জিম্মিদের মুক্তির পথে বাধা নেতানিয়াহু

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৩:১১ এএম

ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী গোষ্ঠী হামাসের হাত থেকে জিম্মিদের ফেরানো এবং শান্তিচুক্তিতে পৌঁছার পথে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘একমাত্র বাধা’ বলে অভিযোগ করেছে ইসরায়েলি জিম্মিদের পরিবারগুলো। জিম্মিদের ঘরে ফেরাতে সোচ্চার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘হোস্টেজেস অ্যান্ড মিসিং ফ্যামিলিজ ফোরাম’ সংগঠনটি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছে, গত সপ্তাহে কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরায়েলের হামলা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, প্রতিবার যখনই একটি চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়, নেতানিয়াহু তখনই সেটি বানচাল করে দেন। গত শনিবার নেতানিয়াহু বলেন, কাতারে হামাস নেতাদের নির্মূল করা গেলে জিম্মিদের মুক্তি ও যুদ্ধের অবসানে প্রধান বাধা দূর হবে। হামাস যুদ্ধবিরতির সব চেষ্টা ভেস্তে দিয়ে গাজা যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে কাতারে হামলার বিষয়ে নেতানিয়াহুর ব্যাখ্যা ভালোভাবে নেননি জিম্মিদের স্বজনরা। তারা বলেছেন, জিম্মিদের মুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন নেতানিয়াহু। এই ব্যর্থতা ঢাকতে নতুন অজুহাত তৈরি করতে তিনি কাতারে হামলা চালিয়েছেন।

জিম্মিদের পরিবারের সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, কাতারে পরিকল্পিত হামলা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে, ৪৮ জিম্মিকে ফিরিয়ে আনা এবং যুদ্ধ শেষ করার পথে একমাত্র বাধা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নিজেই। পরিবারগুলো বলছে, ক্ষমতা ধরে রাখতে সময়ক্ষেপণের জন্য নেতানিয়াহু যেসব অজুহাত তৈরি করছেন, সেগুলোর অবসান ঘটানোর সময় এসেছে। নেতানিয়াহুর সময়ক্ষেপণের কারণে ৪২ জিম্মির মৃত্যু হয়েছে। যারা কোনোমতে বেঁচে আছেন তাদের জীবনও এখন হুমকির মুখে। গত মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) কাতারের রাজধানী দোহায় হামাসের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরায়েল। হামাসের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এতে হামাসের ৫ সদস্য ও কাতারের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। কাতারের রাজধানীতে ইসরায়েলের হামলার পর বিশ্বজুড়ে নিন্দা-সমালোচনায় পড়েছে ইসরায়েল। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর এসব নিন্দাকে আমল দিচ্ছেন না। কাতারে ইসরায়েলের এই হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘খুশি নন’ বলে জানিয়েছিলেন। এর মধ্যেই গত শনিবার ইসরায়েল সফরে গিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। সফরে তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।

তিনি বলেন, কাতারে হামলায় আমরা অবশ্যই খুশি নই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও খুশি নন। এখন আমাদের সামনে এগোতে হবে এবং পরবর্তী সময়ে কী করণীয় তা নির্ধারণ করতে হবে।

দোহায় জড়ো হয়েছেন মুসলিম দেশের নেতারা : কাতারে হামলার কারণে বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে ইসরায়েল। এই হামলার আনুষ্ঠানিক জবাব নিয়ে আলোচনার জন্য শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে শহরটিতে জড়ো হয়েছেন বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর নেতারা। গতকাল সোমবার এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ বিন মোহাম্মদ আল-আনসারি কাতার নিউজ এজেন্সিকে বলেছেন, এই শীর্ষ সম্মেলনে দোহায় ইসরায়েলি হামলার বিষয়ে একটি খসড়া প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান বিন জাসেম আল থানি বলেছেন, কাতার এই হামলার জবাবে সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ার জন্য কাজ করবে। কারণ, এই হামলা পুরো অঞ্চলকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। উল্লেখ্য, গাজা যুদ্ধ বন্ধ ও আঞ্চলিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে কাতার।

ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) ৫৭টি সদস্য রাষ্ট্র ও আরব লীগভুক্ত ২২ দেশ এই সম্মেলনে অংশ নিয়েছে। হামলার পর ইসরায়েল অবশ্য দাবি করে যে তাদের এ হামলার লক্ষ্য ছিলেন হামাস নেতারা। দুই বছর ধরে চলা গাজা যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি প্রস্তাব নিয়ে দোহায় হামাস নেতারা যখন আলোচনা করছিলেন, ঠিক তখন এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। অথচ হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সার দাবি করেছিলেন, ইসরায়েল ট্রাম্পের প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে। এ প্রস্তাবের অধীনে হামাসের হাতে জিম্মি ৪৮ জনকে মুক্তি দেওয়া হবে। বিনিময়ে ইসরায়েলে আটক ফিলিস্তিনিদের মুক্তি দেওয়া হবে এবং একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে।

দোহায় ওই হামলায় হামাসের পাঁচ সদস্য ও কাতারের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হন। তবে ইসরায়েল যে উদ্দেশ্যে হামলা চালিয়েছিল, সেটি ব্যর্থ হয়েছে। অর্থাৎ, ইসরায়েল যাদের লক্ষ্যবস্তু করেছিল, তারা সুরক্ষিত আছেন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ গত বৃহস্পতিবার সর্বসম্মতভাবে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতা ও মন্ত্রীরা দোহায় আসছেন, ঠিক তখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ইসরায়েল সফর করছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তারা পশ্চিম তীরের বড় অংশ দখলের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রুবিওর ইসরায়েল সফর : যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গাজা যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার জন্য গত রবিবার ইসরায়েলে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই গাজা সিটিতে হামলা তীব্রতর করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা জানিয়েছে, এ দিন ইসরায়েলি বাহিনী গাজা সিটির অন্তত ৩০টি আবাসিক ভবন ধ্বংস করেছে এবং কয়েক হাজার বাসিন্দাকে বাড়িছাড়া করেছে। ইসরায়েল জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসকে নির্মূলের তাদের ঘোষিত লক্ষ্যের অংশ হিসেবে গাজা সিটি দখল করার পরিকল্পনা করেছে ইসরায়েল। শহরটিকে হামাসের শেষ ঘাঁটি বলে অভিহিত করে প্রায় ১০ লাখ ফিলিস্তিনির আশ্রয় গাজা সিটিতে তীব্র হামলা চালাচ্ছে দখলদার দেশটি, লিখেছে রয়টার্স।  গত মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় হামাসের রাজনৈতিক নেতাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। হামাসের ওই নেতারা গাজায় সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তি চুক্তি নিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় যুক্ত আছেন। তাদের নিশানা করে চালানো এ হামলা ব্যাপক নিন্দার কারণ হয়েছে। ইসরায়েলের এ হামলার পর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে তা নিয়ে আলোচনার জন্য কাতার গতকাল সোমবার দোহায় একটি জরুরি আরব-ইসলামিক সম্মেলনের আয়োজনও করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও জানিয়েছেন, গাজা ভূখণ্ডে হামাসের হাতে এখনো বন্দি ৪৮ জিম্মিকে কীভাবে মুক্ত করা যায়; ওয়াশিংটন চায় এ বিষয়ে কথা বলতে ও উপকূলীয় ভূখণ্ডটি পুনর্নির্মাণ করতে।

ওই ৪৮ জিম্মির মধ্যে মাত্র ২০ জন এখনো জীবিত আছেন বলে ধারণা পর্যবেক্ষকদের। ইসরায়েলের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে রুবিও বলেছেন, যা হয়েছে তা হয়ে গেছে। আমরা তাদের (ইসরায়েলি নেতাদের) সঙ্গে বৈঠক করতে যাচ্ছি। ভবিষ্যতে কী আছে তা নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছি আমরা। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজ (মঙ্গলবার) পর্যন্ত ইসরায়েলে অবস্থান করবেন। সফরে তিনি জেরুজালেমে ইহুদিদের প্রার্থনার স্থান পশ্চিম দেয়াল (ওয়েস্টার্ন ওয়াল) পরিদর্শন করেন। তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও বৈঠক করবেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পশ্চিম দেয়াল পরিদর্শন করা হলো জেরুজালেমকে ইসরায়েলের চিরন্তন রাজধানী হিসেবে আমেরিকার স্বীকৃতি পুনরায় নিশ্চিত করা। প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদের সময় ২০১৭ সালের শেষ দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন আর এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস তেল আবিব থেকে সরিয়ে সেখানে নিয়ে যায়।

গাজায় ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে উৎপাদিত অস্ত্রের ব্যবহার : গাজায় ফিলিস্তিনিদের হত্যায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালিত স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করছে ইসরায়েল। আর এই অস্ত্রগুলো যৌথভাবে তৈরি করেছে ইসরায়েলের ইসরায়েল ওয়েপনস ইন্ডাস্ট্রিজ ও ভারতের আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস। মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের এক বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই বিষয়টি ওঠে এসেছে। ফিলিস্তিনি ছিটমহল গাজায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে চালানো ভয়াবহ অভিযানে ইসরায়েলি সেনারা ব্যবহার করছে আরবেল নামের নতুন এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালিত অস্ত্র ব্যবস্থা। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে, এই অস্ত্রকে বলা হচ্ছে ‘অপারেটরের প্রাণঘাতী ক্ষমতা ব্যবহারের পরও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়ায় এমন বিপ্লবী প্রযুক্তি।’ এই প্রযুক্তি এটি টাভোর, কারমেল ও নেগেভের মতো স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রকে এমন এক সিস্টেমে রূপ দেয়, যেখানে অ্যালগরিদমের সাহায্যে লক্ষ্যভেদ আরও নির্ভুল ও কার্যকর হয়। গত ১৩ মাসে গাজায় স্কুল, শরণার্থী শিবির ও হাসপাতাল বোমা হামলা থেকে শুরু করে রাস্তায় সরাসরি ফাঁসি পর্যন্ত নানা ধরনের হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরায়েলি সেনারা। এ সময় সবচেয়ে বেশি প্রাণ গেছে নারী ও শিশুদের। বিভিন্ন হিসাবে দেখা যাচ্ছে, নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা অন্তত ৬৬ হাজার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত