চট্টগ্রামের আনোয়ারায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপকূলীয় বেড়িবাঁধের প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকায় অধিকৃত ভূমি অবৈধ দখলদারদের কবলে রয়েছে। উপজেলার বদলপুরা থেকে বার আউলিয়া পর্যন্ত বাঁধের দুই পাশ এক শ্রেণির প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় যে যার মতো অবাধে দখলে নিয়েছে। সেখানে ২৭৬টি আধাপাকা ও টিনশেড স্থাপনা তৈরি করে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বসবাস করছে অন্তত দুই শতাধিক পরিবার। এতে পাউবোর প্রায় ২০০ কোটি টাকা মূল্যের ১৮২ দশমিক ২৫ একর ভূমি বেদখল হয়ে গেছে।
পাউবো সূত্রে জানা যায়, সাগর ও শঙ্খনদ বেষ্টিত আনোয়ারা উপজেলায় উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণের জন্য ১৯৬০ ও ১৯৯০ সালে ভূমি অধিগ্রহণ করে পাউবো। এর মধ্যে বদলপুরা, বন্দর, রাঙ্গাদিয়া, গোবাদিয়া, পশ্চিম তুলাতলী, ফুলতলী, উত্তর পরুয়াপাড়া, দক্ষিণ পরুয়াপাড়া ও গহিরা মৌজার বার আউলিয়া পর্যন্ত পাউবোর নামে জমি রেকর্ডভুক্ত রয়েছে। এই জমির ১৮২ দশমিক ২৫ একর অবৈধভাবে দখলে নিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। সেখানে কটেজ, বিভিন্ন দোকান, রেস্টুরেন্ট, ডেইরি ফার্ম, মাছের ঘের, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়িসহ ২৭৬টি স্থাপনা তৈরি করেছে দখলদাররা। বর্তমান বাজার দরে বেদখল এসব ভূমির আনুমানিক মূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার বদলপুরা থেকে বার আউলিয়া পর্যন্ত বেড়িবাঁধের দুই পাশের জমি দখলে নিয়ে গড়ে উঠেছে আধাপাকা ও টিনশেডের তৈরি শতাধিক দোকানঘর। এর মধ্যে বদলপুরা মেরিন একাডেমি, শাহাদত নগর জালিয়াঘাটা, রাঙ্গাদিয়া বাজার, পারকি বাজার, পারকি সৈকত, উত্তর পরুয়াপাড়া, খোর্দ্দ গহিরা, দোভাষীর হাট, উঠান মাঝির ঘাট ও বাইগ্যার ঘাট এলাকায় দোকানের দখলদারিত্ব বেশি। এ ছাড়া বেড়িবাঁধের প্রায় ১২ কিলোমিটার জুড়ে দুই পাশের পাউবোর জায়গা দখলের হিড়িক পড়েছে। বসতবাড়ি এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে পাউবোর ফাঁকা জায়গায় ভরাট করে যে যার মতো আয়ত্তে নিয়েছে। জালিয়াঘাটা থেকে রাঙ্গাদিয়া বাজার পর্যন্ত বাঁধের পশ্চিম পাশে শতাধিক বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে। এই সুযোগে পাশে থাকা বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকরা পাউবোর জলাশয়ে মাটি ফেলে অবাধে দখলে নিয়েছেন। কেউ কেউ সরকারি জমির ওপর দিয়ে নিজেদের বাড়ির সংযোগ পথও করেছেন। শতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এই দখলবাজিতে জড়িত বলে দাবি স্থানীয়দের। তবে পাউবোর কর্মকর্তারা দখলদারদের নামের তালিকা করতে পারেননি বলে জানান। এলাকাবাসীর ভাষ্য, এ ধরনের অবৈধ দখলের ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাঙ্গাদিয়া বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, তারা দখলস্বত্বে মালিকদের কাছ থেকে দোকানঘর ভাড়ায় নিয়ে ব্যবসা করছেন। এ বাজারে অর্ধশতাধিক দোকান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব দোকানের ভাড়া দিয়ে এলেও তারা মালিকদের নাম বলতে নারাজ।
এদিকে রাঙ্গাদিয়া বাজারের উত্তর পাশে বেড়িবাঁধের ওপর বসবাস করছে অন্তত অর্ধশতাধিক পরিবার। তাদের কেউ কেউ বাসা ভাড়া নিয়েছে। আবার অনেকেই বসতঘর তৈরি করে থাকছে দীর্ঘদিন ধরে। তাদের ভাষ্য, সেখানে বসবাসকারী অনেকেই ভূমিহীন। অনেকেই আবার নদীভাঙনে ভিটেবাড়ি হারিয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছে।
পাউবো চট্টগ্রামের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শাহাদত হোসেন বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আনোয়ারায় পাউবোর ভূমিতে অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য দখলদারদের স্থাপনাগুলো নিজ দায়িত্বে সরিয়ে নিতে আগস্ট মাস পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে এলাকায় টানা ৯ দিন মাইকিং করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে পাউবোর ভূমির পরিমাপ চলছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, ‘আনোয়ারায় উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণের জন্য ষাট ও নব্বই দশকে এসব ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু বাঁধের দুই পাশে কিছু কিছু ভূমি রয়ে গেছে। সবমিলিয়ে বাঁধের ১৮২ একরের বেশি জায়গা অবৈধ দখলে নিয়েছে স্থানীয়রা। সেখানে তারা বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করে অন্তত তিন যুগ ধরে ভোগ করছে। এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে প্রস্তুতি চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসক দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটও নিয়োগ দিয়েছেন। যেকোনো দিন উচ্ছেদ অভিযান হতে পারে।’
