বাংলার মাটি ও মানুষের চিরন্তন সত্তায় মাছ এক অবিচ্ছেদ্য উপাদান। এ ভূখণ্ডের নদী, খাল, পুকুর কিংবা হাওর-বাঁওড়ে মাছের ছটফটানিতে যেমন গ্রামবাংলার জীবনচিত্র ধরা দেয়, তেমনি প্রতিটি ঘরে হাঁড়িতে মাছের ঝোলের সুগন্ধ বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিকে প্রাণ দেয়। তাই যুগে যুগে বলা হয়েছে, ‘মাছে-ভাতে বাঙালি।’ মাছ এখানে কেবল খাদ্য নয়, এটি জীবিকা, অর্থনীতি, পুষ্টি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। বাংলার লোকগীতি, প্রবাদ-প্রবচন কিংবা ছড়ায় মাছের উপস্থিতি এ সম্পর্ককে করেছে চিরন্তন। কিন্তু সময়ের স্রোতে নানা চ্যালেঞ্জ ও পরিবর্তনের ভেতর দিয়েও মাছ আজও বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজজীবনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে, দেশীয় মাছের গুরুত্ব আজ আরও বেড়েছে, কারণ এর টানেই গ্রামীণ অর্থনীতিতে নবজাগরণের দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের মৎস্য খাত দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ খাত ধারাবাহিক উন্নতির পথে এগিয়ে আজ বিশ্ব দরবারে প্রশংসা কুড়িয়েছে। ১৯৭১ সালে যেখানে চাষের মাছের উৎপাদন ছিল মাত্র ৬৮ হাজার মেট্রিক টন, সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে ৫০.১৮ লাখ মেট্রিক টনে। বর্তমানে প্রাণিজ আমিষের শতকরা ৬২.৭ ভাগ আসে মাছ থেকে, যা মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য চাহিদা পূরণে অপরিসীম অবদান রাখছে। মৎস্য খাত দেশের জিডিপিতে ২.৫৩ শতাংশ অবদান রাখছে এবং কৃষি খাতে এককভাবে এর অংশীদারত্ব ২২.২৬ শতাংশ। এ খাত ঘিরেই দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ জীবিকা নির্বাহ হয়।
বাংলাদেশ এখন মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাত্র এক বছরে ৭৭ হাজার মেট্রিক টন মাছ ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে অর্জিত হয়েছে ৪,৫৩১.৮৬ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা, যা মোট জাতীয় রপ্তানি আয়ের প্রায় ০.৯১ শতাংশ। বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির প্রাণভোমরা এই খাত একদিকে যেমন দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে রপ্তানি আয় বাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করছে। দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ও বৈচিত্র্য বাংলাদেশকে করেছে অনন্য। দেশে বর্তমানে মোট ২৬১ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ রয়েছে। নির্বিচারে মাছ ধরা, প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা মাছ নিধন, কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি ব্যবহারের ফলে বহু প্রজাতির দেশি মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, কৃষিজমিতে অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার, জলাশয় ভরাট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশীয় মাছের আবাসস্থল দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় বহু স্থায়ী পুকুর মৌসুমি পুকুরে রূপান্তরিত হচ্ছে। ফলস্বরূপ, দেশীয় মাছ উৎপাদনে এক বিরূপ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে।
তবু আশার কথা হলো, বাংলাদেশের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের অব্যাহত প্রচেষ্টায় প্রায় ৪০ প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে লাইভ জিন ব্যাংক, যেখানে দেশীয় মাছের পোনা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। যেসব অঞ্চলে মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে, সেসব অঞ্চলে এ জিন ব্যাংক থেকে পোনা সরবরাহ করে নতুনভাবে মাছের বিস্তার ঘটানো হচ্ছে। কথায় আছে, ‘মাছের পোনা, দেশের সোনা।’ দেশীয় মাছ বাংলাদেশের পুষ্টি ও অর্থনীতির এক অমূল্য সম্পদ। মাছের অভয়াশ্রমের ধারণা এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। অভয়াশ্রম বলতে বোঝানো হয় এমন একটি নির্দিষ্ট জলাশয় বা নদীখণ্ড, যেখানে মাছ শিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। এ অঞ্চলগুলোতে মা মাছ নিরাপদে অবস্থান করতে পারে, প্রজনন করতে পারে এবং ছোট মাছ বা পোনা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে। সাধারণত বর্ষাকাল কিংবা প্রজনন মৌসুমে নদীর কোনো অংশ বা হাওরের নির্দিষ্ট খণ্ডকে অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ ব্যবস্থাপনা মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন চক্রকে সুরক্ষা দেয়, বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি টিকিয়ে রাখে এবং জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৫০৮টি মৎস্য অভয়াশ্রম এবং ৬টি ইলিশ অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হয়েছে। এসব অভয়াশ্রমে মা মাছ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারে, ফলে প্রাকৃতিকভাবে মাছের সংখ্যা বাড়ে। শুধু তাই নয়, অভয়াশ্রমের আশপাশের এলাকায় মাছের বিস্তার ঘটে, যা স্থানীয় জেলেদের আয়ের উৎস বাড়ায়। সরকার প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে, জেলেদের বিকল্প জীবিকা প্রদান করে এবং গণসচেতনতা কর্মসূচি চালায়। ফলে একদিকে যেমন মাছের প্রজনন চক্র সুরক্ষিত হয়, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদেরও খাদ্য ও আয়ের নিশ্চয়তা বজায় থাকে। দেশীয় মাছের প্রাচুর্য রক্ষায় সরকার ইতিমধ্যেই বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মৎস্য সংরক্ষণ আইন ১৯৫০ এবং এর সংশোধিত সংস্কার অনুযায়ী অবৈধ জাল ব্যবহার, ডিমওয়ালা মাছ ধরা এবং পোনা নিধনকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যাতে মা মাছ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারে এবং প্রজাতির স্বাভাবিক বংশবিস্তার বজায় থাকে। উদাহরণস্বরূপ, জাতীয় মাছ ইলিশ সংরক্ষণের জন্য প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে ধারাবাহিকভাবে ২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের আর্থিক কষ্ট লাঘবের উদ্দেশ্যে পরিবারপ্রতি ৩০ কেজি চাল সরবরাহ করা হয়, যা খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শুধু চাল নয়, অনেক ক্ষেত্রে জরুরি প্রণোদনা হিসেবে নগদ অর্থও দেওয়া হয়, যাতে তারা বিকল্প জীবিকার খরচ চালাতে পারে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) ২০২২ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে এবং বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে রয়েছে পঞ্চম স্থানে। একই সঙ্গে, বাংলাদেশ তেলাপিয়া উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ এবং এশিয়ায় তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদক দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা চিংড়ি উৎপাদন ও রপ্তানিতেও আমাদের অবস্থান বৈশ্বিকভাবে প্রশংসনীয়; বিশেষত ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান বাংলাদেশের চিংড়ির প্রধান বাজার। বিশ্বের ১১টি ইলিশ উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এক নম্বরে রয়েছে, যা জাতীয় মাছ হিসেবে ইলিশের মর্যাদাকে আরও সুসংহত করেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৫.২৯ লাখ মেট্রিক টন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট মাছ উৎপাদনের মধ্যে ইলিশ এককভাবে প্রায় ১২ শতাংশ জোগান দেয় এবং মাছভিত্তিক প্রোটিন গ্রহণে ইলিশের অবদান অনন্য। এসব অর্জনই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মৎস্য খাত শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করছে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে।
একদিকে দেশীয় প্রজাতির মাছ গ্রামীণ পুষ্টি ও অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে, অন্যদিকে সামুদ্রিক মাছ উৎপাদন বৈদেশিক বাণিজ্য ও বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এসব অর্জন প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মৎস্য খাত শুধু অভ্যন্তরীণ খাদ্য চাহিদা পূরণ করছে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করছে এবং টেকসই উন্নয়নে অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে। মৎস্য খাতের এ অগ্রযাত্রা কেবল জাতীয় অর্থনীতিতে নয়, গ্রামীণ জীবনে নবজাগরণের পথ খুলে দিয়েছে। মাছ চাষ এখন গ্রামে উদ্যোক্তা সৃষ্টির এক নতুন দিগন্ত। ধানক্ষেতে ছোট প্রজাতির মাছ চাষ, মিনি পুকুর তৈরি, বদ্ধ জলাশয়ে মিশ্র মাছ চাষ এসব উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। কৃষি ও মৎস্য একত্রে চাষ করার ফলে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার হচ্ছে, কৃষকের আয় বাড়ছে এবং গ্রামবাংলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চারিত হচ্ছে। বাংলার নদী, হাওর-বাঁওড়, খাল-বিল আর পুকুরে দেশীয় মাছের টানই গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি। একদিকে যেমন পুষ্টি ও প্রোটিনের চাহিদা পূরণ হয়, অন্যদিকে বাড়ে আয়, কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ জীবনের সমৃদ্ধি। তাই দেশীয় মাছের সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধি শুধু একটি অর্থনৈতিক উদ্যোগ নয়, এটি গ্রামীণ সংস্কৃতি ও জীবনের পুনর্জাগরণের অঙ্গীকার। বাংলার নদী, হাওর-বাঁওড়, খাল-বিল আর পুকুরে দেশীয় মাছের টানই আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি। এই অমূল্য সম্পদ রক্ষায় যদি বাংলাদেশ আজ অভয়াশ্রম স্থাপন করে, মাছের প্রজনন মৌসুমে সুরক্ষা প্রদান করে, জলাশয় সংরক্ষণে কঠোর উদ্যোগ নেয় এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে দেশীয় মাছ চাষ আরও সম্প্রসারিত করে, তবে আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে পুষ্টি, প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দেশের মৎস্য সম্পদের সম্প্রসারণ, সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং টেকসই ব্যবহারে জনসচেতনতা সৃষ্টিই এখন মূল বিষয়।
লেখক: কৃষিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন
