ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার জাদুর কাঠি রয়েছে এমন ধারণা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবশেষ নির্বাচনের আগে উড়ে বেড়াচ্ছিল। নির্বাচনের আগে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় বসামাত্র, তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করবেন। কিন্তু এখনো যুদ্ধ বন্ধ হয়নি। বিশেষজ্ঞরা ভেবে পাচ্ছিলেন না, ট্রাম্পের হাতে এমন কী ম্যাজিক রয়েছে যে- সেই ম্যাজিক দিয়ে রাশিয়াকে বশে আনবেন। তখন মনে হচ্ছিল, এই যুদ্ধটা তাহলে আমেরিকা চাইলেই বন্ধ করতে পারে। পৃথিবীর একচ্ছত্র পরাশক্তি হিসেবে সেই ক্ষমতা দেশটির রয়েছে। আদতে এসব ধারণা যে অচল এবং যুদ্ধ বন্ধের বল মূলত আমেরিকার নয় বরং রাশিয়ার কোর্টে রয়েছে, আলাস্কায় দুই পরাশক্তির টেবিলে সেটা বোঝা গেল। রাশিয়ার ওপর একের পর এক অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ, কূটনৈতিক চাপ, ইউক্রেনকে সামরিক সাহায্য এবং সর্বশেষ পারমাণবিক উত্তেজনা সৃষ্টি কোনো থিওরি কাজে আসেনি। সেক্ষেত্রে বলা যায়, আনুষ্ঠানিক প্রথম প্রচেষ্টায় ট্রাম্প ব্যর্থ হয়েছেন। রাশিয়া কোনোভাবেই স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে এতটুকু ছাড় দিতে রাজি নয়। যদিও দেশের ভূখন্ড কিছুটা ছাড়ের প্রশ্নে ইউক্রেনও অনড় অবস্থানে। যে আলাস্কা আলোচনার ওপর পৃথিবী, বিশেষত ইউরোপের নজর ছিল সেখানে ইউক্রেনের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। এটা পরিস্থিতিকে আরও সমালোচনার ভেতর ফেলেছে। এই দুই পরাশক্তি কী ঠিক করবে, কখন যুদ্ধ বন্ধ হবে আর কখন শুরু করতে হবে? প্রশ্নটা অনেকটাই এ-রকম।
ট্রাম্প আশ্বাস দিয়েছিলেন, ইউক্রেনের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো চুক্তি হবে না। আলাস্কাতে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে ডেকে এনে ত্রিমুখী বৈঠক হবে, এমন কথা বলেছিলেন। যেহেতু তেমন কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছেন ট্রাম্প অতএব, ইউক্রেন প্রতিনিধির আসার কোনো যুক্তি ছিল না। অবশ্য লাভ যে একেবারেই হয়নি, তা নয়। অন্তত দুই পরাশক্তি মুখোমুখি আলোচনার টেবিলে বসতে পেরেছে, সেটাই বা কম কী? প্রশ্ন হলো, ট্রাম্পের কথায় পুতিন যে রাজি হবেন যুদ্ধ বন্ধ করতে বা কোনো শর্তে রাজি হতে, এর কি সত্যিই কোনো কারণ ছিল? এ মুহূর্তে যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেন রয়েছে চাপে এবং বিপরীতে রাশিয়া সুবিধাজনক অবস্থানে। ইউক্রেনে হামলা করে রাশিয়া পশ্চিমা বিশ্বকে কার্যত একাই চাপে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যেখানে পশ্চিমা দেশগুলো নিশ্চিন্ত ছিল যে, তাদের কথাই শেষ কথা। তারা ভেবেছিলেন, রাশিয়া খুব বেশিদূর এগুতে সাহস করবে না। সেটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আধিপত্যবাদের লড়াইয়ে রাশিয়া নিজেকে ঠিক জায়গায় ধরে রেখেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের সহায়তা সত্ত্বেও ইউক্রেন তেমন সুবিধা করতে পারেনি। এখন রাশিয়ার স্বার্থ বাদ দিয়ে য্দ্ধু বন্ধ করার কোনো বিকল্প নেই ট্রাম্পের হাতে। ক্ষমতায় এসে এতদিন পরও যুদ্ধ বন্ধের কোনো সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেননি। তবে এই কথাটা প্রমাণ করেছেন যে কোনো কিছু বলা যত সহজ, করা তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি কঠিন। তারপর আবার সেটি যদি হয়, আন্তর্জাতিক কোনো বিষয়। আলোচনার পরপরই ইউক্রেনে রাশিয়া ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, এই যুদ্ধ বন্ধে যে শর্তগুলো রয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি করেছেন পুতিন। যুদ্ধ শুরুর ‘মূল কারণ’গুলোর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেনের নিরস্ত্রীকরণ, ন্যাটো জোটে অংশগ্রহণ না করার নিশ্চয়তা এবং সেখানে নতুন নির্বাচন। অনুমান করা হচ্ছে, অপর যে শর্তটি তিনি ট্রাম্পকে জানিয়েছেন, তা হলো এরই মধ্যে পূর্বাঞ্চলের যে এলাকাগুলো মস্কো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে (রাশিয়া এরই মধ্যে ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ জমি নিজের দখলে নিয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য শূন্য ৮ শতাংশ রুশ জমি বা পাঁচ বর্গমাইল), রাশিয়ার সীমানা হিসেবে তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ইউক্রেনের বিশাল অংশ রাশিয়ার দখলে। আর রাশিয়ার খুব সামান্য ইউক্রেনের কাছে। এটা বদলের চুক্তি কেন করতে যাবে রাশিয়া? ছাড় দেওয়ার হলে তো আগেই দিতে পারত রাশিয়া। এত চুক্তির দরকার হতো না। বিভিন্ন শর্ত মেনে যুদ্ধ বন্ধে যাওয়া ইউক্রেনের জন্য যেমন কঠিন, সেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও লজ্জাজনক। কারণ এখানে ইউক্রেনের সুবিধার কথা কোথাও থাকছে না। একতরফা বিসর্জন দিয়ে যুদ্ধ বন্ধ করতে রাজি হওয়া বা ইউক্রেনকে রাজি করানো সত্যিই কঠিন। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, এতে কদিন রাশিয়ার শর্তে রাজি না থেকে পারা যায়, সেটাই প্রশ্ন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুসম্পর্ক এই ধারণা পোক্ত করতে সাহায্য করেছে যে, ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বেশ সহজেই করতে পারবেন। কারণ ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছিল এবং সেই অভিযোগ দীর্ঘদিন আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। যদিও সেটি ট্রাম্প অস্বীকার করেছেন বরাবর। পুতিনও স্বীকার করেননি। কিন্তু দুজনের সম্পর্ক ভালো। তার প্রমাণ পাওয়া যায় পুতিনের কথায়। পুতিন বলেছেন, ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকলে, রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালাত না। পূর্ব ইউরোপেও কোনো যুদ্ধ হতো না। তবে সে সময়কার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার কথা শোনেননি বলেই, রাশিয়া বাধ্য হয়ে ইউক্রেন আক্রমণ করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। রাশিয়াকে চাপে ফেলার কৌশল যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন উপায়ে নিতে চায়। এর একটি হলো, অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা। ছাড় দেয়নি মিত্রদেশ ভারতকেও। ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘটনায় রীতিমতো বিস্মিত ভারত ও বিশ্ব। এটা যে রাশিয়া থেকে ভারতকে তেল কিনতে বিরত রাখতে, সেটা এখন প্রকাশ্যে। ট্রাম্পের কথায়, তেল বিক্রির অর্থ ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সাহায্য করছে এবং পরোক্ষভাবে ভারতও রাশিয়াকে সাহায্য করছে। এখন এটি বন্ধ হবে। যদিও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না, ভারত আদৌ পুরোপুরিভাবে রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করবে কি না। একদিকে বন্ধুর বুলি, অন্যদিকে চাপে রাখার কৌশল ট্রাম্পের। এতেই বোঝা যায়, যুদ্ধ বন্ধ করতে কতটা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। কিন্তু কেন এত প্রচেষ্টা?
এর কারণ হতে পারে বিশ্বে একটি ইমেজ তৈরি করা, সেটি একটি যোগ্য নেতৃত্বের যে বিশ্বকে দেখানো যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই পারে! সেই সঙ্গে ট্রাম্পের নির্বাচনের আগে দেওয়া বক্তব্য সত্য প্রমাণিত করা। যা এরই মধ্যে নিজের ধস নামা জনপ্রিয়তাকে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে। স্বভাবতই এই আলোচনার পর বল ঠেলে দিয়েছেন ইউক্রেনের কোর্টের দিকে। অর্থাৎ রাশিয়ার দাবিগুলো যদি মেনে নেয় তাহলে অনায়াসেই এই যুদ্ধ বন্ধ হতে পারে। ফলে যা করার জেলেনস্কিকেই করতে হবে। আবারও বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তিন দেশের নেতাদের উপস্থিতিতে। যদি ইউক্রেন এসব শর্ত সেভাবে গ্রহণ করতে না পারে, তাহলে এই আলোচনায় বসা হয়তো হবে না। এখানে ভাবার বিষয় ইউরোপ কী চায়? যুদ্ধবিরতি অবশ্যই চায়, তবে সেটি ইউক্রেনেই অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে হবে কি না? যুক্তরাষ্ট্রের অন্য মিত্র দেশগুলোর বিষয়টিকে ভালোভাবে গ্রহণ করতে কষ্ট হবে। আজ যে শর্ত ইউক্রেনকে মানতে বাধ্য করা হতে পারে, কাল সেটি অন্য কোনো দেশের ভাগ্যেও জুটতে পারে। তখন মিত্র দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আজকের মতোই আস্থা রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। সেটা এখনই কমেছে অনেকখানি। ভবিষ্যতে আরও প্রভাব পড়বে। দেশগুলো স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা ইতিমধ্যেই শুরু করেছে।
অনমনীয় পুতিনের কাছে ট্রাম্প কিছুটা বিরক্ত। কোনোভাবেই পুতিনকে রাজি করাতে পারেননি এবং এটি ব্যর্থতা। এখন শর্তগুলোতে রাজি হওয়ার বিষয়ে ইউক্রেনের ঘাড়ে দায় চাপানোর চেষ্টা চলছে। এখন কার্যত যুদ্ধ একপক্ষীয়। ইউক্রেন বহু কিছু হারিয়েছে। এখনো ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। রাশিয়া তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে পেরেছে এই যুদ্ধে। ইউক্রেনের এলাকা দখল করা, পার্শ¦বর্তী দেশগুলোকে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের পরিণতির কথা, ন্যাটোর সঙ্গে রাশিয়ার দ্বন্দ্বের কথা এবং সামগ্রিকভাবে মিত্র দেশগুলো কে কতটা কাজে আসতে পারে সেই হিসাব করতেই হবে। ইউক্রেন নিজের জমি হারিয়েছে আবার ট্রাম্পের সঙ্গে খনিজ চুক্তি করতে এক রকম বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়াকে থামানো এবং ইউক্রেনের স্বার্থরক্ষা করা যে কঠিন হবে সে তো জানা ছিল। ইউক্রেনকে চাপে ফেলে বা মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে পরাজিত করে যুদ্ধ বন্ধ করতে জোর দেওয়ার যে কৌশল সেটাতে ইউক্রেনকে মনোযোগী হতে হয়েছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ যদি থেমেও যায় সেটি কোনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না। এক ধরনের অস্বস্তি নিয়ে যুদ্ধ শেষ হবে যেখানে একটি দেশ একতরফাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং শিকার হবে জটিল বৈশ্বিক রাজনীতির। ২০২৩ সালের এপ্রিলে ন্যাটোতে যোগ দেয় ফিনল্যান্ড। আর বাদ থাকে ইউক্রেন। এরপর থেকে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ এবং বিমানঘাঁটি সংস্কারের কাজ শুরু করেছে রাশিয়া। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে ইউক্রেনের অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে এবং জীবনযাত্রা ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। যুদ্ধ যদি বন্ধও হয় তাহলেও এসব মেরামত করতে দরকার বিপুল পরিমাণ অর্থের। তারও আগে দরকার যুদ্ধ বন্ধ হওয়া। যদি ইউক্রেনকেই সব ছেড়ে দিতে হয় তাহলে এই ঘটা করে ডাকা বৈঠকের দরকার কী ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব তো অনেক আগেই রাশিয়ার দাবি ছিল। বৈঠকে ট্রাম্পের দেওয়া প্রস্তাবের কিছু অন্তত, পুতিনকে রাজি করানো সম্ভব হবে; আশা ছিল এমনটাই যার কৃতিত্ব নিতে পারতেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনে বিজয়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত, সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত হতে পারত আলাস্কা বৈঠক। শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। রাশিয়া যে পরাশক্তি হিসেবে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ এবং যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই সেটি করতে রাশিয়া বাধ্য নয়, তার প্রমাণ দিয়েছেন পুতিন। ফলে আলাস্কা বৈঠকে পুতিনের সঙ্গে আলাপ হওয়াটা যতটা না ট্রাম্পের জন্য দশে দশ পাওয়ার মতো আনন্দের, তার থেকে পুতিনকে নমনীয় না করতে পারাটা বেশিই ব্যর্থতার।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
