অভিযোগ, সমালোচনা বা তিরস্কার নয়, নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে উপদেষ্টাদের অসহায়ত্বের কথা বলেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম। কথাটি ছিল একদম সাদামাটা, পরিষ্কার এবং নির্মোহ মুডে। তার বক্তব্যটি ছিল এমন : দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আপনি সেক্রেটারিয়েটে গেলে, ওই যে আমলারা বসে আছেন, তারাই সবকিছু নির্ধারণ করেন। আমাদের উপদেষ্টা যারা দায়িত্ব পালন করছেন, এখন অনেক ক্ষেত্রেই তারা অসহায়। তারপরও আশা করি, তারা (উপদেষ্টারা) এতদিন যে চেষ্টা করেছেন সে চেষ্টাটা নিয়ে, সংস্কার কমিশনগুলোতে যারা আছেন, সবাই মিলে একটা শুরু করতে পারি। যার মাধ্যমে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের দিকে আমরা এগিয়ে যেতে পারব।’ গোলমাল দেখা দিয়েছে, বক্তব্যটি প্রচার ও ব্যাখ্যায়। কোনো কোনো গণমাধ্যমে তার বক্তব্যটির প্রচারে কিঞ্চিত হেরফেরের কারণে, কেউ কেউ ভিন্ন নেরেটিভ তৈরির সুযোগ নিচ্ছেন। কারও কারও জানা নাও থাকতে পারে, মির্জা ফখরুলের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ঘটনাচক্রে বেশ কিছুদিন ছিলেন আমলাও। গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অনেক কাজ করতে হয়েছে তাকে। ১৯৭২ সালে বিসিএস করে শিক্ষা ক্যাডারে ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতায় যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। অন্যান্য সরকারি দায়িত্বের মধ্যে মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও আয়-ব্যয় পরীক্ষণ অধিদপ্তরে একজন নিরীক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তখনকার উপ-প্রধানমন্ত্রী পানি বিশেষজ্ঞ এস. এ. বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান। নদী ও পানিসম্পদ বিষয়ে তখন তাকে আমলাতান্ত্রিক অনেক কাজ করতে হয়। ১৯৮২ সাল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর এসএ বারী পদত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। বারীর পদত্যাগের পর মির্জা ফখরুল শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান।
পারিবারিকভাবে মির্জা ফখরুল রাজনীতির পাশাপাশি আমলাতন্ত্র দেখেছেন গভীরভাবে। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন আইনজীবী। ঠাকুরগাঁওয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ও পরে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীন বাংলাদেশে মির্জা রুহুল আমিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। মির্জা ফখরুলের চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন একজন বিএনপি নেতা, সাবেক মন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের ৪র্থ স্পিকার। মির্জা হাফিজ ১৯৭৮ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে ভূমিমন্ত্রী, ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে স্পিকার এবং ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মির্জা ফখরুলের আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা একাত্তরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার, মুজিবনগর সরকারের নিযুক্ত ডাইরেক্টোরেট অব ইয়ুথ ক্যাম্পের পরিচালক ছিলেন। গোপনে আড়ালে-আবডালে নয়, আমলাতান্ত্রিকতার অভিজ্ঞতার আলোকে প্রকাশ্য একটি অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুল সেদিন বলেছিলেন কথাগুলো। ব্যাখ্যা ও উপমা দিয়েছেন। কেবল বর্তমান নয়, আগামীতে যারা ক্ষমতায় আসবেন তাদেরও কোনো না কোনোভাবে আমলাদের খপ্পরে পড়তে হবে, সেই বার্তা ছিল তার বক্তব্যে। মন্ত্রণালয় চালানোর মতো প্রশাসনিক মারপ্যাঁচ যে রাজনীতিবিদের নেই বা থাকে না, সেই দুর্বলতার সুযোগ আমলারা নেন; তা কে না জানে? যিনি এ খপ্পরে পড়েন তিনিও জানেন। এ বাস্তবতাতেই মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি ‘আপনি সচিবালয়ে যাবেন, সেখানে যারা বসে আছেন, আমলারা, তারাই সব কিছু নির্ধারণ করেন। উপদেষ্টারা অনেক ক্ষেত্রেই অসহায় হয়ে পড়েন।’
তার এসব কথার মধ্যে কোনো ভেজাল আছে? সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টাও মাঝেমধ্যে আমলা-যন্ত্রণার কথা বলেছেন। গোটা সরকারও তাদের দায়িত্ব পালনে পরাজিত শক্তির ইন্ধনে দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধকতার কথা বলেছে। প্রয়োজনে জনসমক্ষে সব উত্থাপন করে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও বলেছে। বিবৃতি পর্যন্ত দিয়েছে গেল মে মাসের ২৪-২৫ তারিখের দিকে। উপদেষ্টা পরিষদের অনির্ধারিত বৈঠক শেষে দেওয়া সেই বিবৃতিটি এখানে তুলে ধরা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিটির অংশবিশেষ: ‘...বৈঠকে অন্তর্র্বর্তী সরকারের ওপর অর্পিত তিনটি প্রধান দায়িত্ব (নির্বাচন, সংস্কার ও বিচার) বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ... এসব দায়িত্ব পালনে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের অযৌক্তিক দাবি-দাওয়া, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও এখতিয়ার-বহির্ভূত বক্তব্য এবং কর্মসূচি দিয়ে যেভাবে স্বাভাবিক কাজের পরিবেশ বাধাগ্রস্ত করে তোলা হচ্ছে এবং জনমনে সংশয় ও সন্দেহ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় বৈঠকে। দেশকে স্থিতিশীল রাখতে, নির্বাচন, বিচার ও সংস্কারকাজ এগিয়ে নিতে এবং চিরতরে এ দেশে স্বৈরাচারের আগমন প্রতিহত করতে বৃহত্তর ঐক্য প্রয়োজন বলে মনে করে উপদেষ্টা পরিষদ। এ বিষয়ে অন্তর্র্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য শুনবে এবং সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করবে।... শত বাধার মধ্যেও গোষ্ঠীস্বার্থকে উপেক্ষা করে অন্তর্র্বর্তী সরকার তার ওপর দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। যদি পরাজিত শক্তির ইন্ধনে এবং বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সরকারের ওপর আরোপিত দায়িত্ব পালনকে অসম্ভব করে তোলা হয়, তবে সরকার সব কারণ জনসমক্ষে উত্থাপন করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।’ ঘটনা ও পরিস্থিতি কোথায় গড়ালে সরকারকে ওই বিবৃতিটি দিতে হয়েছে, রাজনীতি-আমলাতন্ত্র সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান থাকা মানুষেরই তা বোধগম্য। মির্জা ফখরুলের বক্তব্যে এরই প্রতিফলন ঘটেছে। উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা শেষ হয়ে গেছে। এগুলোকে আবার নতুন করে গড়ে তোলার জন্য মানুষগুলো তো তৈরি করতে হবে।... নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আপনি সেক্রেটারিয়েটে গেলে, ওই যে আমলারা বসে আছেন, তারাই সবকিছু নির্ধারণ করেন।
আমাদের উপদেষ্টা যারা দায়িত্ব পালন করছেন, এখন অনেক ক্ষেত্রেই তারা অসহায়। ... গ্রামের একজন স্কুলশিক্ষকের সমস্যার সমাধান করতে হলে তাকে ঢাকায় আসতে হয়। কেন? যেটার প্রয়োজন নেই সেটা জেলাতেই যথেষ্ট। কিন্তু ওই যে সিস্টেম। ওই সিস্টেমে যদি সেন্ট্রালে না আসে তাহলে ঘুষটা আসবে কোত্থেকে। এটাই বাস্তবতা, শুনতে খারাপ লাগবে বাট দ্যাট দ্য ট্রুথ। ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষক, স্কুলের শিক্ষক, নার্সদের নিয়োগ হয় ঘুষ দিয়ে। তাহলে যেই ব্যবস্থাতে অনিয়ম, যে ধরনের বৈষম্য চলতে থাকে সেখানে রাতারাতি কিছু করে ফেলতে পারবে না, এটা খুব ডিফিকাল্ট। আমাদের কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে যেতে এমন সিস্টেমের মধ্যে যেতে হবে যাতে, আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা অন্তত মিনিমাম যে ন্যায়বিচার তা নিশ্চিত করবেন জনগণের।... আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, আমাকে আগে কাঠামোটাকে বদলাতে হবে এবং সেই কাঠামোতে এই বিষয়গুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করতে হবে। কে না জানে, বিগত সরকারের আমলে সরকারি দুর্বৃত্তায়নে ডিসি-ইউএনও ও জেলা-উপজেলার পুলিশ কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন। তারপরও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডিসি-ইউএনওদের বিভেদের রেখাটা ছিল স্পষ্ট। ডিসি-ইউএনওদের সম্পর্কে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন, ‘প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা যা-ই বলুন, মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকৌশলীরা ইউএনও-ডিসিদের বাড়াবাড়িতে অতিষ্ঠ। একদিকে জনগণের ওপর, রাজনীতিকদের ওপর ছড়ি ঘোরানো, তার ওপর আমলাদের নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগির বাড়াবাড়ি। এত বিরক্তি-অনাস্থা-অবিশ্বাস-অশ্রদ্ধা নিয়ে তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় প্রশাসন সচিবালয় পর্যন্ত কাজে গতি আসবে কীভাবে? অন্তর্র্বর্তী নামের সাময়িক সরকারের সেখানে অসহায় হওয়াই স্বাভাবিক। সরকার বিবৃতি দিয়ে গোছগাছ করে যা বলেছে, আর মির্জা ফখরুল একটি আলোচনা সভায় নিজের মতো করে তাৎক্ষণিক যা বলেছেন, এর অন্তর্নিহিত অর্থ একই। বর্তমান পরিস্থিতিতে জনবান্ধব প্রশাসন গড়ার কথা ও তাগিদ যথার্থ। কারণ সুযোগ সব সময় আসে না। চব্বিশের আগস্ট সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। আমলাদের লাগাম টেনে ধরার বদলে বিগত সরকারের আমলে সুবিধা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আর্থিক সুবিধা, ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার সুবিধা, ড্রাইভার কিংবা কুকের সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে এই সুবিধা প্রদান এক ধরনের কৃতজ্ঞতার প্রকাশমাত্র। কারণ, এসব আমলা বিনাভোটে কিংবা নিশিভোটে ওই সময়ের আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন।
ব্রিটিশরা দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছে ১৯৪৭ সালে, কিন্তু ব্রিটিশ পদ্ধতির আমলারা এখনো শোষণ-অপরাধ যন্ত্রকে সুরক্ষা দেওয়ার কাজ করেই চলেছেন। রাজনৈতিকভাবে যারাই দেশ পরিচালনা করতে এসেছেন, তারাই ব্রিটিশ পদ্ধতির আমলাতন্ত্রের দীর্ঘায়ু দিয়েছেন। শাসকরা স্বৈরাচার-ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠলে তাদের নিরাপত্তাবলয় দেন আমলারাই। জনপ্রশাসনিক ‘টিম বিল্ডিং’-এ মাঝেমধ্যে সরকারকে করে তুলছেন অসহায়। তাদের সেই ইহলৌকিক হিম্মতে পুরোটা লাগাম দিতে পারেনি, অন্তর্র্বর্তী সরকারও। বরং তারাই সরকারকে কাবু করছে। সেই বার্তাটাই দিলেন মাঠের রাজনীতিক বিএনপি মহাসচিব এক সময়ের শিক্ষক-আমলা মির্জা ফখরুল।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
