চীন-ভারতের সঙ্গে পারছেন না ট্রাম্প!

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৩:৩৯ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার অর্থায়নে বাধা সৃষ্টি করতে চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। রাশিয়া থেকে তেল ক্রয়কারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের মাধ্যমে পুতিনের যুদ্ধ মেশিনকে থামানোর চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। কিন্তু চীন ও ভারতের মতো অর্থনৈতিক দৈত্যের সঙ্গে একা লড়াই করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। গত শুক্রবার শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭-এর অর্থমন্ত্রীদের ভার্চুয়াল বৈঠকে ট্রাম্পের প্রতিনিধিরা মিত্রদের ‘ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস’-এর আহ্বান জানিয়েছেন, যা অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ট্রাম্পের ‘শুল্ক কৌশলের’ ব্যর্থতার প্রমাণ।

গত শুক্রবার কানাডার অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শঁপানের সভাপতিত্বে জি-৭ দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীদের একটি জরুরি ভার্চুয়াল বৈঠক হয়। কানাডা বর্তমানে জি-৭-এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধে সহায়তা করছে, এমন দেশগুলোর ওপর সম্ভাব্য শুল্ক আরোপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বৈঠকে বলেন, ‘রাশিয়ার তেল কিনছে এমন দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র যেমন শুল্ক আরোপ করেছে, অন্য দেশগুলোকেও এতে যোগ দিতে হবে। বেসেন্ট ও গ্রিয়ারের ভাষ্য, শুধু ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের মাধ্যমেই পুতিনের যুদ্ধ পরিচালনার অর্থায়নের উৎস কেটে দেওয়া সম্ভব হবে। তবেই আমরা যথেষ্ট অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে এ অর্থহীন হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে পারব। বৈঠকের পর কানাডার এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জব্দ করা রুশ সম্পদ ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা খাতে ব্যবহারের জন্য দ্রুত আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়েছেন অর্থমন্ত্রীরা। এ ছাড়া রাশিয়ার ওপর চাপ বৃদ্ধির নানা অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা হয়। এর মধ্যে ছিল নতুন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের মতো ব্যবস্থা গ্রহণ, যা ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনায় সহায়তা করা দেশগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা যেতে পারে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিবৃতি স্পষ্ট করে দেয়, যুক্তরাষ্ট্র একা রাশিয়াকে চাপে রাখতে পারছে না, বিশেষ করে চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোর রুশ তেল আমদানির কারণে। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জি-৭ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোকে আহ্বান জানান, চীন ও ভারতের পণ্যের ওপর ‘অর্থবহ শুল্ক’ আরোপ করতে। এর মাধ্যমে রুশ তেল কেনা বন্ধে চাপ দেওয়া যাবে বলে তারা মনে করেন। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, ট্রাম্প ইইউকে চীন ও ভারতের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন। অবশ্য ইইউ ঐতিহ্যগতভাবে রাশিয়াকে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আলাদা করার চেষ্টা করে আসছে; শুল্কের মাধ্যমে নয়।

রয়টার্স বলছে, ট্রাম্পের এ চাপের পটভূমি হলো গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ। সম্প্রতি, ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে শুল্ক ৫০ শতাংশে নিয়ে গিয়েছেন ট্রাম্প। এটি ভারতের রুশ তেল আমদানির জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। ভারত রাশিয়ার তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা এবং ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দৈনিক ১ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আমদানি করেছে। এই শুল্কের ফলে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আলোচনা জটিল হয়ে উঠেছে। অবশ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, চাপ বাড়লেও তারা সহ্য করতে পারবেন। চীনের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের কৌশল ভিন্ন। রাশিয়ার তেল কেনার পরও বেইজিংয়ের পণ্যে নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়নি। কারণ, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বর্তমানে সূক্ষ্ম বাণিজ্য সমঝোতা চলছে।

আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন রাশিয়ার সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা। কিন্তু ট্রাম্প চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ এড়াতে চান। আগামী শুক্রবার মাদ্রিদে বেসেন্ট চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী হে লিফেংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন; যেখানে বাণিজ্য ইস্যু ছাড়াও টিকটকের মালিকানা বিক্রি এবং মানি লন্ডারিংবিরোধী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হবে। তবে, সিএনবিসির মতে, চীনের রিফাইনারি রুশ তেলের অর্ডার বাড়িয়েছে। গত শুক্রবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, পুতিনের ব্যাপারে তার ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে। তিনি বলেন, রাশিয়ার ব্যাংক ও তেল খাত লক্ষ্য করে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ইউরোপীয় দেশগুলোকেও এতে অংশ নিতে হবে। আমাদের খুবই কঠোর অবস্থান নিতে হবে। ট্রাম্প বলেন, ব্যাংক, তেল ও শুল্ক সব দিক থেকেই খুব কঠোর নিষেধাজ্ঞা আসছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাশিয়াকে শাস্তি দিতে এরই মধ্যে অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ভারতের ওপর আরোপিত বাড়তি শুল্কের কথা উল্লেখ করেন, যা রাশিয়ার জ¦ালানি কেনার কারণে বাড়ানো হয়েছিল। ট্রাম্পের দাবি, এটি মূলত ইউরোপের সমস্যা, যুক্তরাষ্ট্রের নয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, তিনি একা চীন-ভারতের সঙ্গে মোকাবিলা করতে অক্ষম বোধ করছেন।

ট্রাম্পের এ শুল্ক যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বব্যাপী। নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট অনুসারে, ৫০ শতাংশ শুল্ক ভারতীয় রপ্তানিকারকদের ক্ষতি করবে। সেখানে লাখ লাখ কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব ফেলবে। ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি বাণিজ্য সম্পর্ক (যেখানে দুই-তৃতীয়াংশ আমেরিকান কোম্পানির অফশোর অপারেশন) ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চীনের ক্ষেত্রে, ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে বিশ্ব জুড়ে সাপ্লাই চেইন বিপর্যস্ত হবে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। ব্লুমবার্গের মতে, এটি রাশিয়ার অর্থনীতিকে চাপে ফেললেও, চীন-ভারতের মতো দেশগুলোর বিকল্প উৎস খুঁজে বের করার ক্ষমতা রাশিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

বিআরআইসি (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) ব্লকের সঙ্গে যুক্ততা বাড়ানোর ফলে রাশিয়ার তেল রপ্তানি অটুট রয়েছে। ২০২৫ সালে ভারত-রাশিয়া বাণিজ্য ৬৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা মহামারীর আগের তুলনায় ৫ দশমিক ৮ গুণ বেশি। ট্রাম্পের এই চাপ বিআরআইসি বনাম জি-৭ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যেমনটি তিনি তার এক্স পোস্টে উল্লেখ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোলটন বলেছেন, ট্রাম্পের এই শুল্ক কৌশল অস্থির এবং অকার্যকর। ভারতের মতো মিত্রকে শাস্তি দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে। চীনের বিশেষজ্ঞ লি জিয়াকুন বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের হেজিমনি প্রদর্শন, যা ব্যর্থ হবে। শুল্কযুদ্ধে কোনো বিজয়ী নেই। গ্লোবাল টাইমসের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, চীন তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে। অন্যদিকে, সিএনবিসির বিশ্লেষক বলেছেন, ট্রাম্প ইউরোপকে দায়িত্ব হস্তান্তর করছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক নষ্ট না হয়। কিন্তু ইইউ এতে সম্মত হবে না, কারণ চীন-ভারত তাদের বাণিজ্য অংশীদার।

ইকোনমিক টাইমসে প্রকাশিত এক মন্তব্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ চাপ রাশিয়াকে শক্তিশালী করতে পারে, কারণ চীন-ভারত বিকল্প খুঁজে নেবে। ট্রাম্পের প্রথম দিনে যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি এখন বাস্তবে পরিণত হচ্ছে না। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইইউয়ের স্যাংকশন এনভয়ি ডেভিড ও’সুলিভান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, কিন্তু ১০০ শতাংশ শুল্ক অর্থনৈতিকভাবে অসম্ভব। আবার জি-৭ ও ইইউয়ের সমর্থন ছাড়া রাশিয়ার তেল আমদানি রোধ করা কঠিন। এটি বিশ্ববাণিজ্যে নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, যা ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধানের পরিবর্তে আরও জটিলতা বাড়াবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের কৌশল রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হলেও, অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। ভবিষ্যতে কী হবে, তা নির্ভর করবে মিত্রদের সাড়ার ওপর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত