বৃহত্তর ময়মনসিংহের ইতিহাস, ঐতিহ্য, যুদ্ধবিগ্রহ ও সাংস্কৃতিকভাবে বৈচিত্র্যময় এক জনপদ। এর লোকাচার ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এ অঞ্চলের মানুষকে সমৃদ্ধ করেছে। প্রাকৃতিক সুষমামন্ডিত শুধু ময়মনসিংহবাসী নয়, অধিকাংশ বাংলাদেশি আজ অর্থনৈতিক, মানবিক মর্যাদা, শিক্ষা-দীক্ষায় পশ্চাৎপদ। আলস্য ও কর্মবিমুখতা এর অন্যতম কারণ। আজ বিশ্বের বেশিরভাগ জাতি কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে কাজ করে উন্নতির চরম শিখরে। অথচ বাংলাদেশের মতো অনেক দেশ, কাজ না করে ঘরে বসে ভাগ্যের ওপর দোষারোপ করছে। এ কথা সত্য যে, মানব-মানবীর ভাগ্যবিধাতা কর্তৃক পূর্বনির্ধারিত। তবে আত্মশক্তির ওপর বিশ্বাস হারালে মানুষের ধ্বংস অনিবার্য। তাই আত্মপ্রত্যয়, আত্মত্যাগ মানুষের অগ্রযাত্রায় সহায়তা এবং মহিমাম্বিত করে। মহাকবি ইকবাল বলেন, ‘শিশির কণাকে জমিয়ে নদীতে পরিণত কর, আর মোমবাতির মতো নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়ে অন্যকে আলো দাও’। ‘সকলের তরে জীবন মন সকলই দাও, আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’
সম্প্রতি বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমিতি গুণীজন সংবর্ধনার আয়াজন করেছিল। যদিও অগণিত গুণীজনের মধ্যে ময়মনসিংহ জেলার মাত্র কয়েকজন গুণীজনকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমিতি সংবর্ধনা দিয়েছে। এই সংবর্ধনা বা সম্মাননা প্রদানের মাধ্যমে সমিতি এবং সমিতির সদস্যরাই সম্মানিত বোধ করেছেন। গুণীজনকে সম্মাননা কেন? অথবা গুণীজন কারা? তা বুঝতে হলে Wise, virtue, virtues, moral, immoral শব্দগুলো মানসপটে ভেসে ওঠে। সত্যি-মিথ্যার প্রশ্ন বিবেচনায় আসে। গুণীজন, প্রকৃতজন, প্রকৃত মানুষ। জ্ঞানীজন Wise, গুণীজন virtuous, কিন্তু গুণীজন moral, immoral নন। তারা সত্যের অনুসারী। কিন্তু সত্য কী? এর উত্তর যত সহজ মনে করা হয় ততটা নয়। যুগে যুগে দার্শনিকরা সত্যানুসন্ধান করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছেন। সত্যের মূল অনুসন্ধান আসলেই দুরূহ ও কষ্টকর। কারণ সত্য-মিথ্যায় বৈপরীত্ব থাকলেও, এরা বাস করে অতি সন্নিকটে। সত্য সুন্দর হলেও, কালে কালে লক্ষ্য করা গেছে এরা সাহসী কিন্তু নির্ভীক হতে পারেন না। মেরুদন্ড সোজা করে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারেন না। তবে সবসময় মানুষ যে মিথ্যার আশ্রয় নেয়, তা কিন্তু নয়। মূল কথা হচ্ছে, মিথ্যার প্রতি এক ধরনের নিম্নমানের দুর্বলতাই মানুষকে সত্য এড়িয়ে চলতে সহায়তা করে। এসব দুর্বলতা যারা কাটিয়ে উঠতে পারেন তারাই জয়ী হন। যিনি সত্যকে সন্ধান করেন একমাত্র তিনিই সত্যকে খুঁজে পান এবং সত্যের অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকন করে পুলক অনুভব করেন। এটা সবাই স্বীকার করবেন যে, একজন মানুষ সমাজ, রাষ্ট্র অথবা আপন ভুবনে প্রতিষ্ঠা পান তার কৃতিত্বপূর্ণ অবদান এবং স্বকীয় গুণের জন্য। প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরাই একসময় হয়ে উঠেন নন্দিত।
মানুষ মিথ্যাকে শুধু মিথ্যার স্বার্থেই ভালোবাসে, একটু মিথ্যার স্পর্শ যেন সব আনন্দের উৎস হয়ে ওঠে। যদিও সে মিথ্যা মানুষের ভেতর ঠাঁই পায় না। মনে রাখতে হবে, মানুষের চরিত্রে সত্যের স্থান সব কিছুর ঊর্ধ্বে। সে জন্য স্বচ্ছ মন ও আত্মা, সবার জন্য কাম্য। আমরা যে যেখানে আছি কর্মক্ষেত্র যাই হোক না কেন, প্রত্যেকেই প্রত্যেকের জন্য। মূল কথা হলো ‘মানুষ মানুষের জন্য’। এ উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ জেলা, পাঁচ ভাগে বিভক্ত হলেও এর ঐতিহ্য-কৃষ্টি, সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে আমরা গর্ব করি। দীনেশ চন্দ্র সেন (রায় বাহাদুর) সম্পদিত ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ আমাদের অতীত সাহিত্য সংস্কৃতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জারি-সারি, পালা গান, যাত্রা অনুষ্ঠান এসব গ্রামবাংলায় সাহিত্যের বড় উপাদান। ময়মনসিংহ গীতিকা, মহুয়া, মলুয়া, চন্দ্রাবতী, কমলা, দেওয়ান ভাবনা, দস্যু কেনারাম, রূপবতী কঙ্কা ও লীলা, কাজল রেখা ও দেওয়ান মদিনা ইত্যাদি প্রেমকাহিনি পালা গানের মাধ্যমে কালের সাক্ষীরূপে আজও জাগরূক রয়েছে। শুধু রম্য কাহিনি নয়, প্রেম কাহিনি নয়, শুধু বঙ্গ রমণীর লীলা খেলা নয়, এসব গাঁথায় আমাদের প্রাচীন ইতিহাসের অনেক দিক আজও দেদীপ্যমান হয়ে আছে। পালা গানের অধিকাংশই পূর্ব ময়মনসিংহের কোনো কোনো যথার্থ ঘটনা অবলম্বনে রচিত। যেসব ঘটনা অশ্রুসিক্ত হয়ে লোকেরা শুনেছেন। যেসব অবাধ ও অপ্রতিহত অত্যাচর দুর্জয় চক্রের মতো সরল-নিরীহ প্রাণকে দগ্ধ করেছে, সেসব অপরূপ করুণ কথা গ্রাম্য কবিরা পয়ার গেঁথে উপস্থাপন করেছেন। যারা এসব কাব্য রচনা করেছেন, তাদের অশ্রু ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু এসব কাহিনির শ্রোতার অশ্রু কখনো ফুরাবে বলে মনে হয় না। প্রেমের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ এক অপরিবর্তনীয় মোহনীয় বস্তু। ময়মনসিংহ গীতিকায় রয়েছে তারই অপূর্ব অসাধারণ বিবরণ ‘পীড়িত রতন/পীড়িত যতন/পীড়িত গলার হার/পীড়িত কইরা যেজন মইল/সফল জনম তার’। দীনেশ চন্দ্র সেন এসব প্রেমের কাহিনি যাত্রা, গাঁথা ও পালার তুলনামূলক অপূর্ব সুন্দর বিবরণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যাত্রা ও পালা গানগুলোকে যদি বলি রাজ-রাজাদের খনিত দীঘি-পুস্করিনী, তবে গাঁথা গানকে বলতে হবে নিতান্তই প্রকৃতি সৃষ্ট সরোবর। সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যমন্ডিত যে ময়মনসিংহ আসলেই কি সে ধনাঢ্য নাকি অন্তসার শূন্য? সমস্যা সংকুল এ দেশে শুধু অভাব আর অভাব। নেই আর নেই। শিক্ষাব্যবস্থা ভঙ্গুর, সাধারণ শিক্ষার গুণগতমান নেই, কারিগরি শিক্ষার উৎকর্ষ নেই, যোগাযোগ ব্যবস্থার অবনতি, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেলে ভ্রমণ করেন ময়মনসিংহবাসী। সড়কপথ নানা সমস্যায় জর্জরিত। নেই শিল্প কারখানা, বেকারত্ব প্রকট, নারী শিক্ষার আধুনিকায়ন নেই, জামালপুরে পশ্চিমাঞ্চলে যমুনা নদীর কড়াল গ্রাসে হাজার হাজার মানুষ গৃহহারা। নীতি-নৈতিকতার সংকট। মিথ্যাচার, অনাচারে সমাজ কুলষিত। এসব থেকে মুক্তি পেতে হলে, দেশবরেণ্য গুণীজনকে আজ অগ্রণী ভূমিকায় আসতে হবে। দেশের প্রতি, সমাজের প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি আছে, থাকতে হবে। দেশ গড়ার কাজে আত্মোৎসর্গ করার মানসিকতা জাগ্রত রাখতে হবে। আমরা যেন দেশপ্রেমে উজ্জীবিত এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব সদস্য, বিএনপি উপদেষ্টাম-লী
