দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) দেশের নাগরিকদের মোট অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের অবদান ৬ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু নারীদের গৃহস্থালি ও সেবাযত্নের কাজের অর্থমূল্য ৫ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা, যা পুরুষের তুলনায় ৭ দশমিক ৩ গুণ বেশি। ২০২১ সালের সময় ব্যবহার জরিপ ও ২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে একটি জরিপ পরিচালনা করে এমন ফলাফল পেয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।
‘বাংলাদেশের অবৈতনিক গৃহস্থালি উৎপাদনের স্যাটেলাইট হিসাব’ শীর্ষক জরিপের ফলাফল প্রকাশে গতকাল বিবিএস মিলনায়নে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে বলা হয়, নারীর বিনা মজুরির গৃহস্থালির কাজের আর্থিক মূল্য প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে, সেবাযতেœর কাজের আর্থিক মূল্য প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। প্রথমবারের মতো এই পরিসংখ্যান প্রণয়ন করল বিবিএস। ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ।
বিবিএসের মহাপরিচালক মো. মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে এতে অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আকতার এবং ইউএন ইউমেনের প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিংহ।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বিনা বেতনে গৃহস্থালি এবং যত্নের কাজ যেমন রান্না করা, কাপড় ধোয়া, গৃহস্থালি ব্যবস্থাপনা এবং শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং স্বাস্থ্যগত সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য সেবা করা অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু নারীরা বেশিরভাগ কাজই সম্পাদন করেন, যা অপরিহার্য কিন্তু প্রচলিত অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান থেকে বাদ দেওয়া হয়। আরও জানানো হয়, ২০২১ সালে অবৈতনিক গৃহস্থালি এবং যতেœর কাজে দেশের ১৫ বছরের ঊর্ধ্বের সব নাগরিকের অবদান ছিল ৬ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ। অবৈতনিক কাজের যে অবদানের মধ্যে ৮৫ শতাংশ ছিল নারীদের অবদান।
অনুষ্ঠানে ইউএন উইমেন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম বিশ্লেষক মিসেস নুবায়রা জেহিন একটি কেয়ার ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপট নির্ধারণ করেন। যেটি একটি টুল যা ব্যক্তিদের প্রতিদিন অবৈতনিক গৃহস্থালি এবং যত্নের কাজে ব্যয় করা সময় পরিমাপ করতে সাহায্য করে। বিবিএসের ডেমোগ্রাফি এবং স্বাস্থ্য শাখার উপপরিচালক আসমা আখতার এইচপিএসএ প্রতিবেদনের মূল ফলাফল উপস্থাপন করেন। যেখানে নারীদের অবৈতনিক কাজের মাত্রা এবং এর অর্থনৈতিক মূল্য তুলে ধরা হয়।
বিবিএস জানায়, আইন ও নীতিমালার সঙ্গে অবৈতনিক কাজকে একীভূত করার জন্য একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা দরকার। এছাড়া জাতীয় বাজেট এবং উন্নয়ন কৌশলগুলোতে ঘরের কাজের বিষয়টি অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। উপযুক্ত যত্নের চাকরি এবং অবৈতনিক কাজের ওপর টেকসই অর্থায়ন এবং নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ নিশ্চিত করতে হবে। পুরুষ এবং ছেলেদের যত্নের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে সামাজিক রীতিনীতিকে চ্যালেঞ্জ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং ইউএন উইমেন বাংলাদেশ, বিশ্বব্যাপী উইমেন কাউন্ট প্রোগ্রামের সহায়তায় এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রোডাকশন স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্টের (এইচপিএসএ) কারিগরি সহায়তায় প্রতিবেদনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নারীর অদেখা শ্রমের এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, বরং নীতি ও বাজেটে লিঙ্গ-সংবেদনশীলতা বাড়ানোর জন্য এক বড় ভিত্তি। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারীর অমূল্য অবদানকে দৃশ্যমান করার মাধ্যমে দেশ এক নতুন দিগন্তে প্রবেশ করল।
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে শারমিন এস মুরশিদ বলেন, নারীর শ্রম দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির ছায়ায় ছিল। এই প্রতিবেদন সেই অমূল্য অবদানকে দৃশ্যমান করল। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রধান পরিসংখ্যানবিদ মাহিন্থান জোসেফ মারিয়াসিংহাম ভিডিও বার্তায় এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের জন্য একটি ‘অগ্রণী পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেন।
