বিশৃঙ্খলায় জড়ানো মুমিনের কাজ নয়

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৫, ০৬:৩৯ এএম

মানবসমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা প্রতিটি সভ্য জাতির অন্যতম লক্ষ্য। বিশেষ করে মুসলমান সমাজের জন্য এটি একটি মৌলিক দায়িত্ব। কারণ ইসলাম শান্তির ধর্ম, যার মূল বার্তাই হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্য এবং মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা। ইসলাম কখনো বিশৃঙ্খলা, হানাহানি ও ধ্বংসাত্মক কাজে সমর্থন দেয়নি। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘ফেতনা-ফ্যাসাদ হত্যার চেয়েও গুরুতর।’ (সুরা বাকারা ১৯১) এ আয়াত প্রমাণ করে, অশান্তি সৃষ্টি করা বা শৃঙ্খলা ভাঙা কত বড় গুনাহের কাজ। মুমিন মানেই শান্তির দূত, মানবতার কল্যাণকামী। তাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা মুমিনের কাজ হতে পারে না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নানা কারণে সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এর মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা অন্যতম। নির্বাচনের সময় অনেক জায়গায় দেখা যায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মিছিল-মহড়া, এমনকি সংঘর্ষ ও প্রাণহানি পর্যন্ত ঘটে। অথচ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোট ও নির্বাচন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হওয়াই কাম্য। কিন্তু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু মানুষের জানমালের ক্ষতিই করে না, বরং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করে, অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। ইসলাম এ ধরনের অন্যায়কে কঠোরভাবে নিন্দা করেছে। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার হাত ও মুখ থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (সহিহ মুসলিম) রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে মানুষ আহত বা নিহত হওয়া এ বাণীর সরাসরি অমান্য।

আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো শ্রমবাজার বা গার্মেন্টস সেক্টরে বিশৃঙ্খলা। মজুরি-বেতন, কর্মপরিবেশ বা শ্রমিকের ন্যায্য অধিকারকে কেন্দ্র করে কখনো কখনো অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ন্যায্য অধিকার আদায়ে আন্দোলন অবশ্যই বৈধ, তবে ভাঙচুর, লুটপাট বা উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত করা ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলামে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে, তবে সেই প্রতিবাদ হতে হবে শান্তিপূর্ণ, গঠনমূলক ও আল্লাহভীতির সঙ্গে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি রহম করে না, আল্লাহও তার প্রতি রহম করবেন না।’ (সহিহ মুসলিম) অর্থাৎ শ্রমিকের প্রতি অবিচার করা যেমন অন্যায়, তেমনি আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাও মারাত্মক অপরাধ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও অনেক সময় বিশৃঙ্খলার শিকার হয়। ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতি, প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা কিংবা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সংঘর্ষ, এসব ঘটনার কারণে শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য মানুষকে জ্ঞানী, নৈতিক ও সমাজের কল্যাণকামী নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। অথচ ক্যাম্পাসের সহিংসতা এ উদ্দেশ্যকে বাধাগ্রস্ত করে। ইসলাম শিক্ষা গ্রহণকে ফরজ করেছে। আর সেই শিক্ষা যদি বিশৃঙ্খলা ও হানাহানির কারণে বাধাগ্রস্ত হয়, তবে তা সমাজের জন্য বড় ক্ষতি। মুমিন কখনোই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা জ্ঞানার্জনের পথে অরাজকতা সৃষ্টি করতে পারে না। এ ছাড়া সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষেত্রেও নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। যেমন জমি-জমার বিরোধ, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব, পারিবারিক বিবাদ ইত্যাদি কারণে অনেক সময় মারামারি, খুনখারাবি পর্যন্ত ঘটে। অথচ ইসলাম এসব বিষয়ে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা দিয়েছে। কোরআনে উত্তরাধিকার আইন স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। জমি বা সম্পত্তির বণ্টন নিয়ে যদি সবাই কোরআনের নিয়ম মেনে চলে, তবে এসব বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে না। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভক্ষণ করো না।’ (সুরা বাকারা ১৮৮)

বাংলাদেশে আরেকটি বড় সমস্যা হলো, সড়ক পরিবহনে বিশৃঙ্খলা। পরিবহন ধর্মঘট, চালক-শ্রমিকদের অনিয়ম, যাত্রীদের হয়রানি, দুর্ঘটনার পর বিক্ষোভ ও ভাঙচুর, এসবও বিশৃঙ্খলার একটি রূপ। অথচ রাস্তাঘাট মানুষের যাতায়াত ও জীবনযাপনের একটি মৌলিক অধিকার। রাস্তা অবরোধ করে সাধারণ মানুষের কষ্ট দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে অন্যায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘রাস্তা থেকে কষ্টকর বস্তু অপসারণ করা সদকা।’ (সহিহ মুসলিম) অর্থাৎ যেখানে রাস্তা থেকে কষ্টকর বস্তু দূর করা নেকির কাজ, সেখানে কষ্ট সৃষ্টি করা কত বড় গুনাহ তা সহজেই অনুমান করা যায়। ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা জনসমাবেশেও অনেক সময় শৃঙ্খলার অভাব দেখা যায়। অতিরিক্ত শব্দদূষণ, অনিয়ন্ত্রিত আচরণ, উসকানিমূলক বক্তব্য ইত্যাদি কারণেও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। অথচ ইসলাম পরিমিতি, শৃঙ্খলা ও সৌজন্যের শিক্ষা দেয়। তাই ধর্মীয় সমাবেশে শৃঙ্খলার অভাব ইসলামবিরোধী। সুতরাং এ বিষয়ে সচেতনতা কাম্য। এসব ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষেরও সচেতন হওয়া জরুরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে, যেন কোনো অরাজকতা বড় আকার ধারণ না করে। তাদের দায়িত্ব শুধু কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, বরং আগেই সতর্ক থেকে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। অপরদিকে সাধারণ মানুষের দায়িত্ব হলো নিজেদের মধ্যে ধৈর্য, সহনশীলতা ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা। সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একা সফল হতে পারে না, সাধারণ জনগণের সহযোগিতাও অপরিহার্য। বিশৃঙ্খলার প্রতিকার হিসেবে প্রথমেই দরকার সচেতনতা। মানুষকে বোঝাতে হবে, বিশৃঙ্খলা কারও মঙ্গল বয়ে আনে না, বরং সবার ক্ষতি করে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা সৎকাজে সহযোগিতা করো, পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা মায়েদা ২) এ ছাড়া ধর্মীয় অনুশাসনের প্রচার বাড়াতে হবে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ও শান্তির শিক্ষা দিতে হবে। ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের উচিত, তাদের বক্তব্যে বিভেদ নয়, বরং ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা প্রচার করা। পরিবার থেকেও সন্তানদের ছোটবেলা থেকে শৃঙ্খলাবোধ ও ধৈর্য শেখাতে হবে। আমাদের সমাজে যে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়, তার প্রতিকার নিহিত আছে ইসলামের শিক্ষায়। যদি আমরা সত্যিকার অর্থে ইসলামের আদর্শ মেনে চলতে পারি, তবে সমাজ থেকে বিশৃঙ্খলা দূর হয়ে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত