কাতারে ইরানের প্রেসিডেন্ট

গণহত্যা সমর্থনকারীদের পাপের কথা ইতিহাস মনে রাখবে

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৬:৩৫ পিএম

দোহায় ইসরায়েলের হামলার পর ওআইসি ও সহযোগীদের নেতাদের নিয়ে শীর্ষ সম্মেলন ডেকেছে কাতার। সেখানে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, আমাদের অবশ্যই সেই সহযোগীদের নাম নিতে হবে, যারা এসব অপরাধ সম্ভব করেছে। যখন কোনো বিদ্রোহী শাসন যেকোনো পরিস্থিতিতে অস্ত্র, অর্থায়ন ও কূটনৈতিক সহায়তা পায়, তখন সে শেখে যে কোনো সীমারেখা নেই। যখন ভেটো ও দ্বিমুখী মানদণ্ড আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে অচল করে দেয়, তখন অব্যাহতি পচনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাস মনে রাখবে সেই সব লোকের পাপ, যারা এই আগ্রাসনকে সমর্থন করেছে।’

ইরানের প্রেসিডেন্টের বক্তব্য তুলে ধরা হলো

২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কাতারের ওপর যে বর্বর আগ্রাসন চালানো হয়েছে, তা ছিল ইসরায়েলি শাসনযন্ত্রের একটি পরিকল্পিত হামলা, যার উদ্দেশ্য ছিল গাজায় গণহত্যা বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেওয়া। এ ধরনের কূটনীতির ওপর আগ্রাসন নিছক অপরাধ নয়, বরং এটি একটি স্পষ্ট ও নির্লজ্জ ঘোষণা যে এখন থেকে আইন নয়, বরং সামরিক শক্তিই হবে নির্ধারণী উপাদান। দুর্ভাগ্যবশত, তেলআবিবে বসবাসকারী সন্ত্রাসীরা আরও উদ্ধত হয়ে উঠেছে, কারণ তারা মনে করছে আগের মতো এবারও কোনো শাস্তি পাবে না—যেমন ২০২৫ সালের জুন মাসে কূটনীতির বিশ্বাসঘাতকতা এবং আমার জনগণের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক যুদ্ধ শুরু করার সময় ঘটেছিল।

এ নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয় যে গত সপ্তাহে দোহায় চালানো হামলাগুলো নিখাদ সন্ত্রাসবাদ; এর প্রমাণ হলো তেলআবিব শাসনযন্ত্র সব নৈতিক ও আইনি সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে এগোচ্ছে।

কিন্তু খোলাখুলি বলি, আমরা কীভাবে এই অবস্থায় পৌঁছালাম। এ হামলা হঠাৎ করে ঘটেনি; এটি ইসরায়েলি শাসনযন্ত্রকে দীর্ঘ দশক ধরে দেওয়া অপরাধের অব্যাহতির অনিবার্য ফলাফল। পশ্চিমা কিছু শক্তি এ কাজ সম্ভব করেছে। দীর্ঘকাল ধরে বিশ্ব দেখেছে কীভাবে এ শাসনযন্ত্রকে ঘিরে একটি দুর্গ তৈরি হয়েছে—যার প্রতিটি ইট বসানো হয়েছে মার্কিন ভেটো, ইউরোপীয় বাণিজ্য চুক্তি, এবং আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার পঙ্গুত্বের মাধ্যমে।

গত দুই বছরে গাজা ভয়াবহ অপরাধের শিকার হয়েছে, যা মানবতার বিবেককে পরীক্ষা করেছে। আজ গাজা জ্বলছে: দুই বছরের কম সময়ে ৬৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছে; শিশুরা না খেয়ে মরছে, অথচ বিশ্ব শুধু তাকিয়ে আছে আর নিন্দা করছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ইতিমধ্যেই রায় দিয়েছে যে ইসরায়েলি শাসনযন্ত্রের কর্মকাণ্ড গণহত্যার শামিল। তবুও হত্যাযন্ত্র চলছে, এখন তা কাতারের মাটিতেও পৌঁছে গেছে।

আমাদের স্বীকার করতে হবে আমরা এক ভয়ংকর মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি। ২০২৫ সালে ইসরায়েলি শাসনযন্ত্র একাধিক মুসলিম দেশে বোমা হামলা করেছে। প্রতিবার এই আগ্রাসনকে ‘আত্মরক্ষা’ নামে বৈধতা দেওয়া হয়েছে, আর পশ্চিমা দেশগুলো অস্পষ্ট প্রতিক্রিয়া ও ফাঁকা নিন্দা জানিয়েছে।

আমাদের ফিলিস্তিনি জনগণ ও ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী সকলের কাছে দুটি দায়িত্ব আছে—স্পষ্ট বক্তব্য ও কর্মতৎপরতা।

বক্তব্যের দিক থেকে বলতে হবে—ইসরায়েলি শাসনযন্ত্রের অপরাধগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং আধিপত্য, দমন, ভীতি প্রদর্শন, জাতিগত নির্মূল, সম্প্রসারণবাদ ও আগ্রাসনের নীতির অংশ, যা যুক্তরাষ্ট্র ও কিছু পশ্চিমা দেশের সহযোগিতায় শক্তিশালী হয়েছে।

কর্মের দিক থেকে বলতে হবে—শব্দ দিয়ে গণহত্যা থামানো যায় না। আমাদের উচিত আগ্রাসীকে বিচ্ছিন্ন করা, তাদের অস্ত্র ও অর্থের যোগান বন্ধ করা, এবং তাদের নেতাদের আন্তর্জাতিক আদালতে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা।

কিন্তু এসব কার্যকর হবে না ঐক্য ছাড়া। ইসরায়েলি শাসন আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পরস্পরবিরোধী অগ্রাধিকারের ওপর নির্ভর করেছে।

দোহায় হামলা অনেক ভ্রান্ত সমীকরণ ও ভাবনার অবসান ঘটিয়েছে, দেখিয়ে দিয়েছে—কোনো আরব বা মুসলিম দেশই তেলআবিব শাসনযন্ত্রের আগ্রাসন থেকে নিরাপদ নয়। আগামীকাল এটি যেকোনো আরব বা ইসলামি রাজধানী হতে পারে। পছন্দ একটাই—আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের সময় বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই মুসলিমরা ভাই; এক মুসলিম আরেক মুসলিমের ভাই; তারা এক হাতের মতো অন্যদের বিরুদ্ধে।’

ইসরায়েলি শাসন ও তাদের সমর্থকরা জানুক দোহায় হামলা শক্তির পরিচয় নয়, বরং হতাশা ও অসহায়ত্বের নিদর্শন। যে শাসন নিজের অবস্থানে আত্মবিশ্বাসী, সে আলোচকদের ওপর বোমা ফেলতে বাধ্য হয় না। আপনারা প্রতিটি লালরেখা অতিক্রম করেছেন; প্রতিটি যুক্তি ও আইন অগ্রাহ্য করেছেন; সভ্য আচরণের প্রতিটি নীতি লঙ্ঘন করেছেন; কিন্তু অনিচ্ছাকৃতভাবে একটি বড় কাজ করেছেন: আপনারা ইসলামি উম্মাহর সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তিকে জাগিয়ে তুলেছেন। আপনাদের ভিকটিম হওয়ার গল্প এখন পুরোনো ও অকার্যকর। বিশ্ব দেখছে, নথিভুক্ত করছে, মনে রাখছে।

ইসরায়েলি শাসন আমাদের সার্বভৌমত্ব, মর্যাদা ও ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এর জবাবে আমরা ঘোষণা করছি: আমরা ভীত হব না, আমরা বিভক্ত হব না, আমরা নীরব থাকব না। গাজার ছাই থেকে ন্যায়বিচার উঠবে। দোহা, বৈরুত, তেহরান, দামেস্ক ও সানার ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি নতুন ব্যবস্থা উদ্ভব হবে—যা ভণ্ডামির ওপর নয়, ইসলামি ঐক্যের ওপর ভিত্তি করে; যা জায়নিস্ট শ্রেষ্ঠত্বের ওপর নয়, বরং ভ্রাতৃত্ব ও মানবিক সমতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।

‘যে ব্যক্তি শুনবে কেউ ডেকে বলছে, ‘হে মুসলিমরা!’ অথচ সাড়া দেবে না—সে মুসলিম নয়। যে ব্যক্তি মুসলিমদের ব্যাপারে উদাসীন থাকবে—সে মুসলিম নয়।’ সুতরাং, আগ্রাসীদের শাস্তি ও জবাবদিহিতা শুরু করতেই হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত