প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা করেছেন। নির্বাচন কমিশনও নড়েচড়ে বসেছে। নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংস্কারসহ নানা পদক্ষেপ এখন দৃশ্যমান। কিন্তু তারপরও নানা ষড়যন্ত্র ডানা মেলে বসেছে। এরই মধ্যে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম যোদ্ধা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সম্প্রতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন ‘নির্বাচন হবে না’। তার এই বক্তব্যের পর, জনমনে নানা প্রশ্ন ও অন্য ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে, মানুষ রাস্তায় নেমেছে বেশ কয়েকবার অধিকার আদায়ের জন্য। কখনো ভাষার দাবিতে, কখনো স্বৈরশাসনের পতনের জন্য। আবার কখনো ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে। সেই ধারাবাহিকতায় জুলাই আন্দোলন এক নতুন ইতিহাস রচনা করেছে। স্বৈরাচার, জুলুম, নির্যাতন, বৈষম্য, গুম-খুন, রাষ্ট্রীয় দমননীতি এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিকে কেন্দ্র করে যে গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল, সেটিই আজ নতুন প্রজন্মকে পথ দেখাচ্ছে। ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এ আন্দোলন স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের পতন ঘটিয়েছে, কিন্তু সেই পতনের পরও বাংলাদেশের রাজনীতির সংকট পুরোপুরি শেষ হয়নি।
জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন, যেখানে জনগণ স্বাধীনভাবে তাদের জনপ্রতিনিধি বেছে নেবে। আন্দোলনের সময় বারবার উচ্চারিত হয়েছে সেই দাবি ‘আমরা ভোটাধিকার চাই, বৈষম্যমুক্ত সমাজ চাই, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চাই।’ আন্দোলনের পর যখন হাসিনা সরকারের পতন ঘটে, তখন সারা দেশের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। মনে হয়েছিল এবার আর কোনো কৌশল, জালিয়াতি, ভয়ভীতি, প্রশাসনিক প্রভাব বা রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে মানুষের ভোট কেড়ে নেওয়া যাবে না। দুঃখজনক হচ্ছে, রাজনীতির আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই ইতিহাস জুড়ে বিতর্ক। অতীতের দু-একটি নির্বাচন ছাড়া, কার্যত প্রতিটি নির্বাচনের সঙ্গেই জালিয়াতি, কারচুপি, সন্ত্রাস, প্রশাসনিক প্রভাব এবং ক্ষমতাসীনদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ জড়িয়ে আছে। বিশেষ করে, বিগত দশকগুলোতে ‘নির্বাচন’ শব্দই যেন মানুষের কাছে হাস্যকর হয়ে উঠেছে। মানুষ ভোট দিতে যায় না। কারণ তারা জানে, তাদের ভোটের কোনো মূল্য নেই। ব্যালটবাক্স আগেই পূর্ণ হয়ে যায়, কেন্দ্র দখল হয়। আবার নিশিরাতেই ভোট করে ফেলে প্রশাসন। জুলাই আন্দোলনের উত্থান আসলে এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার বিস্ফোরণ। আন্দোলনের স্লোগানগুলোর মধ্যে স্পষ্ট ছিল গণতন্ত্র ফেরত ও ভোটাধিকারের দাবি।
কেন যেন মনে হয়, বিগত সরকারের পতন ঘটলেও প্রশাসন, আমলাতন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা গুরুপূর্ণ জায়গায় পুরনো অপশক্তি রয়ে গেছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের আনুগত্যে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি প্রকৃতপক্ষে নিরপেক্ষ না হয়, তবে নির্বাচনের নামে আবারও প্রহসন হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। অন্যদিকে, রাজনৈতিক দলগুলো এখনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। একে অপরের বিরুদ্ধে লেগে আছে। অথচ জুলাই আন্দোলনের সময় সব পক্ষই একসঙ্গে ছিল, কারণ তাদের লক্ষ্য ছিল হাসিনা সরকারের পতন। কিন্তু পতনের পরপরই শুরু হয় নানা বিষয়ে বিভাজন। কে কৃতিত্ব নেবে আর কে কীভাবে ক্ষমতা পোক্ত করবে। এসব বিষয় আন্দোলনের সংহতি ভেঙে দিচ্ছে। আর এই ভাঙনই নির্বাচনের পথে প্রধান অন্তরায় হতে পারে। মানুষ তবু অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, কবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে? তারা মনে করছেন আগামী নির্বাচনেই হবে একটি নতুন সূচনা, যেখানে তারা নিজের হাতে সরকার বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। বাস্তবতা হলো, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সুশীল সমাজের অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন। এগুলোর একটি না থাকলেই নির্বাচন পরিণত হয় প্রহসনে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, এই সবগুলো শর্তই দুর্বল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাংশ বলছে, ‘যদি নির্বাচন না-ই হয়, তবে জুলাই আন্দোলনের অর্জন কী?’ আরেকাংশ বলছে, ‘আমরা যদি এখনই আস্থা হারাই, তবে তো সেই স্বৈরাচারী শক্তিই জয়ী হবে।’ এখানে একটি দার্শনিক প্রশ্নও সামনে আসে। নির্বাচন কি কেবল প্রক্রিয়া, নাকি একটি চেতনা? যদি নির্বাচন আয়োজন হয়, কিন্তু তা অবাধ ও সুষ্ঠু না হয়, তবে কি সেটি গণতন্ত্র? নাকি নির্বাচন না হলেও জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মাধ্যমে গণতন্ত্র বেঁচে থাকে? জুলাই আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে, গণতন্ত্র কেবল ব্যালটবাক্সে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় নিহিত। নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র কল্পনা করা কঠিন। মানুষ তাদের সরকার নিজের হাতে বেছে নিতে চায়। তাই একটি সত্যিকার অর্থে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা এখন সময়ের দাবি। সুতরাং, এখন আমাদের দায়িত্ব তিনটি ক্ষেত্রে মনোযোগ দেওয়া। প্রথমত: নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে। দ্বিতীয়ত: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা নির্বাচন বয়কট বা সহিংসতা না করে। তৃতীয়ত : নাগরিক সমাজকে সক্রিয় হতে হবে, যেন মানুষের আস্থা টিকে থাকে। জুলাই আন্দোলনের অর্জন ছিল, মানুষের মধ্যে নতুন আশা জাগানো। যদি সেই আশা এখন ভেঙে যায়, তবে আন্দোলনের সব ত্যাগ বৃথা হবে। নির্বাচন অবশ্যই হতে হবে। কারণ জনগণই সর্বশক্তির অধিকারী, তারাই চূড়ান্ত বিচারক। সময় এসেছে আরও জোর দিয়ে বলার নির্বাচন হতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
