দক্ষ কর্মী রপ্তানিতেই রেমিট্যান্সে জোয়ার

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০১:০০ এএম

বাংলাদেশ একটি জনবহুল রাষ্ট্র। ছোট্ট এই দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ। ইউএনএফপিএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। এই জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশের বয়স শূন্য থেকে ১৪ বছর। ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সের মানুষ আছেন ৬৫ শতাংশের বেশি। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষ প্রায় ৭ শতাংশ। সুতরাং বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের মধ্যবর্তী সময়ে অবস্থান করছে। সহজ ভাষায় বললে বলা যায়, দেশ এখন বোনাস জনসংখ্যার দেশ।  অর্থাৎ কর্মক্ষম জনসংখ্যাই ৬৫ শতাংশের বেশি। ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সুবিধা ভোগ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সুবিধা ২০৫০ সাল পর্যন্ত চলমান থাকবে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সুবিধা ভোগ করে দেশটির অর্থনীতি দ্রুত বিকাশের সুযোগ গ্রহণ করা উচিত। কারণ, কাজ করার মতো মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে, সঞ্চয় ও বিনিয়োগের হার বৃদ্ধি পাবে এবং উৎপাদনশীলতা ও ভোগক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে। তবে এই সুবিধা গ্রহণ করার জন্য মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থাকতে হবে। না হলে এই সুফল ‘বোঝা’তে পরিণত হতে পারে।

২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, নিষ্ক্রিয় তরুণ-তরুণী আছেন ৯৬ লাখ ৪০ হাজার। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীর সংখ্যা প্রায় ৪১ লাখ। প্রশ্নটা এখানেই এত বিশাল জনসংখ্যা ছদ্মবেকার, অথচ আমরা তাদের কাজে লাগাতে পারছি না। অপরদিকে, ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থানরত বৈধ বিদেশি নাগরিক সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজার ১৬৭ জন, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ভারতীয় নাগরিক ৩৭ হাজার ৪৬৪ জন, দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনের নাগরিক ১১ হাজার ৪০৪ জন। আমরা অনেকেই হয়তো জানি না ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন প্রভৃতি দেশ  থেকে আসা সুপার ম্যানেজার বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আমাদের দেশে তৈরি পোশাক, ওষুধ শিল্পে ও করপোরেট জগতে কাজ করে প্রতি বছর দেশ থেকে ৫০০ থেকে হাজার কোটি মার্কিন ডলার তাদের দেশে নিচ্ছে। অথচ বিদেশে কর্মরত আমাদের ষাট-সত্তর লাখ বা তারও অধিক প্রবাসী শ্রমিক উদয়াস্ত পরিশ্রম করে ১ থেকে ২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার দেশে পাঠাচ্ছেন। অর্থাৎ আমরা দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারিনি। যদিও  অন্তর্বর্তী সরকার বেশ সোচ্চার বিশাল এই জনসংখ্যাকে কাজে লাগানোর জন্য। এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য নতুন নতুন বাজারের সন্ধান করছে। আবার বন্ধ বাজারগুলো পুনরায় চালু করার চেষ্টা অব্যাহত রাখছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ এবার ইউরোপেও বৈধভাবে শ্রমিক পাঠানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই ইতালি ও জাপানের সঙ্গে অভিবাসনবিষয়ক সমঝোতা স্মারক সই করেছে। আগামী পাঁচ বছরে জাপানে পাঁচ লাখের বেশি কর্মী পাঠাতে ‘জাপান সেল’ গঠন করা হয়েছে। আগে জাপানে শ্রমিক পাঠাতে তিনটি খাতে দক্ষতার পরীক্ষা হতো। এটি এখন পাঁচটি খাতে উন্নীত করা হয়েছে। দক্ষ শ্রমিক প্রশিক্ষণ ও সনদের বিষয়ে জাপানের তিনটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে, আলাদা করে তিনটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়েছে। বর্তমানে ৪৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (টিটিসি) জাপানি, ইংরেজি, চীনা ও কোরীয় ভাষা কোর্স পরিচালনা করা হচ্ছে। বিএমইটি ও সৌদি আরবের কোম্পানি ‘তাকামোল’-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে গত এক বছরে ১৫টি টিটিসি ও বিআরটিসি ট্রেনিং সেন্টার দক্ষতা পরীক্ষা পরিচালনা করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের অবদান ৬ থেকে ৭ শতাংশ। সরকার এই খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত করে ২০১০ সালে, যার উদ্দেশ্য হলো প্রবাসী শ্রমিকদের বিদেশ গমনে আর্থিক সহযোগিতা করা। সরকার গুরুত্ব দিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক তৈরি করল, অথচ ব্যাংক কর্মকর্তারা প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-দুর্দশা বোঝেন না। সৌদি আরবে যেতে ইচ্ছুক কিন্তু নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যক্তি জানান, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তিনি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে যান ঋণ নিতে। সেখানে চেকলিস্ট ধরিয়ে দেওয়া হয়। চেকলিস্টে থাকে নাগরিকত্ব সনদ, ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি, পাসপোর্ট সাইজের ৩টি সত্যায়িত ছবি, পাসপোর্টের সত্যায়িত ফটোকপি, বিদেশে চাকরির নিয়োগপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি, সেই নিয়োগপত্রে বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদনপত্রের ফটোকপি, প্রেরণযোগ্য কমিশন/সার্ভিস চার্জের বিবরণ এবং গমনপত্র যেখানে মাসিক বেতন ও কর্মকাল উল্লেখ থাকে। ঋণ আবেদন ফরমে ৩ নম্বর (অর্থের কেন প্রয়োজন)-এ বলা হয় বিমান ভাড়া, ভিসা ফি এবং বিবিধ খরচ সম্পর্কে। যা স্বল্পশিক্ষিত লোকদের জন্য অনেক বেশি কঠিন, এবং সব দিতে পারলেও বিমান ভাড়া রসিদ আর দিতে পারে না। 

যদিও ৩ নম্বর-এ বলা হয়, বিদেশ গমনে কী পরিমাণ খরচ হতে পারে। কিন্তু তারা  বিমান ভাড়ার রসিদ চেয়ে বসে, ফলে ঋণও আর হয় না। এক রকম বাধ্য হয়েই দালালের কাছে যেতে হয় তাকে।  দালাল তাকে জানান, এখানে অধিকাংশ ঋণই পাস কমিশনে, যা সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ। পরে দালালের মাধ্যমে কিছু টাকার বিনিময়ে ঋণ পাওয়া যায়। সরকার যদি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে কাজে লাগাতে না পারে, তাহলে এ সুবিধা উল্টো বোঝা হয়ে দেখা দেবে। সুতরাং সমস্যা সমাধানের প্রয়োজন গোড়া থেকে। রাষ্ট্র যদি তার জনগণকে শ্রমিক হিসেবে না পাঠিয়ে ন্যূনতম কর্মী হিসেবেও পাঠায়, তাহলে আরও বেশি রেমিট্যান্স আহরণ করতে পারবে।

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত