জুলাই-আগস্টে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আরও পাঁচজনের সাক্ষ্য গ্রহণ হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সাক্ষ্য গ্রহণের নবম কার্যদিবসে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনালে এ সাক্ষ্য গ্রহণ হয়। জবানবন্দিতে ২৭তম সাক্ষী ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. মোস্তাক আহমেদ বলেন, ‘আন্দোলনে যারা গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, কোনো কোনো রোগীর মাথায় গুলি লেগে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়। তখন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) কিছু চিকিৎসক ও ছাত্রলীগের কর্মীরা গুলিবিদ্ধ আহত রোগীদের চিকিৎসায় বাধা সৃষ্টি করেন।’
এদিন তিনি ছাড়াও আরও সাক্ষ্য দেন রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ও জব্দ তালিকার সাক্ষী ডা. মফিজুর রহমান, ঢামেক হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার (সার্জারি বিভাগ) ও জব্দ তালিকার সাক্ষী ঢামেক হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার মো. মনিরুল ইসলাম, গত বছরের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুলে গুলিতে নিহত শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের নানা সাইদুর রহমান খান এবং আন্দোলনের সময় ফেনীতে গুলিতে আহত নাসির উদ্দিন। এ নিয়ে শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে ২৯ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হলো। আজ বুধবার একই মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণ হবে।
সাক্ষী মোস্তাক আহমেদ জবানবন্দিতে বলেন, জুলাই-আগস্টে আন্দোলনের সময় তিনি ঢামেকের ক্যাজুয়ালটি বিভাগে মেডিকেল অফিসার (ডিসেম্বরে আবাসিক সার্জন) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত বছরের ১৯, ২০ ও ২১ জুলাই এবং ৪ ও ৫ আগস্ট ঢামেক হাসপাতালের এই বিভাগে গুলিতে আহত বেশিসংখ্যক রোগী আসতে থাকে। সাক্ষী বলেন, ‘আমি এর আগে আগেও গুলিবিদ্ধ রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছি। এই আন্দোলনের আগে অন্যান্য রোগীর ক্ষেত্রে দেখেছি সামনে বা পেছনে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। সাধারণত গুলির ডিরেকশন থাকে নিচ থেকে ওপরের দিকে বা সমান্তরালভাবে। কিন্তু এই রোগীদের (জুলাই অভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ) বেশিরভাগ গুলির ডিরেকশন ছিল ওপর থেকে নিচের দিকে।’
ডা. মোস্তাক বলেন, ‘রোগীরা আমাদের জানিয়েছেন, তাদের (আন্দোলনকারী) কোনো উঁচু জায়গা অথবা হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হয়েছে। কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে মাথায় গুলি লেগে তা পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়।’
আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ বাবা ও ছেলের একটি ঘটনার বিষয় উল্লেখ করে মোস্তাক আহমেদ বলেন, ‘রোগীদের মধ্যে আমি এমন একটি ঘটনার সাক্ষী, যেখানে বাবা ও ছেলে দুজন গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন। বাবা-মারা যান। ছেলে আক্ষেপ করে বলেন, “বাবাকে বাঁচাতে পারলাম না”।’
জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, গুলিবিদ্ধ রোগীদের বেশিরভাগের বয়স ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। চিকিৎসা দেওয়ার সময় ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে খোঁজখবর নিত। আহত ব্যক্তিদের পরিচয় জানতে চায় তারা। ছাত্রদের পরিচয় পেলে চিকিৎসায় বাধা দিত। গুলিবিদ্ধ রোগীরা তখন ভয়ে তাদের (চিকিৎসকদের) অনুরোধ করেন তাদের পরিচয় যেন গোপন রাখা হয়। তিনি বলেন, ঢামেক হাসপাতালের কিছু চিকিৎসক যারা স্বাচিপের, তারা আহতদের চিকিৎসার ব্যাপারে অতি উৎসাহী না হতে বারণ করে এবং গত বছরের ২৫ জুলাই চারজন চিকিৎসককে অন্যত্র বদলি করা হয়। তারা বলেছিলেন, ‘এরা (আন্দোলনকারী) সন্ত্রাসী, এদের চিকিৎসা দেওয়া যাবে না।’
জবানবন্দি শেষে সাক্ষীদের জেরা করেন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। এ সময় প্রসিকিউশনপক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম, গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম প্রমুখ। কারাগারে থাকা এ মামলার আসামি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে গতকাল ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তিনি এ মামলায় রাজসাক্ষী। গত ৩ আগস্ট এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়।
