বিশ্ব এখন নয়া মেরূকরণের পথে হাঁটছে। বিশেষ করে, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যার প্রভাব পড়েছে ব্যাপক। সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অনেক দেশের শাসককুল নিজেদের পরিবর্তন করতে পারেনি। যে কারণে, বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিনের জমে থাকা জনগণের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হচ্ছে। আমাদের দেশে, গণঅভ্যুত্থান হয়েছে গত বছর। এরপর মোটা দাগে হলো নেপালে। এর বাইরে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এখনো বিক্ষোভ চলছে, শাসক দলের স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের বিরুদ্ধে। এমন পরিবর্তনে মুখ্য ভূমিকা নিচ্ছে তরুণ সমাজ। একসময় মতপ্রকাশ স্বাধীনতার সুনাম ছিল নেপালে। গত বৃহস্পতিবার সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, যেসব সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি সরকারে নিবন্ধন করেনি, সেগুলোর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হবে। ২৮ আগস্ট থেকে এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছিল নিবন্ধনের জন্য। কিন্তু মেটা (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ), অ্যালফাবেট (ইউটিউব), এক্স (টুইটার), রেডডিট ও লিঙ্কডইন কেউই নিবন্ধনের আবেদন করেনি। কাঠমান্ডু পোস্ট জানাচ্ছে, নেপালে প্রায় ১.৩৫ কোটি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করেন এবং প্রায় ৩৬ লাখ ব্যবহারকারী ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করেন।
অনেকে ব্যবসার জন্য এসব প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল। নিষেধাজ্ঞার ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং ক্ষোভে ফেটে পড়েন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় নেপালের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘নেপো কিড’ নামে একটা প্রচার শুরু হয়েছিল। সেখানে রাজনীতিবিদদের সন্তানদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রার ওপর আলোকপাত করা হয় এবং নেপথ্যে দুর্নীতি রয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়। বিদেশে অর্থ পাচার, বড় অঙ্কের কর আরোপ, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ নানা কারণে নাগরিক জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে দেশটিতে। শেষ পর্যন্ত তরুণ প্রজন্মের তীব্র আন্দোলনের মুখে, অবশেষে পদত্যাগ করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। বর্তমানে নেপালে জেন-জি আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২১ জনে দাঁড়িয়েছে। গুঞ্জন উঠেছে, প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত পালিয়ে দুবাই অথবা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। মঙ্গলবার সকালে সমাজমাধ্যম বন্ধের সিদ্ধান্ত তুলে নেওয়া হয়েছে।
বেশ কিছুদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে স্থবিরতা তিন কোটি মানুষের দেশে হতাশার জন্ম দিয়েছে, যা এই বিক্ষোভে ইন্ধন জুগিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মত দেন। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, ‘নেপাল পরিস্থিতির ওপর আমরা দৃষ্টি রাখছি। সেখানে হাইকমিশনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত কথা হচ্ছে। তারা আপডেট পরিস্থিতি জানাচ্ছে।’ আপাতত নেপাল ভ্রমণ পরিহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, নেপাল থেকে বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলের সদস্যদের গতকাল দেশে ফেরার কথা থাকলেও, সেখানকার বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা করায় সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এতে তারা আটকা পড়েছেন কাঠমান্ডুতে। জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা ছাড়াও ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের (ডিএসসিএসসি) ৫১ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সেখানে অবস্থান করছিল, তারাও কাঠমান্ডুতে আটকা পড়েছেন। ৬ সেপ্টেম্বর প্রথম ম্যাচের পর মঙ্গলবার হওয়ার কথা ছিল দ্বিতীয় ম্যাচ। নেপাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ৯ সেপ্টেম্বরের প্রীতি ম্যাচ বাতিল ঘোষণা করেছে।
এ ধরনের আন্দোলন এবং শাসক পরিবর্তনে যতই বাইরের দেশকে অভিযুক্ত করা হোক না কেন লাভ নেই। সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র অথবা কোনো দেশের প্রত্যক্ষ ইন্ধনের কথা বলে যে শাসকদের লাভ হবে না তা পরিষ্কার হচ্ছে। দেশ শাসন করতে হলে, সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ তরুণদের মতামতকে প্রাধ্যান্য দিতে হবে। বিভিন্ন দেশের শাসক সতর্ক না হলে, সামনে অন্য কোনো দেশে এ রকম পারিবর্তন হলে, অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
