বিএনপির প্রতিষ্ঠা ও আজকের রাজনীতি

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:৩৫ এএম

১৯৭১ সালে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়েছে। এমনকি স্বাধীনতার ঘোষণাও দিতে পারেনি  রাজনৈতিক নেতৃত্ব। মেজর জিয়া যখন স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন, নিজেকে এবং তার পরিবারকে চরম বিপদের ঝুঁকিতে ফেলে; তখন আওয়ামী নেতৃত্ব আত্মসমর্পণ আর পলায়নে ব্যস্ত। কেউ বিমানে পাকিস্তানের পথে, কেউ মেহেরপুরের গন্তব্যে আর তরুণ নেতৃত্ব বুড়িগঙ্গার ওপারে মোস্তফা মহসিন মন্টুর বাসায় বেতারে মেজর জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা শুনছেন। অন্য দিকে, দেশে নিরস্ত্র মানুষের লাশের স্তূপ জমছে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে। সংগঠিত হয়ে মুক্তিকামী তরুণরা গেরিলা যুদ্ধের চোরাগোপ্তা আক্রমণ নিয়ে মাঠে আসতে আসতে মে-জুন অব্দি গড়িয়েছে। যদিও সেই তরুণদের মধ্যে আওয়ামী বা ছাত্রলীগ-যুবলীগ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা ছিল অপচেষ্টা। তারা তখন জেনারেল উবান-এর ‘ডিম তত্ত্ব’ বাস্তবায়নে নৈনিতাল-দেরাদুনের নাতিশীতোষ্ণ পাহাড়ে মুজিব বাহিনীতে প্রশিক্ষণরত। বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে যুদ্ধ করেছে দেশের সাধারণ ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক। তারপরও সবকিছু ভুলে শুধুমাত্র স্বাধীনতার আকর্ষণে দেশের মানুষের অবিশ্বাস্য ঐক্য সম্ভব করেছে ডিসেম্বরের বিজয়।

ডিসেম্বরে বিজয় মুহূর্তে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ঐক্যকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলো, আওয়ামী নেতৃত্ব। তারা উড়ে এসে স্বাধীনতার একমাত্র দাবিদার হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার সুবর্ণ সুযোগ হারালেন। এমন স্বাধীনতা চাইনি বলে আওয়ামী লীগেরই একাংশ, বিভক্তিতে হলো ‘জাসদ’। অবিসংবাদিত জাতীয় নেতা হওয়ার দুর্লভ  সুযোগ হারালেন শেখ মুজিব। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, আবার রাষ্ট্রপতি পদের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকল তার নাম। মানুষ পাকিস্তানির ফুটন্ত কড়াই থেকে, আওয়ামী লীগের জ্বলন্ত আগুনে পতিত হলো। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ, অভাব, দুর্ভিক্ষ রাস্তায় রাস্তায় লাশের স্তূপ। জনতাকে স্তব্ধ করতে মাঠে নামল ‘রক্ষী বাহিনী’ নামের আতঙ্ক। তাদের একমাত্র লক্ষ্য, সম্ভাবনাময় তারুণ্য নিশ্চিহ্ন করা। অসহিষ্ণু সরকার কোনো প্রতিবাদ সহ্য করতে পারছিল না। ভিয়েতনামে যুদ্ধ অবসানের দাবিতে, ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে গুলিতে নিহত হলো দুজন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির উদ্দেশ্যে জাসদের মিছিল পরিণত হলো লাশের মিছিলে। অরাজকতার কফিনে শেষ পেরেক হয়ে এলো ১৯৭৫-এর জানুয়ারিতে একদলীয় ‘বাকশাল’। নিষিদ্ধ হলো, সব রাজনৈতিক দল।  কণ্ঠরোধ হলো সংবাদপত্রের, বিনা জবাবদিহিতায় সংসদের মেয়াদ বেড়ে গেল পাঁচ বছর।

এলো আগস্ট ১৯৭৫। সপরিবারে নিহত হলেন শেখ মুজিব, ক্ষমতায় এলো তারই বিশ্বস্ত সহযোগী খন্দকার মুশতাক। সংসদের স্পিকার মালেক উকিল, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন ‘দেশ ফেরাউন-মুক্ত হয়েছে’। ইতিহাস আসলেই বড় নির্মম। আগস্ট পরবর্তী সময়ে বিশৃঙ্খল সেনাবাহিনীতে তখন অভ্যুত্থান আর পাল্টা অভ্যুত্থান ছিল নিত্যসঙ্গী। ৭ নভেম্বরে সংঘটিত হলো ঐতিহাসিক সিপাহী জনতার বিপ্লব। রাষ্ট্রের পাদপ্রদীপে আবার এলেন জিয়াউর রহমান জাতির মুক্তির দূত হয়ে। দায়িত্ব পালনের সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই ঘটালেন, অবিশ্বাস্য পরিবর্তন। দুর্ভিক্ষের বাংলাদেশ পরিণত হলো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে, মুক্ত হলো অবরুদ্ধ সংবাদপত্র, অবারিত হলো রাজনৈতিক চর্চা। দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি রাজনৈতিক দলের যারা আদর্শে হবে উদার মধ্যপন্থি, দৃঢ় থাকবে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে, মর্যাদা দেবে ধর্মীয় বিশ্বাসকে, ঐক্যবদ্ধ করবে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের মানুষকে, মর্যাদা দেবে নারীদের, কর্মসংস্থান করবে যুবকদের, সমমর্যাদার সম্পর্ক থাকবে সব রাষ্ট্রের সঙ্গে, অগ্রাধিকার পাবে যোগ্যতা আর দেশপ্রেম, শূন্য সহনশীলতা থাকবে অনিয়ম আর দুর্নীতি প্রশ্নে। জিয়া জনপ্রত্যাশাকে অসম্মান করেননি, গড়েছেন তাদেরই প্রত্যাশার রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’। ১৯৭৮ সালে ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁয় ঐতিহাসিকভাবে আবির্ভূত হলো (গতকাল) বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শে বিশ্বাসী দল হিসেবে। তিনি শুধু বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেননি, একইসঙ্গে শেখ মুজিবের হাতে মৃত আওয়ামী লীগেরও পুনর্জন্ম দিয়েছেন। বিএনপির নেতৃত্বে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, উৎপাদন, সব ক্ষেত্রে এসেছে অপ্রত্যাশিত সাফল্য, প্রবর্তিত হয়েছে স্বাধীনতা-একুশে পদক। নির্মিত হয়েছে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, তবু বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র দাবিদার হয়ে ওঠেনি।  জিয়া শহীদের মর্যাদায় প্রয়াত হয়েছেন, জনগণ তাকে অন্তিম বিদায় জানিয়েছে সর্ববৃহৎ জানাজার মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়া দলের দায়িত্ব নিয়েছেন কঠিন সময়ে দলকে করেছেন সুসংহত, স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ছিলেন সম্মুখ নেতৃত্বে, আপসহীন ইমেজে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। তিনবার নির্বাচিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, সব আসনেই বিজয়ী হওয়ার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন।  শিকার হয়েছেন এক-এগারোর ষড়যন্ত্রের, কারাবরণ করেছেন মিথ্যা মামলায়।  নির্জন কারাগারে আক্রান্ত হয়েছেন দুরারোগ্য ব্যাধিতে। তারপরও পরম সহিষ্ণুতা আর সংযম তাকে আজ দেশনেত্রীর চাইতেও উচ্চতর আসনে বসিয়েছে।

কারারুদ্ধ হওয়ার পর বিএনপির শীর্ষ দায়িত্বে আসেন তারেক রহমান, এক-এগারোর ষড়যন্ত্রকারীদের রোষানলে নির্যাতনের তীব্রতায় প্রায় পঙ্গুত্বকে জয় করে আট হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও দলকে পরিচালিত করেছেন পরম দক্ষতায়। ফলে নির্যাতন, হত্যা, গুম, জেল-জুলুম, মামলা-হামলায় জর্জরিত হয়েও লাখো কোটি নেতাকর্মী সমর্থকরা পরিচয় দিয়েছেন এক অবিশ্বাস্য ঐক্য আর আনুগত্যের। সতের বছর ধরে উত্তপ্ত প্রতিবাদের লাভা মহা-বিস্ফোরণে উদগিরিত হয়েছে চব্বিশের আগস্টে, এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অপেক্ষমাণ জাতির সামনে। সাধারণ মানুষের চাওয়া একটাই, দেশের মালিকানা ফেরত দিতে হবে, জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে তারা পছন্দের সরকার নির্বাচিত করতে চায়। তারা জানে ফেব্রুয়ারিতে গণতন্ত্রে উত্তরণ বাধাগ্রস্ত হলে, অনিশ্চিত সময়ের জন্য দেশের মানুষ ফ্যাসিবাদের বন্দিত্বে অবরুদ্ধ হতে পারে। গুটিকয়েক উচ্চাভিলাসী প্রজ্ঞাহীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের হঠকারিতায় দেশের ১৮ কোটি মানুষ আবারও কারারুদ্ধ আর বাকরুদ্ধ হবেন এমন অনাকাক্সিক্ষত পরিণতি কেন মেনে নেবে সাধারণ মানুষ? তারা কি এই সরল সত্যটা বোঝেন না যে, পলাতক স্বৈরাচার এখনো পরাজয় মেনে নেয়নি, এখনো অনুতপ্ত নয় তারা, দেশের মধ্যে থাকা তাদের অবিবেচক আর অন্ধ অনুসারীরা এখনো সুযোগের সন্ধানে। রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণে মহানায়ক হওয়ার দুর্লভ সুযোগ।

লেখক : আহ্বায়ক, বিএনপি মিডিয়া সেল

  [email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত