বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের দুর্বলতা

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজবাড়ীতে কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা এবং একই দিন রাজশাহীর একটি মাজারে হামলার ঘটনা, দেশের সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য গভীর উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এ ধরনের ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার অবনতি নয়, বরং রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যখন একদল মানুষ নিজেদের হাতে আইন তুলে নেয় এবং বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, তখন রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। যখন কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য মব ব্যবহার করে, তখন তারা প্রকাশ্যে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে বরং তাদের ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ ক্ষোভের প্রতিফলন হিসেবে উপস্থাপন করে। এই ধরনের আশকারা বা মদদ দেওয়ার ফলে রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়, কারণ তারা রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে। এর ফলে একটি বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়, যেখানে মব সদস্যরা জানে যে তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো জবাবদিহি করতে হবে না। এটি ভবিষ্যৎ সহিংসতাকে উসকে দেয়। এই মব সংস্কৃতিকে ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের একটি সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে। এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বা বিরোধী উভয় পক্ষই নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য একটি অপ্রথাগত হাতিয়ার ব্যবহার করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো একটি বিতর্কিত ইস্যু নিয়ে যখন জনমতকে প্রভাবিত করার প্রয়োজন হয়, তখন এই ধরনের মবকে মাঠে নামানো হয়। এরপর রাজনৈতিক নেতারা এই মবের ‘চাপের’ মুখে নিজেদের দাবি মেনে নেওয়ার অজুহাত দেখান। এতে একদিকে যেমন তাদের নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল হয়, তেমনি অন্যদিকে তারা জনরোষের শিকার হওয়ার দায় এড়াতে পারে। এই প্রক্রিয়াটি গণতন্ত্রের মূল নীতির পরিপন্থী। কারণ এখানে আলোচনার বদলে সহিংসতা ও ভয়ভীতির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়।

মব সহিংসতা নতুন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রবণতার অংশ। বিভিন্ন গবেষণা এবং সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে মব সহিংসতার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে শুধুমাত্র ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল ১৫৪টি, যা ২০২০ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে ২৭টি হিন্দু মন্দির ও মূর্তিতে হামলা চালানো হয় এবং ১৬টি বাড়িঘর ও দোকানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ২০২২ সালেও এই প্রবণতা অব্যাহত ছিল, যেখানে কুমিল্লায় একটি দুর্গাপূজা মণ্ডপে হামলাকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার মূলে ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি মিথ্যা খবর। এ ধরনের ঘটনার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, গুজব এবং মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ করা হয়। প্রায়ই দেখা যায়, এই সহিংসতার পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদ থাকে। তারা নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে বা ক্ষমতা বাড়াতে এ ধরনের সহিংসতাকে ব্যবহার করে। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলের দরবারে হামলা ও মরদেহ পোড়ানোর ঘটনায় প্রশাসনের দায়সারা ভূমিকা নিয়ে জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অজুহাতে এলাকায় উত্তেজনা বাড়ছিল এবং ‘ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটি’র ব্যানারে একাধিক দিন ধরে বিক্ষোভ ও মিছিলের প্রস্তুতি চলছিল। এই ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রশাসন অবগত থাকা সত্ত্বেও সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। জুমার নামাজের পর যখন মিছিল থেকে হামলা চালানো হয় এবং পরে মরদেহ উত্তোলন করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মব সহিংসতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি, যার ফলে একটি চরম অমানবিক ঘটনা ঘটে গেল। জনগণের ক্ষোভের মূল কারণ হলো, রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থার ওপর ভরসা না রেখে যখন একদল লোক নিজেদের হাতে বিচার তুলে নেয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তখন নীরব থাকে, তখন তা একটি দুর্বল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে।

এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শিকার বাংলাদেশের হাজার হাজার মাজার এবং বাউল সমাজ। মাজারগুলো বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি এবং বহুত্ববাদী সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুগ যুগ ধরে এগুলো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের মিলনস্থল হিসেবে কাজ করে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি কিছু মৌলবাদী গোষ্ঠী এই মাজারগুলোকে ‘শিরক’ এবং ‘বিদ’আতের’ কেন্দ্র হিসেবে আখ্যায়িত করে এর ওপর হামলা চালাচ্ছে। এই ধরনের হামলার ফলে অনেক মাজারের পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে এবং অনেক বাউল শিল্পী তাদের গান-বাজনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এই ধরনের আক্রমণের ভয়াবহতা বিশেষভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে ২০০১ সালের পর থেকে, যখন আন্তর্জাতিক কট্টরপন্থি মতাদর্শের প্রভাব বাংলাদেশে বাড়তে শুরু করে। বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী, যেমন জেএমবি (জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ), তাদের কর্মকাণ্ডে মাজার ও বাউলদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে শুরু করে। এরপর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার ও বাউলদের ওপর হামলার ঘটনা নিয়মিত হতে থাকে। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ২০১৬ সালে কুষ্টিয়ায় সাধু আরশেদের আখড়ায় হামলা, যেখানে বাউল শিল্পীদের মারধর করা হয় এবং তাদের গানের আসর বন্ধ করে দেওয়া হয়। আরও সম্প্রতি, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে কুষ্টিয়ায় লালন শাহের মাজারে হামলা হয়, যেখানে মাজারের ভেতরে ভাঙচুর করা হয় এবং বাউলদের গান গাইতে নিষেধ করা হয়। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, এই গোষ্ঠীগুলো শুধুমাত্র আদর্শগত বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তারা সহিংস কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়। মব সংস্কৃতিকে যদি এখনই কঠোরভাবে দমন করা না হয়, তাহলে এর বিস্তার ঘটবে এবং ভবিষ্যতে শাহজালাল ও শাহ পরানের মতো প্রখ্যাত সুফি সাধকদের মাজারও হুমকির মুখে পড়বে। অতীতেও দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজারের ওপর হামলা হয়েছে এবং এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল, সুফিবাদের উদার এবং সমন্বয়বাদী দর্শনের প্রতি কিছু গোষ্ঠীর অসহিষ্ণুতা।

ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের বিস্তার কেবল সামরিক বিজয় বা রাজনৈতিক ক্ষমতার মাধ্যমে হয়নি, বরং এর পেছনে প্রধান ভূমিকা ছিল সুফি সাধক এবং বাউলদের। তারা তাদের উদার, মানবিক এবং সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। সুফি সাধকরা ইসলামের মূল বার্তা একত্ববাদ, প্রেম, দয়া ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রচার করতেন। তারা সমাজের উচ্চবর্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছান এবং তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নিজেদের মধ্যে গ্রহণ করেন। তারা স্থানীয় দেব-দেবী ও লোকগাথার সঙ্গে ইসলামের আধ্যাত্মিক ধারণার সমন্বয় ঘটিয়ে একটি নতুন ধর্মীয় পরিবেশ তৈরি করেন, যা স্থানীয়দের কাছে আকর্ষণীয় ছিল। এই সাধকদের খানকা বা দরগাহগুলো পরিণত হয় মিলনকেন্দ্রে, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই আসতেন এবং আধ্যাত্মিক প্রশান্তি লাভ করতেন। বাউলরা ছিলেন এই সুফি ঐতিহ্যেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা মাজারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত না হয়েও সুফিবাদ ও লোকায়ত দর্শনের একটি অনন্য মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। তারা তাদের গানের মাধ্যমে আল্লাহ বা ঈশ্বরের সন্ধান করতেন এবং মানবতাবাদী দর্শন প্রচার করতেন। বাউল গানগুলোতে প্রচলিত ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ছিল।  তাদের উদার দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ মানুষকে আকর্ষণ করেছিল এবং প্রচলিত ধর্মীয় কাঠামোর বাইরে একটি নতুন আধ্যাত্মিক পথ দেখিয়েছিল।

নির্বাচনকে সামনে রেখে মব কন্ট্রোল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং বিভিন্ন পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। এই সময়ে একটি ছোট ঘটনা বা গুজব বড় ধরনের সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। তাই এই পরিস্থিতিতে মবকে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর বার্তা দেওয়া প্রয়োজন। মব সহিংসতায় যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে, তারা যেই হোক না কেন। কোনো ধরনের রাজনৈতিক মদদ বা ছাড় দেওয়া চলবে না। পুলিশ ও প্রশাসনকে এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। গুজব এবং মিথ্যা তথ্য যাতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য সরকারকে একটি কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে, সাধারণ মানুষকেও সচেতন করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতা প্রয়োজন। নির্বাচনের আগে এবং পরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য দলগুলোকে একটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। তারা তাদের কর্মীদের সহিংসতা থেকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশনা দেবে এবং তাদের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখার চেষ্টা করবে। সুশীল সমাজ, সাংবাদিক, শিক্ষক এবং ধর্মীয় নেতাদের মব সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। তারা জনগণকে সচেতন করতে পারেন এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারেন। বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মব সহিংসতা একটি গুরুতর সমস্যা। এই সমস্যাকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত এক ব্যাধি, যা আমাদের গণতন্ত্র এবং বহুত্ববাদী সংস্কৃতিকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। রাজবাড়ীতে লাশ পোড়ানোর ঘটনা এবং রাজশাহীতে মাজারে হামলার ঘটনা শুধুমাত্র বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। মব প্রবণতাকে রুখতে হলে, সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মব সংস্কৃতিকে প্রতিহত করা সম্ভব। না হলে, আমাদের সমাজ আরও সহিংস এবং অসহিষ্ণু হয়ে উঠবে। আমরা যেন ভুলে না যাই, নির্বাচনকে সামনে রেখে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা আমাদের জন্য এক বড় পরীক্ষা।

লেখক: সিইও, ইটিসি ইভেন্টস লিমিটেড

[email protected] 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত