কর্মকর্তা ও আইসিসি’র দুর্নীতি দমন সংস্থার সাবেক মহাব্যবস্থাপক অ্যালেক্স মার্শাল সাংবাদিকদের জানান, ‘আমি এখানে এসেছি সভাপতি ও বোর্ডের সঙ্গে কাজ করতে, মূলত ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের দেখভাল করব। এই শতকের শুরু থেকেই বাংলাদেশ ক্রিকেট ক্রিকেটে শীর্ষ পর্যায়ে আছে। সমর্থকরা মাঠে যে খেলাটা দেখেন তা প্রবলভাবে বিশ্বাস করেন। এবং নারী ও পুরুষ যে ক্রিকেটাররা দেশের হয়ে খেলেন তারা এই খেলাটাকে কলুষতা মুক্ত রাখেন। নিরাপত্তা জোরদার করার জায়গা আছে, কারণ সবসময় এখানে কলুষতার সম্ভাবনা থাকে। পুরো বিশ্বেই তারা সুযোগ খুঁজে বেড়ায়। তারা চেষ্টা করে খেলোয়াড়দের হাত করতে, যাতে তারা ভালো না খেলে। আমি নিশ্চিত করতে চাই, বাংলাদেশের হয়ে যে নারী ও পুরুষ ক্রিকেটাররা খেলেন, তারা যেন সুরক্ষিত থাকেন। প্রেসিডেন্ট, সিইও ও বোর্ড মেম্বারদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। তারা আমাকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন। আমরা ইন্টিগ্রিটি ইউনিটকে নতুন করে সাজাব। আমাদের লক্ষ্য হলো সবাইকে শিক্ষিত করে তোলা, তারা যাতে বুঝে কী করতে হবে। তারা যেন সচেতন হয়ে ওঠে। এবং দুর্নীতিবাজরা সুযোগ করতে না পারে।’
বাংলাদেশের ক্রিকেটকে, বিশেষ করে বিতর্কের প্রতিশব্দ হয়ে ওঠা বিপিএলকে কলঙ্কমুক্ত রাখতে চান মার্শাল, ‘সবখানে এখন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ হচ্ছে, যেখানে সহজেই দুর্নীতিবাজরা সুযোগ পেয়ে যায়। বিপিএল জনপ্রিয় একটি লিগ। এখানে সব কিছু হতে হবে উঁচু মানের, প্রফেশনাল, সুরক্ষিত। বিশ্বের যেকোনো জায়গাতেই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ সুরক্ষিত হওয়া উচিত। আমি বিপিএলে এটা নিশ্চিত করতে কাজ করব।’
বুলবুল জানিয়েছেন, ‘তারা (ক্রিকেটাররা) মাইক হাতে নিয়ে কথা বলছিল, তারা মনের কথাগুলো প্রকাশ করছিল, এটাই সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার এবং মনে হচ্ছিল আমরা সবাই মিলে একটা দল।’ শুধু তাই নয়, জরিপেও মত দিয়েছেন ক্রিকেটাররা, জানিয়েছেন বুলবুল, ‘আমরা সার্ভে করেছি। সার্ভের মধ্যে তাদের যে মতামত সেটা তারা লিখেছে। তারা তাদের মনের কথা লিখেছে। সবচেয়ে ভালো লেগেছে যে লেখার পরেও তারা যেহেতু সশরীরে উপস্থিত ছিল সেখানে, তারা তাদের যে সমস্যাগুলো আছে সেসব শেয়ার করেছে, সাকসেস শেয়ার করেছে এবং বলেছে যে ক্রিকেটাররা এখন যে পর্যায়ের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে তাতে তারা খুশি।’
এই দুই সেশন শেষে ক্রিকেটাররা নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সিরিজের জন্য প্রস্তুতি নিতে সিলেটে চলে গেছে।
