ইসলামে সম্প্রীতি ও সহাবস্থান

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৫:২৩ এএম

মানবসভ্যতার ইতিহাসে শান্তি, সম্প্রীতি ও সহাবস্থান সবসময়ই ছিল টিকে থাকার অন্যতম শর্ত। মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই সামাজিক প্রাণী। তাই একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক, সহযোগিতা ও পারস্পরিক নির্ভরতা ছাড়া জীবন পূর্ণতা পায় না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বর্তমান পৃথিবীতে সহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতির অভাব প্রকট হয়ে উঠছে। আজকের বিশ্বে যে অসহিষ্ণুতা, বিদ্বেষ ও ধর্মীয় উগ্রতার দৃশ্য আমরা দেখছি, তা মানবজাতির জন্য এক ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সংকটময় সময়ে ইসলাম শান্তি ও সহাবস্থানের এমন এক শিক্ষা উপস্থাপন করে, যা শুধু ধর্মীয় জীবন নয়, বরং সামাজিক ও বৈশ্বিক জীবনের জন্যও পথনির্দেশক। ইসলাম শব্দের মূল অর্থ শান্তি। আর কোরআন-হাদিসে স্পষ্ট নির্দেশ আছে মানুষে মানুষে সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠার। ইসলাম শুধু সংঘাত এড়িয়ে চলার কথা বলে না, বরং ভিন্ন মত ও বিশ্বাসকেও সম্মানের সঙ্গে মেনে নেওয়ার শিক্ষা দেয়। এভাবেই গড়ে ওঠে প্রকৃত সহাবস্থান, যেখানে ভিন্নতা বাধা নয়, বরং মানবিক সহিষ্ণুতার পরীক্ষা ও বিকাশের সুযোগ।

বিশ্বায়নের এই যুগে বহুত্ববাদ বাস্তবতা। একই রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্ম, জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাস, পারস্পরিক যোগাযোগ ও নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু সেই সঙ্গে বাড়ছে উগ্রতা, সংকীর্ণতা ও বৈষম্য। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কিংবা ইউরোপে শরণার্থী সংকট, সব জায়গায় এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা হলো সহাবস্থানের ব্যর্থতা। এ বাস্তবতায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান শুধু একটি নৈতিক মূল্যবোধ নয়, বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার অপরিহার্য শর্ত। ইসলামি জীবনব্যবস্থার আলোকে সহাবস্থানের ধারণা নতুন করে আত্মস্থ করা জরুরি। কোরআনের শিক্ষা, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মদিনা সনদ, খোলাফায়ে রাশেদিনের দৃষ্টান্ত, এসবই দেখিয়ে দেয় যে ইসলাম মানুষকে শুধু আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে শেখায় না, বরং পারস্পরিক সহযোগিতা, ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের ভিত্তি স্থাপন করে। তাই আজকের পৃথিবীতে সম্প্রীতি ও সহাবস্থান প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জরুরি হয়ে উঠেছে।

সব ধর্মই মানুষে মানুষে সৌহার্দ্য, সহানুভূতি ও সহাবস্থানের কথা বলে। ইসলাম ধর্মে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে একটি মৌলিক নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘ধর্মের বিষয়ে কোনো জবরদস্তি নেই।’ (সুরা বাকারা ২৫৬) শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান মানে শুধু সংঘাত না থাকা নয়, বরং ভিন্নতা ও মতপার্থক্যকে সম্মানের চোখে দেখা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার সঙ্গে বসবাস করা, মত ও পথের ভিন্নতা সত্ত্বেও একই সমাজে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করা। এটি একটি নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে সহনশীলতা, মানবিকতা, উদারতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে সমাজ গঠিত হয়। বহুত্ববাদী সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তি মূলত চারটি বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সহিষ্ণুতা, ন্যায়বিচার, সংলাপ ও পারস্পরিক সম্মান। এই চারটি গুণই মানুষকে একে অন্যের পাশে থেকে গঠনমূলক পরিবেশে জীবনযাপন করতে সাহায্য করে।

বিশ্ব এখন এক বহুত্বের সম্মিলন। একেক দেশে একাধিক ধর্মাবলম্বী, জাতি, বর্ণ, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ বসবাস করছে। অভিবাসন, বিশ্বায়ন, আন্তঃদেশীয় সম্পর্ক, অর্থনৈতিক নির্ভরতা সবই বিশ্বকে নিয়ে এসেছে অভিন্ন ছাদের নিচে। কিন্তু সেই সঙ্গে বেড়েছে সংঘাত, গোঁড়ামি, জাতিগত বিদ্বেষ ও কট্টরতা। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আফ্রিকা, ইউরোপ থেকে দক্ষিণ এশিয়া, প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই দেখা যাচ্ছে ধর্মীয় উগ্রতা, জাতিগত দ্বন্দ্ব ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এই প্রেক্ষাপটে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান শুধু একটি মানবিক মূল্যবোধ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার অবিচ্ছেদ্য শর্ত। ইসলাম এমন এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা সমাজ, রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক মানব সম্পর্কের জন্য সুসংহত নীতিমালা দিয়েছে। কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ শান্তির আবাসে মানুষকে আহ্বান করেন।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত ২৫) হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা একে অন্যকে ঘৃণা করো না, একে অন্যের প্রতি হিংসা করো না, বরং আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে যাও।’ (সহিহ মুসলিম) এই বক্তব্যে শুধু মুসলিমদের নয়, বরং সামগ্রিকভাবে মানবজাতির পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি রচিত হয়েছে। ইসলাম অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গেও শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনক সহাবস্থানের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে।

রাষ্ট্রব্যবস্থায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রথম মডেল স্থাপন করেছিলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। হিজরতের পর মদিনায় তিনি ইহুদি, খ্রিস্টান ও পৌত্তলিকদের নিয়ে যে রাষ্ট্র গড়েন, সেটার ভিত্তি ছিল মদিনা সনদ। এই ঐতিহাসিক সনদে বলা হয়, সব সম্প্রদায় তাদের নিজ নিজ ধর্মাচারে স্বাধীন থাকবে। তারা পারস্পরিক নিরাপত্তা রক্ষা করবে এবং বৈষম্যহীনভাবে বিচার পাবে। কোরআন মুসলমানদের প্রতি এমন দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষা দেয়, যাতে অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করা হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তাদের গালি দিয়ো না, যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কিছুকে ডাকে।’ (সুরা আনআম, আয়াত ১০৮) এই আয়াতে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি শিষ্টাচার রক্ষা করতে হবে, এমনকি তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাসকে কটাক্ষ করাও নিষেধ। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে প্রত্যেকের (উম্মত) জন্য আমি এক (পৃথক) শরিয়ত ও পথ নির্ধারণ করেছি। আল্লাহ চাইলে তোমাদের সবাইকে একই উম্মত বানিয়ে দিতেন। কিন্তু (পৃথক শরিয়ত এজন্য দিয়েছেন) যাতে তিনি তোমাদের যা কিছু দিয়েছেন, তা দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৮) অর্থাৎ ভিন্নতা আল্লাহর ইচ্ছায় সৃষ্ট। সেই ভিন্নতাকে ঘৃণা নয়, বরং উপলব্ধি ও সহনশীলতার চোখে দেখা ইসলামি শিক্ষার অন্তর্গত।

ইসলাম অমুসলিমদের প্রতি সদ্ব্যবহার, নিরাপত্তা ও ন্যায়ের নির্দেশ দিয়েছে। নবীজি (সা.) বলেন, জেনে রেখো, যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিক বা সংখ্যালঘুকে আঘাত করে কিংবা তাকে অপদস্থ করে অথবা কর্মচারী নিয়োগ করে, তার সাধ্যের বাইরে কাজ চাপিয়ে দেয়, কিয়ামতের ময়দানে আমি তার বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে মামলা করব। (সুনান আবু দাউদ) খোলাফায়ে রাশেদিন, বিশেষ করে হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে অমুসলিমদের জীবন, সম্পদ, উপাসনালয় এমনকি ধর্মীয় নেতাদের নিরাপত্তাও বিধান করা হয়েছিল। তার নির্দেশ ছিল, অমুসলিমরা যদি আমাদের অধীন থাকে, তবে তারা যেন কোনো ধরনের ভয় বা হুমকির শিকার না হয়। তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা যেন বজায় থাকে।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত